সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে দুদক

0
431

ফারমার্স ব্যাংকের দুটি ব্যাংক হিসাব থেকে সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার হিসাবে চার কোটি টাকা স্থানান্তরের (মানি লন্ডারিং) প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে অনিয়ম-দুর্নীতির নানা তথ্য।
দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন টিম আগামী রোববার অনুসন্ধান প্রতিবেদন কমিশনে পেশ করবে। কমিশন প্রতিবেদন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেবে। টিমের অপর অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা হলেন দুদকের সহকারী পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান।

দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছেন, ফারমার্স ব্যাংকের দুটি হিসাব থেকে চার কোটি টাকা স্থানান্তরে অনেকের সংশ্নিষ্টতা পাওয়া গেছে। ঋণ প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে। তথ্য-প্রমাণগুলো বিচার-বিশ্নেষণ করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান ওই কথা বলেন।
ওই ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ, স্থানান্তর ও উত্তোলনে অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে সাবেক প্রধান বিচারপতি সিনহা জড়িত কি-না- এ প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, দুর্নীতি-অনিয়মের সঙ্গে জড়িত যেই হোক না কেন, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্নিষ্টের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুদক সূত্র জানায়, কথিত ব্যবসায়ী নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা ও মো. শাহজাহান ভূঁইয়া জাল কাগজপত্রে ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখায় আলাদা দুটি হিসাব খুলে অবৈধভাবে দুই কোটি করে চার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিলেন ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর। এই ঋণপ্রাপ্তির দিনই তারা পে-অর্ডারের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট শাখার সোনালী ব্যাংক শাখায় সিনহার হিসাবে দুই কোটি করে চার কোটি টাকা স্থানান্তর করেন, যা মানি লন্ডারিং অপরাধ। এ ক্ষেত্রে তারা অসৎ উদ্দেশ্যে অবৈধভাবে ঋণ নিয়েছেন এবং তা স্থানান্তর করে মানি লন্ডারিং অপরাধ করেছেন।

সংশ্নিষ্ট একটি সূত্র জানায়, জালিয়াতি করে এই ঋণ নেওয়া ও স্থানান্তরের ক্ষেত্রে নিরঞ্জন ও শাহজাহানকে সহায়তা করেছেন সিনহার বন্ধু রণজিৎ। রণজিতের আত্মীয় নিরঞ্জন। আবার রণজিতের বন্ধু শাহজাহান। রণজিৎ বর্তমানে সিঙ্গাপুরে বাস করছেন। ঋণের নামে অবৈধভাবে চার কোটি টাকা নেওয়া এবং তা স্থানান্তরে ফারমার্স ব্যাংকের অডিট কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতীরও (বাবুল চিশতী) হাত রয়েছে বলে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

জাল কাগজপত্রে অবৈধভাবে ঋণ প্রদান ও চার কোটি টাকা স্থানান্তরে ব্যাংকের তখনকার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জড়িত ছিলেন। দুদকের অনুসন্ধানে এর প্রমাণও মিলেছে। গত ২৬ সেপ্টেম্বর এ অভিযোগ নিয়ে দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে ব্যাংকটির সাবেক এমডি কে এম শামীমসহ ছয় কর্মকর্তা জালিয়াতিপূর্ণ ঋণ প্রদান ও অবৈধভাবে স্থানান্তরের কথা স্বীকার করেছেন। সাবেক এমডি কে এম শামীমসহ ছয়জনের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। দুদকের এক চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের ইমিগ্রেশন শাখা থেকে এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

বাকি পাঁচ ব্যাংক কর্মকর্তা হলেন- ফারমার্স ব্যাংকের নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে সালমা সুলতানা, সহকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট শফিউদ্দিন আসকারী আহমেদ, সাবেক ব্যবস্থাপক (অপারেশন) ও ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. লুৎফুল হক, সাবেক হেড অব বিজনেস ও সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট গাজী সালাউদ্দিন এবং ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বপন কুমার রায়।

চলতি বছরের ৬ মে দুদকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় কথিত ব্যবসায়ী নিরঞ্জন ও শাহজাহানকে। এ সময় তারা তাদের আইনজীবী আফাজ মাহমুদ রুবেল ও নাজমুল আলমকে সঙ্গে এনেছিলেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনজীবী আফাজ তখন দাবি করেছিলেন, এস কে সিনহার বাড়ি বিক্রির চার কোটি টাকা পে-অর্ডারের মাধ্যমে তার হিসাবে পাঠানো হয়েছে। তবে দুদকের অনুসন্ধানে বাড়ি বিক্রির টাকা পাঠানোর কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ঋণের নামে চার কোটি টাকা নেওয়ার তথ্য মিলেছে।

নিরঞ্জন ও শাহজাহানের আইনজীবীরা বলেছিলেন, সিনহার উত্তরার ছয়তলা বাড়িটি পাঁচ কাঠা জমির ওপর ছিল। এ বাড়ি ২০১৬ সালের শুরুর দিকে টাঙ্গাইলের বাসিন্দা শান্তি রায় ছয় কোটি টাকায় কেনেন। তখন বায়না দলিলের সঙ্গে দুই কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছিল। বাকি টাকা পরিশোধের জন্য নিরঞ্জন ও শাহজাহানের সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে। নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা শান্তি রায়ের স্বামী রণজিতের চাচাশ্বশুর। আর শাহজাহান রণজিতের বন্ধু। বাড়ি কিনতে ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে নিরঞ্জন ও শাহজাহান দুই কোটি করে চার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর আলাদা দুটি পে-অর্ডারের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংক সুপ্রিম কোর্ট শাখায় সিনহার হিসাবে চার কোটি টাকা স্থানান্তর করা হয়।

দুদকের অনুসন্ধানে বাড়ি বিক্রির টাকা পরিশোধের কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তারা ব্যবসার কথা উল্লেখ করে জাল কাগজপত্রে ঋণের নামে চার কোটি টাকা নিয়েছিলেন। কথিত দুই ব্যবসায়ী নিরঞ্জন ও শাহজাহানের বর্তমান ঠিকানা রাজধানীর উত্তরায়। তাদের গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীতে।