‘সম্ভব না’ হলো সম্ভাবনা : বিশাল পদ্মার বুকে প্রথম জাগলো স্বপ্নের স্থাপনা

0
547

খুলনা টাইমস রিপোর্ট : পদ্মা সেতু বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারভুক্ত প্রকল্প। সেই অনুযায়ী কাজও শুরু করে সরকার। কিন্তু এ প্রকল্প বাস্তবায়নে কথিত অভিযোগসহ বিভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের দীর্ঘতম এ সেতু নির্মাণে বিদেশি অর্থায়ন নিয়ে চলে নানা জটিলতা। উঠে আসে ষড়যন্ত্রের নানা তথ্য। অনিশ্চিত হয়ে পড়ে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ। তবে সব বাধা বিপত্তি উৎরিয়ে সরকার নিজস্ব অর্থায়নেই শুরু করে এই সেতুর নির্মাণযজ্ঞ। চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর শরীয়তপুরের জাজিরা পয়েন্টে পদ্মা সেতুর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিলারে বসানো হয় প্রথম স্প্যান। যার ওপর দিয়ে যানবাহন চলবে। স্প্যান স্থাপনের মধ্য দিয়ে পিলারের পর এখন এ সেতুর পাটাতনও দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। পিলারের পর পিলার স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়েই সেতু পূর্ণ চেহারা পাবে। আশা করা হচ্ছে, ২০১৮ সালের ডিসম্বরের মধ্যে এই সেতু যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচক্ষণতা ও মানসিক দৃঢ়তার কারণেই কেবল পদ্মা সেতুর স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উৎসাহেই এই নির্মাণকাজ এতো দ্রুত এগিয়ে চলছে।
পদ্মা সেতুর অগ্রগতি বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘এরকম খরস্রোতা নদীতে (পদ্মায়) সুপারস্ট্রাকচার করা বিরাট চ্যালেঞ্জ। অনেকেই সন্দিহান ছিল। আল্লাহর রহমতে আমরা করেছি। ওবায়দুল কাদের স্প্যান বসানোর উদ্বোধন দেরি করতে চেয়েছিল। আমি বলছি- না। এটা নিয়ে অনেক কিছু হয়েছে। অনেক মানুষকে অপমানিত হতে হয়েছিল। এক সেকেন্ডও দেরি করবো না। আমেরিকান সময় ৩টার দিকে ম্যাসেজ পেলাম- সুপারস্ট্রাকচার বসছে। আমি ছবি চাইলাম। ওই ছবি দেখে আমরা দুইবোন কেঁদেছি। অনেক অপমানের জবাব দিতে পারলাম। বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে মর্যাদা নিয়ে থাকুক।’ তিনি আরও বলেন, ‘মানুষের বিশ্বাস, আস্থা অর্জনের চেয়ে রাজনীতিকের জীবন এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিছু হয় না।’
চারদিক থেকে যখন নানা ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিলো তখন দেশীয় অর্থায়নো সেতু নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী উন্নয়ন-সহযোগীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘আমাদের কাজে অহেতুক বাধা দেবেন না। উন্নয়নের পথ বাধাগ্রস্ত করবেন না।’ প্রধানমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির আশঙ্কার কথা বলে ঋণচুক্তি বাতিল করলো। তারা নিজেরাই চুক্তির মেয়াদ বাড়াল, আবার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তা বাতিল করে দেয়। যেখানে একটি পয়সাও খরচ হয়নি, সেখান দুর্নীতির অভিযোগ আসে কী করে? শেখ হাসিনা বলেন, ‘যখন ক্ষমতায় আসি তখন মনপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা করি কীভাবে মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন করা যায়, নিজের ভাগ্য গড়তে আসিনি। মানুষের ভাগ্য গড়তে এসেছি। এটাই আমার চিন্তা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে বক্তব্য দিয়ে পদ্মা সেতু নিয় দুর্নীতির অভিযোগ উড়িয়ে দেন এবং প্রয়োজনে নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণ করা হবে বলে ঘোষণা দেন। এসময় তিনি বাংলাদেশি ও প্রবাসীদের পদ্মা সেতু নির্মাণ সহযোগিতায় এগিয়ে আসার আহবান জানান। প্রধানমন্ত্রীর আহবানে সাড়া দিয়ে অনেকে এগিয়েও আসেন। শুরু হয় অর্থ সংগ্রহ। পরে মন্ত্রীসভার বৈঠকে পদ্মা সেতুর অর্থ সংগ্রহে প্রতিটি তফসিলি ব্যাংকে দুটি করে ব্যাংক হিসাব খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মন্ত্রীসভার বৈঠকে সব মন্ত্রী এক মাসের সম্মানী পদ্মা সেতু ফান্ডে জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সচিবরাও একটি উৎসব ভাতার সমপরিমাণ অর্থ পদ্মা সেতু ফান্ডে জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অর্ধ শতাধিক সচিব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেই অর্থ নির্ধারিত ব্যাংকে জমাও দেন। তবে এসবের মধ্যেও অর্থমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন। অর্থমন্ত্রী বিশ্বব্যাংককে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাতে থাকেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৮ সালে পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেন। সেই অনুযায়ী ১৯৯৮ থেকে ২০০০ এই সময় পূর্ব সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়। এরপর ২০০১ সালে জাপানিদের সহায়তায় সম্ভাব্যতা যাচাই এর কাজ হয়। স্বপপূরণের লক্ষ্যে ২০০১ সালের ৪ জুলাই মাওয়া পয়েন্ট পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনও করেছিলেন শেখ হাসিনা। ২০০৪ সালের জুলাই মাসে জাপানের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা জাইকা-এর সুপারিশে মন মাওয়া-জাজিরার মধ্যে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্মা সেতুর নকশা প্রণয়ন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত করে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসম্বরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার শপথ নিয়েই নতুন করে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ হাতে নেয়। ২০০৯ সালের ১৯ জুন সেতুর নকশা প্রণয়নের প্রস্তাব মন্ত্রীসভা অনুমোদন করে। এরপর ২৯ জুন পরামর্শকের সঙ্গে চুক্তি হয়। পদ্মা সতুর কাজ ২০১৩ সালের মধ্যে শেষ করার সময় নির্ধারণও করা হয় সে সময়। ২০১০ সালে প্রিকোয়ালিফিকেশন দরপত্র আহবান করা হয়। পদ্মা সতুতে অর্থায়নে আগ্রহ দেখায় বিশ্বব্যাংক। সেই সঙ্গে সহযোগী হতে চায় এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিপি), ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ও জাইকা। ২৯০ কোটি ডলার ব্যয়ে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ পদ্মা সেতু প্রকল্প জন্য ২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষর করে সরকার। এরপর ওই বছরের ১৮ মে জাইকা (৪০ কোটি ডলার), ২৪ মে আইডিবি (১৪ কোটি ডলার) এবং ৬ জুন এডিবি’র (৬২ কোটি ডলার) সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হয়।