১০ বছরের শেখ রাসেল ও এই সময়ের বাংলাদেশ ভাবনা

0
44

সফিকুর রহমান পলাশ:
আহবায়ক, খুলনা মহানগর
আওয়ামী যুবলীগ
রাসেল নাম শিশুটি অন্য আট দশটা শিশুর মতনই একটা সুন্দরের নাম, চঞ্চলতা উচ্ছলতার নাম। ভিন্নতা অন্য জায়গায়। বাঙ্গালি জাতি ও রাষ্ট্রের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান শেখ রাসেল হিসাবে সে অন্যদের থেকে আলাদা সম্মান ও মর্যাদা বহন করে। অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন বা অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে বঙ্গবন্ধুর ছেলে বলেই কি শিশু রাসেল বেশি সমীহ পাচ্ছে? না হলে দশ বছরে এমন কি করলেন যে তাকে নিয়ে এত মাতামাতি করতে হবে?
আসুন জেনে নেওয়া যাক কিশোর রাসেলের জীবনের নান্দনিক সৌন্দর্যের গল্প:-
তখন হেমন্তকাল চলে। ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর সময়কালে কৃষকের ঘরে যেমন নতুন ফসলের উৎসবে আগমনে মেতে উঠে গ্রাম বাংলার প্রকৃতি তেমনি করে বাঙালীর আনন্দকে আরও চমৎকার রুপ ফুটিয়ে তুলতে ধানমন্ডির সেই ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর রোডের বাড়িতে আনুমানিক রাত দেড়টায় জন্ম হয় একটা ফুটফুটে শিশুর। যার আগমনে পুরো বাড়ি জুড়ে বয়ে যায় আনন্দের জোয়ার। এ যেন রাজার রাজ প্রাসাদে একজন রাজপুত্রের আগমনী বার্তা। ঠিক যেন আনন্দ ময়ীর আগমনে চারিদিকে আজ উৎসের ঢেউ।
রাসেল নামকরণের পেছনের গল্প:
শেখ মুজিব ছিলেন বিখ্যাত নোবেল বিজয়ী দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের ভক্ত। তাঁর অনেক বই তিনি পড়েছেন। বার্ট্রান্ড রাসেল কেবলমাত্র একজন দার্শনিক ও বিজ্ঞানী ছিলেন। পারমাণবিক যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলনের একজন বড় মাপের বিশ্ব নেতার মতন ছিল তার ভূমিকা। তখনকার প্রেক্ষাপটে বিশ্ব শান্তি রক্ষার জন্যে বার্ট্রান্ড রাসেল গঠন করেছিলেন ”কমিটি অব হানড্রেড”। রাসেলের জন্মের দু’বছর পূর্বে ১৯৬২ সালে কিউবাকে কেন্দ্র করে আমেরিকার তখনকার প্রেসিডেন্ট কেনেডি এবং সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী ক্রুশ্চেফ-এর মধ্যে স্নায়ু ও কূটনৈতিক যুদ্ধ চলছিল। যেটি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই বিশ্বমানবতার প্রতীক হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন বিখ্যাত দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল। তার এই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাওয়া অকুতোভয় একজন লেখক দার্শনিকের প্রেমে পড়েন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। এই কারণেই মূলত বঙ্গবন্ধু তার কনিষ্ঠ পুত্রের নাম করণ করেন রাসেল।
রাসেলের বেড়ে ওঠা:-
রাসেলের জন্মের পর থেকেই বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক কারনে জেল বন্দী থাকতেন। এজন্যই শিশু রাসেলের বাবার সান্নিধ্য পাবার সুযোগ খুব কমই হয়েছে। রাসেলের সব থেকে প্রিয় সঙ্গী ছিলো তার হাসুপা (শেখ হাসিনা)। তার সমস্ত সময় জুড়েই ছিলো হাসুপা। রাসেল হাসুপা’র চুলের বেনী ধরে খেলতে পছন্দ করতেন। সাইকেল চালানো থেকে শুরু করে সব কিছুই করতেন হাসু আপার সাথে।
জীবে প্রেম –
বঙ্গবন্ধুর বাসায় একটি পোষা কুকুর ছিলো টমি নামে। সবার সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব ছিল। ছোট্ট রাসেলও টমিকে নিয়ে খেলতো। একদিন খেলতে খেলতে হঠাৎ টমি ঘেউ ঘেউ করে ডেকে ওঠে, রাসেল ভয় পেয়ে যায়। কাঁদতে কাঁদতে রেহানা আপার কাছে এসে বলে, টমি বকা দিয়েছে। তার কথা শুনে বাসার সবাই তো হেসেই খুন। টমি আবার কিভাবে বকা দিল। কিন্তু রাসেল বিষয়টা খুব গম্ভীরভাবেই নিয়েছিলো। টমি তাকে বকা দিয়েছে এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না, কারণ টমিকে সে খুব ভালোবাসতো। হাতে করে খাবার দিত। নিজের পছন্দমতো খাবারগুলো টমিকে ভাগ দেবেই, কাজেই সেই টমি বকা দিলে দুঃখ তো পাবেই। বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে কবুতর পালা হতো। ছোট্ট রাসেল সব সময় এই কবুতরের বেড়ে উঠা, তাদের খেতে দেওয়া, উড়ে চলা উপভোগ করতেন। বাড়ীতে কখনো কবুতর জবাই দিলে রাসেল সেই গোস্তো কখনোই খেতেন না বরং সে খুব কষ্ট পেতেন। এই যে ছোট্ট একটা শিশুর মনে যে অসাধারণ মানবিক মূল্যবোধ তা সত্য ভালোবাসার মতন-
খেলার সাথি:-
রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামের ফলে রাসেলের বাবাকে পাবার সুযোগ খুব কমই হয়েছে, তাই বাবাকে যখনই কাছে পেত সারাক্ষন তার পাশে ঘোরাঘুরি করত। বঙ্গবন্ধু ও রাসেল কে এক পলকের জন্য সরাতে দিতেন না যখনই সুযোগ পেতেন তাকে সব সময় পাশে পাশে রাখতেন। বঙ্গবন্ধু ও হাসু আপা ছিলো তার সবচেয়ে আপন খেলার সাথী। এরই মাঝে জন্ম হয় শেখ হাসিনার পুত্র জয়ের। জয়কে পেয়ে তো রাসেল মহা খুশি। সে তার খেলার নতুন এক সঙ্গী পেয়েছে। সারাটা সময় জুড়েই জয়ের সাথে মেতে থাকতো রাসেল।
১৯৭১ সালে যখন মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় তখন জয় খুব ছোটো। রাসেল সব সময় জয় কে নিয়ে চিন্তা করে। কারন তাদের বাসার ছাদে বাংকারের মেশিন বসানো ছিলো। ফলে দিনরাত গোলাগুলিতে প্রচন্ড আওয়াজ হতো আর তাতে শিশু জয় বারবার কেঁপে কেঁপে ওঠতো। আর এ ব্যাপারে রাসেল খুবই সচেতন ছিলো। যখনই সাইরেন বাজত বা আকাশে মেঘের মতো আওয়াজ হতো, রাসেল তুলা নিয়ে এসে জয়ের কানে গুঁজে দিত। সব সময় পকেটে তুলা রাখত। এতটুকু ছেলে কিভাবে প্রকৃতির কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে মানবিক মানুষ হিসাবে গড়ে তুলেছেন এই ঘটনা তার প্রমাণ।
রাসেলের প্রিয় শখ:-
অনেক শখের মধ্যে রাসেলের মাছ ধরার খুব শখ ছিল, কিন্তু সে মাছ ধরে আবার তা পুকুরেই ছেড়ে দিত। এতেই সে মজা পেত। আসলে এটাই তার খেলা। এছাড়া সাইকেল চালানো তে দারুন পটু ছিল। সব সময় শিশুদের নিয়ে খেলতে পছন্দ করতেন। জীবনের লক্ষ ছিল একজন আর্মি অফিসার হওয়ার। সে যখন টুঙ্গিপাড়া গ্রামে যেতেন তখন গ্রামের শিশুদের জন্য ড্রেস কিনে নিয়ে যেতেন, খেলনা বন্দুক কিনে নিয়ে যেতেন। এরপর বাচ্চাদের জড়ো করতো এক জায়গায়, তাদের জন্য খেলনা বন্দুক বানাতো আর সেই বন্দুক হাতেই তাদের প্যারেড করাতো। আসলে রাসেলের পরিবেশটাই ছিলো এমন। রাসেলের খুদে বাহিনীর জন্য জামা-কাপড় ঢাকা থেকেই কিনে দিতে হতো। প্যারেড শেষে সবার জন্য খাবারের ব্যবস্তা থাকতো। তখন যদি রাসেলকে কেউ জিজ্ঞেস করতো বড় হয়ে তুমি কি হবে? রাসেল বলতো ‘আর্মি অফিসার হবো’।
পছন্দের প্রিন্স স্যুট
রাসেল পোষাকের ব্যপারে আগ্রহী ছিলো। নতুন পোষাক খুব পছন্দ করতো। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু যে পোষাক পরতো রাসেলও তা পছন্দ করতো বলতে গেলে অনুসরণ করতো। বিভিন্ন সময়েই রাসেল তার বাবার সাথে নানান প্রোগ্রামে যেত। তাই তার মা রাসেলকে একটা প্রিন্স স্যুট বানিয়ে দেন। যাতে বাবার সাথে তাকে খুব সুন্দর মানায়।
জাপান সফর:-
মুক্তিযুদ্ধের সময় জাপান বাংলাদেশকে নানানভাবে সাহায্য করে, তাই যুদ্ধ শেষে সেই জাপান বঙ্গবন্ধুর গোটা পরিবারকেই জাপানে আমন্ত্রন জানায়, বিশেষ করে রাসেলের কথা উল্যেখ করে। সেই সফরে রাসেল ও তার বোন রেহানা জাপান যায়। সেখানে রাসেলের জন্য বিশেষ কর্মসূচিরও আয়োজন করা হয়। সেই সফরে শিশুদের সাথে রাসেল অনেক আনন্দ করেছিল। সারাটা সময় রাসেল সেখানে খুব ব্যস্ত সময়ই পার করে কিন্তু রাতে তার মায়ের কথা খুব মনে পরতো, ফলে তার মন খারাপ হয়ে যেত। বঙ্গবন্ধু একবার একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন আপনি সব সময় আপনার এই ছোট রাসেল কে সাথে রাখেন কেন—-?
উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ওর জন্মের সময়টা আমার বেশিরভাগ জেলে কেটেছে। জেল থেকে ছাড়া পেলে ওর কাছে গেলেই মন ভালো হয়ে যেতো। রাসেল আমাকে এক মুহুর্তের জন্য ছাড়তে চায় না। আমিও ওকে ছাড়তে চাই না তাই সব সময় সব সফরে ওকে নেওয়ার চেষ্টা করি।
সেদিন যদি হাসুপা’র সাথে জার্মানী যেত
সময়টা ১৯৭৫, আগষ্টের কিছুদিন আগে। হাসুপা তার স্বামীর কাছে জার্মানী চলে যাবেন। সাথে বোন রেহানাও যাবে। অবশ্য হাসুপা তার সঙ্গে রাসেলকেও নিতে চেয়েছিলেন কিন্তু তখন রাসেলের শরীরের অবস্তা খুব ভালো ছিলো না, তার জন্ডিস ধরা পরেছিলো। তাই সেদিন আর রাসেলের তার হাসুপা’র সাথে যাওয়া হয়নি। আর এটাই হয়তোবা শিশু রাসেলের জীবনের কাল হয়ে দাড়িয়েছিলো। ঐদিন শিশু রাসেল যদি হাসুপা’র সাথে জার্মানী যেত তাহলে হয়তো তাকে অমানবিকভাবে গুলিবিদ্ধ হয়ে জীবন দিতে হতো না।
রাসেল বেঁচে থাকলে তার বয়স হতো ৫৬ বছর। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বেড়ে ওঠা ৫৬ বছরের একজন সুদর্শন পুরুষ সুশিক্ষিত সুনাগরিক হিসাবে গড়ে উঠে হয়তো এই দেশের দায়িত্ব নিতেন অথবা তার হাসু আপার পাশে দাঁড়াতেন নিরাপত্তার রক্ষা কবচ হয়ে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ জননেত্রী শেখ হাসিনা সব সময় যাকে নিয়ে চলতেন সেই ছোট রাসেল ৫০ বছরে আসলে সেই হতেন এই বাংলা মায়ের সন্তান। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে তার রেখে যাওয়া বাংলাদেশ কে আরও উন্নত সমৃদ্ধির ছোঁয়া দিতে হয়তো রাসেলই হতেন বার্ট্রান্ড রাসেলের মতন বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার একজন অগ্রদূত। এই বাংলাদেশ তোমায় ভোলেনি। সেদিনের সেই পাষাণ হৃদয় গুলোর হৃদয় টলেনি তোমার অশ্রু সিক্ত আর্তনাদে। তোমার সেই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আহবান “আমি মায়ের কাছে যাবো ” আহবান কে তুচ্ছ করে গুলি করে নিষ্পাপ কণ্ঠ কে থামিয়ে দিলেন!
রাসেলের সেই আর্তনাদ এখনও আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায় অনুশোচনার বেড়াজালে। আমাদের ক্ষমা চাওয়ার সাধ্য নেই তবে আমরা তোমার ও তোমার পিতার রেখে যাওয়া বাংলাদেশ কে তোমার সারাজীবনের খেলার সাথী হাসু আপার নেতৃত্বে স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলবই ইনশাআল্লাহ।।
আমাদের ক্ষমা করিও রাসেল। নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ বেহেশতের সুবিশাল বাগানে তোমাকে শহীদের মর্যাদা দিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছেন।
শুভ জন্মদিন প্রিয় শেখ রাসেল।
বঙ্গবন্ধুর পবিত্র রক্তের সর্বশেষ শ্রেষ্ঠ ধন।
সূত্র – দেশরতœ জননেত্রী শেখ হাসিনার স্মৃতিচারণ, ছোটদের শেখ রাসেল, উইকিপিডিয়া থেকে।