২০১৪ সালে বভনগুলো ঝুঁকিপূর্ন বলে সাইনবোর্ড টানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ বন্দর কর্তৃপক্ষের ৩৬টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ৫শতাধিক শ্রমিক পরিবারের মানবেতর বসবাস

0
566

মংলা প্রতিনিধি :
দশ বছর ধরে চরম মানবেতর অবস্থায় ঝুকি পুর্ন বভনে বসবাস করছে মংলা বন্দরের দেশী-বিদেশী বানিজ্যিক জাহাজে কর্মরত শ্রমিকরা। তারপরও এই ভবন ছেড়ে যাওয়ার কোন উপায় নেই তাদের। ২০১২ সাল থেকে বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। গত ২০১৪ সালের জুন মাস থেকে ভবনে ঝুঁকিপূর্ন সাইনবোর্ডও টানিয়েছিলেন বন্দরের সম্পত্তি শাখা বিভাগ। বিদ্যুৎ ও পানি ছাড়াও তাদের থাকতে হচ্ছে এসব পরিত্যক্ত ভবন গুলোতে। বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের (ওয়ারিশদের) প্রাপ্য পাওনা পরিশোধ না করায় শ্রমিকরা চলে যেতেও পারছেনা। বৃষ্টির মৌশুম চলছে, যে কোন মুহুর্তে বড় ধরনের দুর্গটনার অসংঙ্কা। কথাগুলো বলছিলেন মংলা বন্দরের ৩৫ বছর বয়সের ওয়ারিশ শ্রমিক আজিজুল ওরফে কালাম রোলিয়া শ্রমিক। ঝুঁকির মধ্যে এভাবে মংলা বন্দরের ৩৬টি পাকা-আধা পাকা ভবনে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর ভাবে বসবাস করছে পাচঁ শতাধিক শ্রমিক। অন্যদিকে মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, দীর্ঘ বছর ধরে বসবাসের ভাড়া ও বিদ্যুৎ পানির বিল সমন্বয় করলে বন্দর কর্তৃপক্ষই তাদের কাছে উল্টো টাকা পাবে। সে বিষয়ে তারা বন্দর কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগও করছে না আবার এই ঝুঁকিপূর্ন ভবন ছেড়েও যাচ্ছে না।
মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সম্পত্তি শাখা সূত্রে জানা যায়, আশির দশকের মধ্যভাগ থেকে নব্বইয়ের শেষ ভাগ পর্যন্ত বন্দরের শ্রমিকদের বাসস্থানের সমস্যা দূর করার জন্যে পুরাতন মংলা বন্দর আবাসিক এলাকায় ডক শ্রমিক পরিচালনা বোর্ডের অর্থায়নে পাঁচটি ৫তলা ভবন, ৪টি ৩ তলা ভবন, ছয়টি ২তলা ভবন, নয়টি ১তলা ভবন ও বারটি আধা-পাকা (টিন-শেড) ভবন নির্মান করা হয়। এসব ভবনে কুমিল্লা, নোয়াখালী,চিটাগং, বরিশাল, মোড়েলগঞ্জ, শরণখোলাসহ বিভিন্ন জেলার এক হাজার ৭শত আটান্ন জন নিবন্ধিত ও ৮শত ছিয়ানব্বই জন অনিবন্ধিত শ্রমিক তাদের পরিজন নিয়ে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বসবাস করে আসছিল।
২০০৮ সালে রাষ্ট্রপতির এক অধ্যাদেশে মংলা ও চট্রগ্রাম বন্দরের ডক শ্রমিক পরিচালনা বোর্ড বিলুপ্ত ঘোষনা করা হয়। এরপর থেকে ভবনগুলো বন্দর কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রনে চলে যায়। ওই অধ্যাদেশের বলে এসব শ্রমিকদের নিবন্ধনও বাতিল হয়ে যায়। শ্রমিকরা তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে তখন মহা-বিপদের মধ্যে জীবন যাপন শুরু করে। বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের নির্দেশ দেয়-স্বেচ্ছা অবসরে যাওয়া ও এসব ভবন ছেড়ে দেওয়ার জন্যে। কিন্ত নিবন্ধিত কিছু কিছু শ্রমিকরা তাদের পাওনাধী পেলেও ৮শত ছিয়ানব্বই জন অনিবন্ধিত শ্রমিক তাদের পরিজন নিয়ে এখন বসবাস করছে এসব ঝুকিপুর্ন বভনে। আবার অনেক নিবন্ধিত শ্রমিকরা পাওনাধী পাওয়ার পরে বন্দরের জাহাজের কাজে সংশ্লিষ্টতা থাকার কারনে এখন ও বসবাস করছে ওখানে।
সরেজমিনে দেখা যায়, যে সমস্ত ভবনে শ্রমিকরা তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করছে সবকটিতেই ঝুঁকিপূর্ন ভবন হিসাবে বন্দর কর্তৃপক্ষের সাইনবোর্ড লাগানো। ২০০৮ সালের পর আর সংস্কার না করায় অধিকাংশ ভবনই ঝরা-জীর্ন। দেয়ালের প্লাষ্টার খসে পড়ছে। জানালার গ্রীল-কাঠ নেই। ঘরের দেয়ালে ফাটল, ভিতরে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। কোন ভবনেই বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ নেই। এখন বন্দরে সতর্ক সংকেত বহল রেখেছে অবহাওয়া অফিস,লাগাতার বৃষ্টি হচ্ছে,তারপরও শ্রমিকরা ঝুঁকি নিয়ে এসব ভবনে ছোট ছোট ছেলে মেয়ে নিয়ে থাকছেন।
বিলুপ্ত শ্রমিক সংঘের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাহাবউদ্দিন বলেন, তত্তাবধায়ক সরকারের আমলে শ্রমিকদের স্বার্থ সম্পূর্ন উপক্ষো করে এ অধ্যাদেশ জারী করা হয়েছিল। দীর্ঘ দুই-তিন যুগ ধরে যারা বন্দরে শ্রমিক হিসাবে শ্রম দিয়ে এসেছে, হঠাৎ করে তাদের সকল সুযোগ সুবিধা কেড়ে নিয়ে মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য করা হলো। অধিকাংশ শ্রমিকই স্বেচ্ছা অবসরের টাকা গ্রহন করে চলে গিয়েছে। যাদের পাওনাধী পরিশোধ হয়নি তারা যেতে পারেনী। আর বন্দর কর্তৃপক্ষ গত ১০ বছরে যদি এসব ভবন সামান্য সংস্কারও করত তাহলে এসব ভবনের আজ এ অবস্থা হত না। বিলুপ্ত শ্রমিক সংঘের সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান মানিক জানায়,সংস্কার বিহিন এ বভনগুলেতো ঝুকিপুর্ন অবস্থায় শ্রমিকরা বসবাস করছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের উচিত চট্রগ্রামের ন্যায় মংলার শ্রমিকদের কন্যান মুলক কর্মকান্ড চালু করা, শ্রমিকদের ওয়েলফেয়ার,পানি বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য মৌলিক সুবিধী যাতে পেতে পার তার দ্রæত ব্যাবস্থা করা জরুরী। তা না হলে বভনগুলো যে অবস্থা, যে কোন মুহুর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার সম্মখিন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ৩নং বভনে বসবাসকারী অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী রমিজা আক্তার বলে, বিদ্যুৎ নেই। রাতে ঠিকমত পড়তে পারি না। রাতে পাশের কবরস্থান পুকুর থেকে কষ্ট করে পানি সংগ্রহ করতে হয়। খুব কষ্ট হয় এভাবে থাকতে। ভয়ও করে কখন ভেঙ্গে পড়ে। আমার আব্বা হেমায়েত হোসেন বন্দরে শ্রমিক হিসাবে কাজ করে। আমাদের বাড়ী কুমিল্লায়। বাড়ীতে কোন জায়গা-জমিও নেই। সেজন্যে আব্বা এখান থেকে যেতেও চায় না। ভবনে বসবাসরত বন্দরের হ্যান্ডলিং শাখার শ্রমিক আঃ কাদের বলেন, ভবন ঝুঁকিপূর্ন জানি। কিন্তু যাব কোথায়? আমার বাড়ী বরিশালে। শ্রমিক হিসাবে মংলায় কাজ করছি সেই নব্বই সাল থেকে। এত বছর ধরে মংলা বন্দর আমাদের শ্রমের ঘামে টিকে আছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ আমাদের প্রতি একটু সদয় হবে না? বন্দর কর্তৃপক্ষ যদি ভবনগুলো সংস্কার করে দেয় তাহলে তাদের নিয়ম মেনেই আমরা থাকব। মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (সম্পত্তি) প্রনব কুমার রায় বলেন, ডক শ্রমিক পরিচালনা বোর্ড বিলুপ্ত হওয়ার কারনে এই শ্রমিকেরা আইনগত ভাবে আর মংলা বন্দরের শ্রমিক নয়। ২০১১ সালে স্বেচ্ছা অবসরের টাকা প্রদানের পর আমরা তাদের এই সকল ভবন ছেড়ে দিতে বলেছিলাম। কিন্ত তারা এই ভবন ছাড়েনি। এই সকল ভবনের দীর্ঘ এক যুগের বিদ্যুৎ ও পানির বকেয়া বিল ২০/২৫ লক্ষ টাকার উপরে ছিল। নিরীক্ষার পর ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে আমরা বাধ্য হই বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে। আর বন্দরের পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় আমরা ভবন সংস্কারের কাজে হাত দিতে পারিনি। মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কমডোর এ কে এম ফারুক হাসান বলেন, বিষয়টি মানবিক। আমরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দিয়ে ঝুঁকিপূর্ন ভবন খালি করতে পারতাম। কিন্তু এ শ্রমিকেরা বর্তমানে বন্দরের নিবন্ধিত না হলেও তাদের শ্রমেই বন্দর আজকের এপর্যায়ে। তারাই মূলত: বন্দরের জাহাজের পণ্য ওঠা-নামার কাজ করছে। ফলে কয়টি ভবন সংস্কার করা যায়, কোন প্রক্রিয়ায় তাদের বাসস্থানের সমাধান করা যায় সে জন্যে সাবেক চেয়ারম্যান একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছিল। কমিটি পুর্ন রিপোর্ট এখনও দেয়নী। সেই কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে আগামী বছরের মধ্যেই আমরা এই সমস্যার সমাধান করব।