কারাগারে থেকেই চলছে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ

0
419

খুলনাটাইমস এক্সক্লুসিভ: অপরাধীদের সংশোধনের জায়গা হলো কারাগার। অথচ সেই কারাগারে বসেই চলছে রমরমা মাদক ব্যবসা। দুর্র্ধষ সন্ত্রাসী ও অপরাধীরা কারাগারে থেকে অবাধে চালাচ্ছে মাদক ব্যবসা। একই সঙ্গে তারা নিয়মিত মাদক সেবনও করে যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, মাদক সেবন ও ব্যবসায় সর্বাত্মক সহযোগিতা করছেন কারাগারগুলোতে দায়িত্বে থাকা শতাধিক কর্মকর্তা ও কারারক্ষী। এমন অভিযোগ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে এসেছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের কারাগারগুলোতেও মাদক সেবন ও পাচারে জড়িতদের শাস্তি দিতে তদন্ত চলছে।
জানা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলের মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রক ইয়াবা স¤্রাট হীরা মাঝি ও নান্নু মৃধা বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে বসেই মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। এরমধ্যে নান্নু মৃধা একটি হত্যা মামলায় ফাঁসির দন্ডাদেশ প্রাপ্ত ও হীরা মাঝি একটি মাদক মামলায় এক বছরের সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে রয়েছেন।
এ দুই মাদক স¤্রাটের অবর্তমানে হীরা মাঝির ভাই ও তার শতাধিক সহযোগিরা এবং নান্নু মৃধার অবর্তমানে তার স্ত্রী ও স্বজনরা মাদক ব্যবসা মাঠে সক্রিয়ভাবে পরিচালনা করছে। এরমধ্যে গত ৭ সেপ্টেম্বর বিকেলে র‌্যাব-৮ এর চৌকস সদস্যরা অভিযান চালিয়ে ১৪৫ পিস ইয়াবাসহ গৌরনদীর কটকস্থল গ্রামের বার্থী ইউনিয়ন পরিষদের সামনে থেকে মাদক স¤্রাট হীরা মাঝির ভাই মনির মাঝিকে আটক করেছে। এ ঘটনায় র‌্যাবের ডিএডি আল মামুন সিকদার বাদি হয়ে ছয়জনকে আসামি করে থানায় মামলা দায়ের করেছেন। একইদিন রাতে মাদকের বিরুদ্ধে নিরবে জেহাদ ঘোষণা করা গৌরনদী মডেল থানার চৌকস ওসি গোলাম ছরোয়ারের নেতৃত্বে বেজগাতি এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৩০৫ পিস ইয়াবাসহ মাদক স¤্রাট নান্নু মৃধার স্ত্রী হাসিনা বেগমকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
গৌরনদী মডেল থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মাদক ব্যবসায় বাঁধা দেয়ায় ২০১৪ সালের ১৩ অক্টোবর রাতে উপজেলার নন্দনপট্টি গ্রামের শফিজউদ্দিন মৃধার পুত্র মাদক স¤্রাট নান্নু মৃধা ও তার সহযোগিরা একই গ্রামের খাদেম সরদারকে কুপিয়ে হত্যা ও তার পুত্র আসলাম সরদারকে কুপিয়ে পঙ্গু করে দেয়। ওই মামলায় আসামিদের উপস্থিতিতে ২০১৮ সালের ৭ মার্চ আদালতের বিচারক নান্নু মৃধাকে ফাঁসির আদেশ ও তার সহযোগি সেন্টু মৃধা এবং আলম মৃধাকে যাবজ্জীবন সাজা প্রদান করেন।
স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, নান্নু মৃধার কাছে ইয়াবা তৈরির দুটি মেশিন ছিলো। যা অদ্যবর্ধি খুঁজে পায়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। মাদক স¤্রাট নান্নু মৃধা গ্রেফতারের পর কিছুদিন এ অঞ্চল শান্ত ছিলো। পরবর্তীতে কারাগারে থাকা নান্নু মৃধার দিকনির্দেশনায় পুনরায় মাদক ব্যবসা শুরু করেন তার (নান্নু) স্ত্রী হাসিনা বেগম ও তার স্বজনরা। কৌশলে দেশের বিভিন্নস্থান থেকে ইয়াবার চালান আসে হাসিনা বেগমের কাছে। সম্প্রতি সময়ে স্থানীয় যুব সমাজ ইয়াবার চালান পৌঁছে দিয়ে ফেরার পথে এক ব্যক্তিকে আটক করে চরম রোষানলে পরেছিলেন। এ ব্যাপারে থানার ওসি গোলাম ছরোয়ার বলেন, সময়মতো সঠিক তথ্য না পাওয়ায় এতোদিন হাসিনা বেগমকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। অবশেষে গত ৭ সেপ্টেম্বর রাতে ৩০৫ পিস ইয়াবাসহ হাসিনা বেগমকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।
সূত্রমতে, নান্নু মৃধার অবর্তমানে গৌরনদীসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলের ইয়াবা ডিলার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে কটকস্থল গ্রামের ইঙ্গুল মাঝির পুত্র হীরা মাঝি ও তার সহদর মানিক মাঝি। তারা দেশের বিভিন্নস্থান থেকে ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকদ্রব্য ও জাল টাকা আমদানি করে নিজস্ব সহযোগিদের মাধ্যমে বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় সরবরাহ করে আসছিলো।
সূত্রে আরও জানা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলের ইয়াবা স¤্রাট মানিক মাঝি ও তার সহদর হীরা মাঝি এবং তাদের সহযোগিদের গ্রেফতার করায় স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের রোষানলে পরেন গৌরনদী মডেল থানার সাবেক ওসি ফিরোজ কবির। যে কারণে মাত্র চার মাসের মধ্যে গৌরনদী থানা থেকে বদলি করা হয় মাদক বিরোধী অভিযান চালিয়ে সফলতা অর্জনকরা ওসি ফিরোজ কবিরকে। পরবর্তীতে একটি বিশেষ মহলের অপতৎপরতায় তার (ফিরোজ কবির) বিরুদ্ধে নাটকীয়ভাবে দুদক দিয়ে একটি মামলা দায়েরও করানো হয়েছিলো। এ কারণে মাদক স¤্রাট মানিক ও হীরা মাঝিকে পূর্ণরায় গ্রেফতার করতে সাহস দেখায়নি পুলিশ প্রশাসন।
এরইমধ্যে ২০১৮ সালের ২৫ ডিসেম্বর বিকেলে র‌্যাব-৮ এর চৌকস সদস্যরা মাদক স¤্রাট হীরা মাঝি, তার সহযোগি বিপ্লব বেপারী ও পলাশ কুমার মিত্রকে আটক করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি বিদেশী পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, ছয় রাউন্ড এ্যামোনিশন, তিন হাজার ৪০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ১২২ বোতল ফেন্সিডিল, চার কেজি গাঁজা, দুই বোতল বিদেশী মদ, ২৫ হাজার জাল টাকার নোট, মাদক বিক্রির ৫৬ হাজার ৭৮৫ টাকা, ১২টি মোবাইল সেট ও ১১টি সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় র‌্যাব-৮ এর সিপিএসসি’র ডিএডি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেন। এরইমধ্যে পূর্বের একটি মামলায় হীরা মাঝির একবছরের সাজা প্রদান করেন আদালতের বিচারক।
সূত্রমতে, হীরা মাঝি বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে থেকে দিকনির্দেশনা দিয়ে তার সহদর মানিক মাঝির মাধ্যমে পুনরায় মাদক ব্যবসা শুরু করে। মানিক মাঝি মাহিলাড়া এলাকার একটি ভাড়া বাসায় আত্মগোপনে থেকে সহযোগিদের মাধ্যমে মাদকের রমরমা ব্যবসা শুরু করে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চলতি বছরের ১৯ মার্চ র‌্যাব-৮ এর সদস্যরা অভিযান চালিয়ে মানিক মাঝিকে আটক করেন। এ সময় ৩৫৫ পিস ইয়াবা, ১০৫ বোতল ফেনসিডিল এবং মাদক বিক্রির নগদ এক লাখ ৪০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় র‌্যাব-৮ এর সিপিএসসি’র ডিএডি মামুনুর রশিদ খান বাদি হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেছেন।
সূত্রে আরও জানা গেছে, হীরা মাঝির পর মানিক মাঝিও গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকার সুবাদে মাদক ব্যবসার পুরো দায়িত্ব পালন করে তাদের ছোট ভাই মনির মাঝি। চলতি মাসের ৭ সেপ্টেম্বর বিকেলে র‌্যাব-৮ এর সদস্যরা অভিযান চালিয়ে ইয়াবাসহ মনির মাঝিকে আটক করেছে। বর্তমানে হীরা মাঝিসহ তার অপর দুইভাইয়ের অবর্তমানে তাদের অন্যান্য সহযোগিরা নিরবে মাদকের রমরমা ব্যবসা করে আসছে।
এদিকে বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে সদ্য জামিনে বের হওয়া নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তিরা জানায়, মাদক স¤্রাট নান্নু মৃধা ও হীরা মাঝি কারাগারে থেকে তাদের সহযোগিদের মাদক ব্যবসার কৌশল সম্পর্কে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।
প্রশাসনের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্রে জানা গেছে, মাদক বিরোধী অভিযান নিয়ে রহস্যজনক কারণে কতিপয় সংবাদ কর্মীরা পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে আপত্তিকর সংবাদ প্রকাশ করে অভিযানের গতি কমিয়ে দিচ্ছেন। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও ওই সংবাদের জেরধরে তদন্তের নামের একের পর এক থানা পুলিশকে হয়রানী করায় মাদকের বড় ধরনের অভিযানে নামতে চাচ্ছেন না থানা পুলিশ।
এ ব্যাপারে গৌরনদী মডেল থানার ওসি গোলাম ছরোয়ার জানান, মাদককে কোন ছাড় নয়। মাদক কারবারিরা পুলিশের জালে ধরা পড়বেই। একসময় মাদক ব্যবসায়ীরা এ অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিলো। ওইসব ব্যবসায়ীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে গ্রেফতার হয়ে এখন কারাগারে থাকায় মাদক ব্যবসা অনেকটাই নিয়ন্ত্রনে আনা সম্ভব হয়েছে। ওসি আরও জানান, এখনও যারা আত্মগোপনে থেকে মাদক ব্যবসা করছে তাদের গ্রেফতারের জন্যও পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।