হরিণ শিকারী চক্র বেপরোয়া, পূর্বসুন্দরবনে রেড এলার্ট জারী বন বিভাগের সকল ছুটি বাতিল

0
530

শেখ মোহাম্মদ আলী, শরণখোলা থেকে:
আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে শিকারীচক্র সুন্দরবনে হরিণ শিকারে মেতে উঠেছে। পূর্বসুন্দরবনে রেড এলার্ট জারীর মধ্যেও মঙ্গলবার সকালে বনরক্ষীরা শরণখোলায় এক চোরাশিকারীকে মাংশসহ আটক করে আদালতে চালান দিয়েছে । গত এক পক্ষকালের মধ্যে সুন্দরবনে ছয় মণেরও বেশী হরিণের মাংশ উদ্ধার করা হয়। বন বিভাগের সকল ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সোমবার সন্ধ্যায় সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের তেতুলবাড়ীয়া এলাকায় ফাঁদ পেতে হরিণ শিকারের সময় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শরণখোলা ষ্টেশন কর্মকর্তা সামসুল আলমের নেতৃত্বে বনরক্ষীরা অভিযান চালিয়ে একটি ডিংগি নৌকা সহ এক চোরাশিকারীকে আটক করে। আটক শিকারীর নাম বাদশা শিকদার (৪৫) সে শরণখোলা উপজেলার উত্তর তাফালবাড়ী গ্রামের আবুল হাসেম শিকদারের পুত্র বলে বনবিভাগ জানায়। এ সময় আরো দু,শিকারী বনের মধ্যে পালিয়ে যায়। বনরক্ষীরা ডিংগি নৌকায় তল্লাশী চালিয়ে ৮ কেজি হরিণের মাংশ ও প্রায় দুইশ ফুট হরিণধরা ফাঁদ উদ্ধার করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, সুন্দরবনে ফাঁদ পেতে হরিণ শিকারের জন্য বরগুনার পাথরঘাটার চরদুয়ানী, জ্ঞানপাড়া, পদ্মা, চরলাঠিমারা, বাদুরতলা, রুইতা, কাঠালতলী, শরণখোলার সোনাতলা, পানিরঘাট, মোংলার চাঁদপাই ও খুলনার কয়রা এলাকায় গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী শিকারীচক্র। চক্রের শিকারীরা জেলে বেশে মাছের পাশ নিয়ে সুন্দরবনে গিয়ে বনের গহীনে নাইলনের দড়ি দিয়ে তৈরী ফাঁদ পেতে হরিণ ধরে জবাই করে মাংশ বস্তায় ভরে বরফচাপা দিয়ে রাতের আধারে বন থেকে ফিরে আসে। পরে গোপনে বিভিন্ন স্থানে ৭/৮শ টাকা কেজি দরে বিক্রী করে। ক্রেতারা শিকারীদের আগে থেকেই অগ্রিম টাকা দিয়ে বুকিং দিয়ে রাখে। হরিণের এ মাংশ চক্রটি রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত সরবরাহ করে থাকে বলে সূত্রটি জানায়। শিকারীচক্র সারা বছর কমবেশী হরিণ মারলেও ঈদের সময় তারা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এ সময় হরিণের মাংশের চাহিদা বেড়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, হরিণ শিকারের বিষয়টি বনবিভাগের অনেক টহল ফাঁড়ির বনরক্ষীরা জেনেও না জানার ভান করে থাকেন। শিকারীরা বনের চরখালী, কচিখালী, চান্দেশ্বর, কটকা,সুপতি, টিয়ারচর, কোকিলমনি, আন্ধারমানিক সহ দূর্গম বনাঞ্চলে বেশী ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার করে থাকে বলে ওই সূত্র জানায়। শিকারীরা সারা বছর কমবেশী হরিণ শিকার করলেও ঈদের সময় বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এ সময় হরিণের মাংশের চাহিদা বেড়ে যায়। শিকারীদের নাম পরিচয় এলাকায় অনেকটা ওপেন সিক্রেট । পাথরঘাটার পদ্মা গ্রামের ইউসুফ ও শরণখোলার পানিরঘাট এলাকার শিকারী তানজের বয়াতীর নাম মানুষের মুখে মুখে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত ১৮ মে ভোর রাতে বনরক্ষীরা পাথরঘাটার চরলাঠিমারা বনফুল আবাসন এলাকার একটি খাল থেকে হরিণধরা ফাঁদ সহ একটি ইঞ্জিন চালিত বোট আটক করে। ওই বোটে তল্লাশী চালিয়ে পাঁচ মণ হরিণের মাংশ, দুটি হরিণের চামড়া ও মাথা, এবং ২ বস্তা হরিণধরা নাইলনের ফাঁদ উদ্ধার করা হয়। ৫ মণ মাংশ উদ্ধার হলেও শিকারীরা ৭/৮ টি হরিণ জবাই করেছে বলে বনরক্ষীদের ধারনা। আটক ইঞ্জিন চালিত বোটটি ওই এলাকার চোরা শিকারী আঃ রহমান শিকদারের বলে বন বিভাগের চরলাঠিমারা বিটের কর্মকর্তা বদিউজ্জামান খান নিশ্চিত করেছেন। অপর ঘটনায়, গত ১২ মে রাতে সুন্দরবনের আন্ধারমানিক এলাকায় ফাঁদ পেতে হরিণ শিকারের সময় কোষ্টগার্ড পশ্চিম জোনের সদস্যরা অভিযান চালিয়ে জবাইকৃত হরিণের মাথা, চামড়া ও ১৫শ হরিণধরা নাইলনের ফাঁদ উদ্ধার করে। এ সময় শিকারীরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এ ছাড়া সম্প্রতি সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের চরখালী এলাকা থেকে ৩০ কেজি হরিণের মাংশ সহ বনরক্ষীরা এক চোরা শিকারীকে আটক করে বলে চরখালী টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কাশেম মল্লিক জানান। আটক শিকারীর বাড়ী পাথরঘাটার কাঠালতলী এলাকায়।
পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের এসিএফ জয়নাল আবেদীন জানান, সুন্দরবনে হরিণ শিকার ও বনজ সম্পদ পাচাররোধে সুন্দরবনে রেডএলার্ট জারী সহ বনবিভাগের সকল ছুটি বাতিল ঘোষনা করা হয়েছে। বনবিভাগের নজরদারী ও টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে।