স্বাধীনতার ৫১ বছরেও স্বীকৃতি মেলেনি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল পরিবারের

0
29

শেখ নাদীর শাহ্ :


স্বাধীনতার ৫১ বছরেও স্বীকৃতি পাইনি ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে দেশে ফেরার পথে পাক বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল সরদার ও তার পরিবার। দেশ স্বাধীনের খবরে ভারত থেকে দেশে ফেরার পথে পাকিদের হাতে অপহৃত কিশোরী কন্যা ও তাকে উদ্ধারে ব্যার্থ ভাইয়ের গুলিবিদ্ধ হওয়ার বেদনা বয়ে বেড়াচ্ছেন তাঁর বিধবা বয়োবৃদ্ধা স্ত্রী জোহুরা বেগম।

যুদ্ধকালীণ নির্মম বিয়োগান্তক ঘটনার স্বাক্ষী জোহুরা বেগমের কর”ণ আর্তি, জীবনের পড়ন্ত বেলায় স্বামীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি চোখে দেখে যেতে চাই। গতকাল কান্নাজড়িত কন্ঠে কথা হয় এ প্রতিবেদকের সাথে। যুদ্ধকালীণ বলা না বলা কথা মালায় বর্ণনা দিতে গিয়ে বার বার মূর্ছা যাচ্ছিলেন এ বয়োবৃদ্ধা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পত্নী। ১৯৭১ সাল। চারিদিকে শুর” হয়ে গেছে মুক্তিকামী মানুষের সাথে পাক বাহিনী ও তাদের দোসরদের তুমুল লড়াই। গোটা দেশ যেন রণ ক্ষেত্র। সেদিন মুক্তিকামী অন্যদের সাথে বসে থাকতে পারেননি সাতক্ষীরার তালা উপজেলার খলিলনগর ইউনিয়নের মহন্দীর নিভৃত পল্লীর মৃত কাতার আলী সরদার
ও গুলজান বিবির ছেলে আব্দুল সরদারও। স্বাধীনতাকামী মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে ট্রেনিং নিতে চলে যান ভারতে। সেখান থেকে ট্রেনিং নিয়ে দেশে ফেরার পথে সাতক্ষীরার বিনেরপোতা এলাকায় পৌছালে পাকিস্তানী সেনারা অন্যদের সাথে তাকেও ধরে নির্মম নির্যাতন শেষে নিয়ে যায় যশোর ক্যন্টনমেন্টে। সেখান থেকে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতন শেষে অন্যদের পাশাপাশি তাকেও খুলনার গল্লামারী নিয়ে হত্যা করা হয়। তবে তখনো খবরটি পৌছায়নি তার প্রিয়তমা স্ত্রী ও
সন্তানদের কাছে।

এদিকে স্বামীর মুক্তিযোদ্ধা এমন খবরে স্বাধীনতা বিরোধীরা তাদের বাড়িতে হামলাসহ শুর” করে চরম নির্যাতন। অগ্নিসংযোগ করে তাদের বসত-বাড়িতে। এক পর্যায়ে নিরুপায় হয়ে তার স্ত্রী জোহুরা ২ ছেলে আজগর, রহমত ও ৪ মেয়ে আছিয়া, রশিদা, সুফিয়া ও সাহিদাকে নিয়ে ভারতে পাড়ি জমান। সেখানে আশ্রয় নেন শরনার্থী শিবিরে। সেখানে অবস্থানকালীণ কিছু দিন পর লোক মারফত শিবিরে থেকেই খবর পান তার স্বামী পাকিস্তানীদের হাতে ধরা পড়েছে।

এরপর সেখান থেকে তড়ি-ঘড়ি করে সন্তানদের নিয়ে বেনাপোল বন্দর হয়ে সাতক্ষীরার উপর দিয়ে বাড়ি
ফেরার পথে তারাও ধরা পড়ে পাকিদের হাতে। এসময় পাকিস্তানী সেনারা তার কাছ থেকে তার (সেঝ) সুন্দরী কিশোরী মেয়ে সুফিয়াকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় তার
মেঝ ছেলে আজগর বোনের পিছু নিলে তারা তাকে লক্ষ্য করে গুলি করে। এতে একটি গুলি তার হাত ও আরেকটি তার মাজার মাংসপেশী বিদীর্ণ করে চলে যায়। সঙ্গে
সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে। মূমুর্ষ অবস্থায় সকলে যখন তাকে নিয়ে ব্যাস্ত ততক্ষণে সুফিয়াকে নিয়ে হায়েনারা চলে যায়। এরপর থেকে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। হয়তোবা তাদের পাশবিক নির্যাতনে এক সময় সেও মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে।

এরপর দেশ স্বাধীনের বছর খানেক পর জোহুরা ও তার সন্তানরা লোক মারফত নিশ্চিত হয় তাদের বাবা ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে দেশে ফেরার পথে ধরা পড়ে শহীদ হন। এরপর দেশ স্বাধীনের গত ৫১ বছরেও তাদের খোঁজ রাখেনি কোন সরকার। খবর নেয়নি মুক্তিযোদ্ধা কিংবা সংগঠনের কেউ।

আব্দুল সরদারের নাতনী লিলিমা খাতুন বলেন, শৈশব থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধে তার নানা, খালা-মামাদের উপর ঘটে যাওয়া নির্মম কাহিনী শুনতে শুনতেই বড় হয়েছেন তিনি। গল্প শুনে যুদ্ধকালীণ ঘটনার বর্ণনাই তার মুখস্ত হয়ে গেছে। নানী, মা, মামা-খালাদের পাশাপাশি তারও দাবি মুক্তিযুদ্ধের
বীরত্বগাঁথায় আঁচড় পড়–ক তার নানা ও খালার নাম দু’টিও।

তিনি আরও জানান, বীরঙ্গনা কাকে বলে ঠিক জানিনা। তবে যুদ্ধকালীণ সর্বহারা নারীকে বীরঙ্গনার
মুকুট দিলে তার খালা সুফিয়াও যুদ্ধজয়ে এক বুক কষ্ঠ ও রক্ত দিয়ে লিখে গেছেন স্বাধীন বাংলাদেশের নাম। তিনি বলেন, তার নানী  (জোহুরা বেগম) নানার মৃত্যু খবর শোনার পর থেকে কারো সাথে খুব বেশী কথা বলেননা। তবে
মুক্তিযুদ্ধের কথা শুনলে এখনো আৎকে উঠেন। স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসে দূরপানে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকেন। আর চোখের পানি ফেলেন। হয়তো স্বামীর বীরত্বগাঁথায় নিজেকে গর্বিত অনুভব করে চোখের পানিতেই কষ্ঠ নিবারণ করেন
তিনি।

জোহুরা বেগম বলেন, স্বাধীনতার অনেক বছর পর্যন্ত স্বামীর পথপানে চেয়ে দিন কাটতো তাঁর। বিশ্বাস ছিল, হয়তোবা তিনি এখনো বেঁচে রয়েছেন। ফিরে আসবেন স্ত্রী-সন্তানদের কাছে আপন ঠিকানায়। তবে বছরের পর বছর কেটে যাওয়ায় এখন নিজেকে কোন রকম বিশ্বাস করিয়েছেন বেঁচে নেই সে। বলতেই ফের চোখ ভিজিয়ে উচ্চস্বরে বলে উঠেন- তাদের স্বামীদের মৃত্যু হয়না, মরতে নেই ওদের।

নিখোঁজ শহীদ আব্দুল সরদারের প্রথম পক্ষের বড় ছেলে আবুল কাশেমকে স্বাধীনতার পর চায়ের সাথে বিষক্রিয়ায় হত্যা করা হয়। আর জোহুরার ২ ছেলে আজগর ও রহমত সরদারদের জীবিকা নির্বাহ হয় ভ্যান চালিয়ে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে।