নানা প্রতিবন্ধকতায় মন্ত্রীর উদ্বোধনকৃত মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্র নির্মাণে অনিশ্চয়তা

0
35

শেখ নাদীর শাহ্, নিজস্ব প্রতিবেদক  :

খুলনার পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনিতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কমপ্লেক্সের ভিত্তি প্রস্তর উদ্বোধনের পর শুরু হয়েছে এর নির্মাণ কাজের প্রক্রিয়া। তবে নির্ধারিত স্থানে ভিত্তিপ্রস্তরসহ বিস্তীর্ণ খাসজমি স্থানীয়দের মধ্যে কখনো নিজেদের আবার কখনো তাদের সীমাণা লাগোয়া জমিতে হলে বাকিরা কেন ছাড় পাবে? এমন নানা প্রশ্নের মুখে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বুধবার (১৮ আগস্ট) সকালে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসের কানুনগো,সার্বেয়ার ও স্থানীয় ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট সাধু পরিবারের মধ্যে বসাবসি হলেও ঐক্যমতে পৌছায়নি। এমন পরিস্থিতিতে কপিলমুনিতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। যদিও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলছেন, শতভাগ সরকারি জমিতে নির্মাণ হচ্ছে এবং ব্যক্তি বিশেষ কেউ এই জায়গা দখলের চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনী ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে বলেও জানানো হয়।

মূলত স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণের নির্ধারিত স্থানে ভিত্তিপ্রস্তরসহ গোটা এলাকা কাটা তারের ঘেরা-বেড়ায় আটকে দেওয়ার পর থেকেই শুরু হয়েছে নানা সংকট। কপিলমুনির স্থপতি রায় সাহেব বিনোদ বিহারী সাধুর ভ্রাতা কুঞ্জ বিহারী সাধুর ওয়ারেশরা কপোতাক্ষের চরভরাটি খাস খতিয়ানের ৫৯৫ দাগের উক্ত জমি নিজেদের বলে দাবি করে দখল-পাল্টা দখলের ঘটনায় প্রশ্নবিদ্ধ করেছে গোটা প্রক্রিয়া। কখনো সার্ভেয়াররা ঐ জমির সীমাণায় লাল পতাকা, আবার কখনো তারা সবুজ পতাকা টানিয়ে দিচ্ছে। এরই মধ্যে ঐ সম্পত্তির দক্ষিণ সীমানায় সংশ্লিষ্ট পরিবারের পক্ষে পাকা ইমারত নির্মাণে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

প্রসঙ্গত, কপোতাক্ষের চরভরাটি খাসজমিতে গত বছরের ৯ ডিসেম্বর কপিলমুনি মুক্তদিবসে সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষযক মন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হকসহ মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সচিব তপন কান্তি ঘোষ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব শেখ ইউসুফ হারুন, স্থানীয় সংসদ সদস্য আক্তারুজ্জামান বাবু উপস্থিত থেকে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক রণাঙ্গন কপিলমুনিতে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সের উদ্বোধন করেন।

এর কয়েক দিন পর জায়গাটি নিজেদের মালিকানাধীন দাবি করে সেখানে কাটা তারের ঘেরা-বেড়া দিয়ে দখলে নেয় স্থানীয় অমিত সাধুসহ তার অন্যান্য শরিকরা।

বহুলালোচিত জায়গাটি বে-দখলের খবরে চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারী সকাল সাড়ে ১১ টার দিকে সাবেক উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো: আরাফাতুল আলমের নেতৃত্বে কাটাতারের বেড়া অপসারণপূর্বক ঐ সম্পত্তির অবৈধ দখলমুক্ত করা হয়।

ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম খালিদ হোসেন সিদ্দিকী, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো: আরাফাতুল আলম, স্থানীয় ইউএলএও হাসমত, উপজেলা সার্ভেয়ার মো: কাওছার আলীসহ স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থেকে কমপ্লেক্সের স্থান নির্ধারণ ও জরিপকার্য সম্পন্ন করে সীমাণায় লাল পতাকা টানিয়ে দেন।

এরপর কুঞ্জ বিহারী সাধুর ওয়ারেশরা ফের ঐ সম্পত্তি তাদের বলে দাবি করে পুনরায় কাটাতারের ঘেরা-বেড়া দিয়ে দখলে নেয়। এনিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশ হলে ১৩ আগস্ট ঐ জমির অংশ বিশেষ ব্যক্তি মালিকানাভূক্ত বলে চিহ্নিত করে সেখানে সবুজ পতাকা টানিয়ে দেয় বলে স্থানীয়রা দাবি করেন।

জানাযায়, ২০১৩ সালে কপোতাক্ষের চরভরাটি খাস খতিয়ানের ৫৯৫ দাগের বিস্তীর্ণ সম্পত্তির মধ্য থেকে স্থানীয় জনৈকা মালঞ্চ নামের এক গৃহ ও ভূমিহীন মহিলাকে মিস কেস নং-৮৭৬/১২-১৩ মাধ্যমে খুলনা জেলা প্রশাসক ১০ শতক জমি বন্দোবস্ত দেয়। তবে দখল পায়নি মালঞ্চ বিবি। এ নিয়ে আদালতে একাধিক মামলা-পাল্টা মামলারও ঘটনা ঘটে। বিষয়টি মালঞ্চ ঐসময় জেলা প্রশাসককে অবহিত করলে ২০২৮ সালের ৩০ জানুয়ারি তিনি ০৫.৪৪.৪৭০০.০৩১.৩৩.০০১.১৮-১৪৫৫ নং স্মারকে দখল ও সীমানা বুঝে দিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পাইকগাছাকে নির্দেশ দেন। নির্দেশ মোতাবেক স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে মালঞ্চ বন্দোবস্তকৃত সম্পত্তির দখল নিতে গেলেও বাঁধার মুখে বরাবরের মত ব্যর্থ হয়। এরপর মালঞ্চ সর্বশেষ গত বছরের ৫ মে পুনর্দখল বুঝে পেতে ইউএনও পাইকগাছা বরাবর একটি আবেদন করলে তিনি ৬ মে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে কপিলমুনি ভূমি অফিসের ইউএলও জাকির হোসেন এবং স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ির এসআই বাবুল হোসেনকে নির্দেশ দেন। যার প্রাপ্তি নং-২৯৪। সর্বশেষ ইউএনও’র অনুমতিতে স্থানীয় ইউএলও-স্থানীয় পুলিশের সহযোগিতায় ১৪ মে সকালে কপোতাক্ষ তীরের বন্দোবস্তপ্রাপ্ত খাসজমিতে তৃতীয় দফায় ঘর বাঁধতে গিয়ে বাঁধার মুখে ব্যার্থ হন।

ঐ ঘটনায় ১৬ মে পাইকগাছা বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে স্থানীয় দখলদারদের একজন তপন কুমার সাধুর ছেলে অমিত ওরফে শান্ত সাধু বাদী হয়ে ইউএলএও মো: জাকির হোসেন ও স্থানীয় এক সাংবাদিকসহ কয়েকজনকে আসামী করে একটি মামলা করেন। যা পিবিআিই’র তদন্তে মিথ্যা প্রমানিত হয়।

এক পর্যায়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে স্থানীয় খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো: আক্তারুজ্জামান বাবুর মধ্যস্থতায় মালঞ্চকে অন্যত্র পূণর্বাসন করলে ফের ঐ সম্পত্তির দখলে যান অমিত ওরফে শান্ত সাধু গং। এরপর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষে কয়েক দফায় ঐ জমির জরিপপুর্বক লাল পতাকা টানিয়ে চিহ্নিতপূর্বক ৯ ডিসেম্বর কপিলমুনি মুক্ত দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সেখানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কমপ্লেক্সের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম. মোজাম্মেল হক।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ’৮০-এর দশক থেকে প্রথমে কপোতাক্ষের ব্যাপক ভাঙ্গন ও পরে নাব্যতা হ্রাস পেলে বিস্তীর্ণ তীর জুড়ে গড়ে ওঠে চরভরাটি খাসজমি, যা সরকারের সর্বশেষ মানচিত্রে ১ নম্বর খাস খতিয়ানের ৫৯৫ দাগে চিহ্নিত হয়। এরপর নদের নাব্যতা হ্রাসে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে বর্ষা মৌসুমে স্থায়ী জলাবদ্ধতা ও জীবন-জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এক পর্যায়ে সরকার ২৬২ কোটি টাকা বরাদ্দে কপোতাক্ষ নদ খননের কাজ করে। খননের উচ্ছিষ্ট মাটিতে দু’পাড়ে দৃশ্যমান হয় বিস্তীর্ণ খাস জমির। আর তখন থেকেই শুরু হয় এর দখল প্রক্রিয়াও।

১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনিতে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়েছিলো দক্ষিণ খুলনার অন্যতম প্রধান রাজাকার ঘাঁটির রাজাকাররা। যুদ্ধ শেষে মুক্তিযোদ্ধারা আটক করেন ১৫৫ জন রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধীকে। রাজাকার ঘাঁটি থেকে উদ্ধারকৃত বিভিন্ন কাগজপত্রের সাথে পাওয়া যায় রাজাকারদের হাতে লেখা এক হাজার ৬০১ জন শহীদের তালিকা। রাজাকারদের পরবর্তী টার্গেট হিসেবে এলাকার আরো ১ হাজার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের তালিকা পাওয়া যায়। ক্যাম্প থেকে এদিন দেয়ালে পেরেকবিদ্ধ সৈয়দ আলী গাজী নামে এক মুক্তিযোদ্ধার ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধার হয়। আতœসমর্পণের খবরে সহচরী বিদ্যা মন্দিরের মাঠে উপস্থিত হাজার হাজার মানুষের গণআদালতে এদিন ১৫১ জন রাজাকারের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। মুক্তিযুদ্ধকালীণ গণআদালতের রায়ে এক সঙ্গে এত সংখ্যক রাজাকারের শাস্তির সম্ভবত এটাই একমাত্র ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপুঞ্জ অবগত হওয়ার পর সর্বশেষ ৯ ডিসেম্বর ২০’ কপিলমুনি মুক্ত দিবসের অনুষ্ঠানে সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হক উপস্থিত থেকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

এব্যাপারে স্থানীয় কপিলমুনি আঞ্চলিক মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ সমবায় সমিতির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা সরদার ফারুখ আহম্মেদ বলেন, স্থানীয় কতিপয় মহলের ইন্ধনে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকৃত নির্ধারিত স্থানে কাটা তারের ঘেরা-বেড়া দেয়া হয়েছে। এনিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে এমপি,ইউএনওসহ সকলের সাথে কথা হয়েছে। ইতোমধ্যে উক্ত জমি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। সময় হলে প্রয়োজনে বেড়া উচ্ছেদ করা হবে।

কপিলমুনি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ইউএলএও মো: সবুর হোসেন বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কমপ্লেক্স ভবনের ভিত্তিপ্রস্তরের নির্ধারিত স্থানেই সেটি নির্মিত হবে।

এদিকে দখল-পাল্টা দখলের মহড়ায় সর্বশেষ গত বুধবার (১৮ আগস্ট) উপজেলা কানুনগো,সার্ভেয়ার,ইউএলওসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সাধু পরিবারের সাথে বসাবসি করেও ঐক্যমতে পৌছাতে পারেনি। বিশেষ করে খাস জমির দক্ষিণ প্রান্তে অনুপম সাধু পাকা ইমারত নির্মান করায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে গোটা প্রক্রিয়া।

স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, অনুপম সাধু বিবাদমান সম্পত্তির ঐ অংশ স্থানীয় কপিলমুনি সদরের মৃত বিশ্বানাথ দত্তের ছেলে বঙ্কিম দত্তের কাছে মোটা অংকের টাকায় বিক্রি করেছেন। তবে এব্যাপারে বঙ্কিম দত্তের কাছে জানতে চাইলে বলেন, তিনি কোন জমি কেনেননি। অনুপম সাধুর জায়গায় তিনিই ঘর তৈরী করছেন।

তবে উক্ত জমি হস্তান্তরের সাথে সম্পৃক্ত মো: গফুর শেখ বলেন, সেখানে বঙ্কিম দত্ত তার ব্যবসার প্রয়োজনে গোডাউন তৈরির জন্য অনুপম সাধুর সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন।

এব্যাপারে পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম খালিদ হোসেন সিদ্দিকী বলেন, মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স শত ভাগ খাস জায়গায় নির্মিত হচ্ছে। সুতরাং ব্যক্তি বিশেষ এই জায়গা দখলের চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।