স্বাস্থ্য সেবার তথ্য প্রদানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে

0
19

কোভিড-১৯ অভিমাত্রাকালে গত ৮ জুলাই ঢাকা জেলা সিভিল সার্জন সাক্ষরিত এক আদেশে সরকারি হাসপাতালগুলোকে স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক তথ্য আদান-প্রদানে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কোনো কিছু জানতে হলে সিভিল সার্জন বা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য কোনো সাংবাদিক সংগঠনকে এর প্রতিবাদ করতে দেখা যায় নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ দেশের স্বাস্থ্যখাতের বিরুদ্ধে নানা দূর্নীতি, অনিয়মের অভিযোগের শেষ নেই। দূর্নীতি বিরোধী আন্তর্জাতিক সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এ নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ জানিয়েছে। বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে তাদের সাথে একমত হতে হচ্ছে। কিন্তু সাংবাদিক সংগঠনগুলো এর প্রতিবাদ বা প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করে নি। বর্তমান দেশে কোভিড-১৯ অধিমাত্রায় সংক্রমণ ভয়াবহরূপ ধারণ করেছে এবং আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় প্রতিদিনই রেকর্ড ছড়াচ্ছে। এমন সময় ঢাকা জেলাধীন সরকারি হাসপাতালগুলোয় স্বাস্থ্য ও রোগীর সেবা বিষয়ক যে কোনো তথ্য গণমাধ্যমের কাছে প্রকাশে বিধিনিষেধ আরোপ মুক্ত গণমাধ্যম ও অবাধ তথ্য প্রবাহের সাংবিধানিক অধিকার এবং তথ্য অধিকার আইন লব্ধ তথ্য জানার অধিকার এর পুরোপুরি লঙ্ঘন। একই সাথে তা স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার প্রতিশ্রæতির সাথে সাংঘর্ষিক এবং গণমাধ্যমের অবাধ তথ্য সংগ্রহ ও প্রচারে ইচ্ছাকৃতভাবে বাধা দানের শামিল।
দেশে কোভিড-১৯ অতিমারির সূচনালগ্নেও রাষ্টীয় ভাবে এমন বিধি নিষেধ আরোগের চেষ্টা ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে বাতিল করতে হয়েছে। অতিমারি নিয়ন্ত্রণে চলা লকডাউনে এমনিতেই সাধারণের জন্য তথাপ্রাপ্তির সুযোগ সংকুচিত। সেখানে গণমাধ্যমকে তথ্য না দেওয়ার এমন নির্দেশ মানুষকে স্বাস্থ্য সেবার হাল-নাগাদ তথ্যপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করবে, তেমনি মাঠ পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতার সত্যিকারে চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে, যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
স্বাস্থ্যখাতে চলমান অনিয়ম, দূর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার তথ্য গোপনের অভিপ্রায়ের অংশ হিসেবে এ আদেশ দেয়া হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা উচিত। এ নির্দেশ জারির পরদিনই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ১০টির বেশী জাতীয় দৈনিকে রাষ্ট্রীয় তথা জনগণের অর্থব্যায়ে করোনার ভয়াবহতা ঠেকাতে বিধি-নিষেধ কঠোরভাবে পালনের আকুল আবেদন শীর্ষক বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে সা¤প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্যখাতে কোনো অনিয়ম দূর্নীতি সংগঠিত হয়নি বলে সাফাই গাইবার অপচেষ্টা করেছেন। অথচ গত ১ বছরে স্বাস্থ্য খাতের নিয়োগ, ক্রয়, অবকাঠামো নির্মাণ ও সেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগুনতি অনিয়ম-দূর্নীতি ও অবস্থাপনার খবর পত্রিকা খুললেই চোখে পড়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় সম্পর্কিত সংসদীয়-স্থায়ী কমিটিতে উত্থাপিত প্রতিবেদনেও যা প্রতিভাত হয়েছে। তথ্য প্রদানে নিষেধাজ্ঞা আসলে স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি ,অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা ঢাকার প্রচেষ্টা ছাড়া কিছু নয়। বিগত বছরগুলোতে স্বাস্থ্যখাতের সংগঠিত অধিকাংশ দুর্নীতি গনমাধ্যমের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। তখন যখন সরকারিভাবে চিকিৎসাব্যবস্থা স¤প্রসারণের ঘাটতিতে সংক্রমনের ১০ বছর ৪ মাস পরও সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সংকটের কারণে একজন সাধারন কোভিড রোগী গড়ে ৫ লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণে বাধ্য হচ্ছেন। হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলার অভাবে কোভিড রোগীর মৃত্যুর ঘটনা উচ্চ আদালতের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। কোভিড-১৯ মোকাবেলা কার্যক্রমে বিগত দিনগুলোতে সংগঠিত অনিয়ম দুর্নীতির তদন্ত ও বিচারের ধীরগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। তখন বিধিনিষেধের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহে বাধা সৃষ্টি স্বাস্থ্যসেবার বিদ্যমান অনিয়ম দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার তথ্য গোপন কিংবা অস্বীকার করার সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় দুর্নীতিবাজদের বিশেষ সুবিধা দেবে।
বিধি-নিষেধের মাধ্যমে সাংবাদিকদের স্থানীয়ভাবে তথ্য সংগ্রহে বাধা অনিয়ম দুর্নীতি ও বিদ্যমান অব্যবস্থাপনা ও তথ্য গোপনের বিস্তৃতি সুযোগ তৈরি করবে। যা অতিমারি মোকাবেলায় গৃহীত সমস্ত ইতিবাচক উদ্যোগ নষ্ট করবে। তাই আমরা চাই এ আদেশ অতি শীঘ্রই প্রত্যাহার করা হোক। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
তাই দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রথম শর্ত হচ্ছে তথ্যের সহজ প্রাপ্তি। আর সেই তথ্য প্রাপ্তির পথ রুদ্ধ করে কি করে দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব হবে?

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here