শারদ উৎসবে নির্বাচনী আমেজ : সম্ভাব্য প্রার্থীরা ময়দানে

0
1516

 

 

আসাদুজ্জামান রিয়াজ:
আসন্ন খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) নির্বাচন উপলক্ষে আগাম নির্বাচনী প্রচারে মাঠে মেনেছেন সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। গেল ঈদের পর এবার শারদ শুভেচ্ছার নামে করছেন অনানুষ্ঠানিক নির্বাচনী গণসংযোগ ও প্রচার-প্রচারণা। প্রার্থী ও তার সমর্থকদের আনাগোনায় সরগরম হয়ে উঠেছে খুলনার জনপদ। তাই ঈদের পর এবার দূর্গা পুঁজার আয়োজনে যুক্ত হয়েছে নির্বাচনী আমেজ।
কেসিসি’র আসন্ন নির্বাচন উপলক্ষে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বিএনপি’র সম্ভাব্য একাধিক প্রার্থী মাঠে নেমেছেন মনোনয়ন লড়াইয়ে। এই লাড়াইয়ে যুক্ত হয়েছেন উভয় দলের একাধিক নতুন মুখ। যদিও রাজনৈতিক ময়দানে তাদের যথেষ্ট পরিচিতি রয়েছে। আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী পরিবর্তনের সম্ভাবনার গুঞ্জনে মনোনয়ন আশায় জেগে উঠেছেন এসব নতুন মুখ।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে খুলনাসহ ছয় সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন,নির্বাচন কমিশনের এমন ঘোষনায় নড়ে-চড়ে বসেছে খুলনার প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দল। রাজনৈতিক শিবিরে বাঁজতে শুরু করেছে নির্বাচনী ডামাডোল। আর এই প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে হবে সিটি কর্পেরেশন নির্বাচন। তাই নির্বাচনে বড় দুই দলের মাঠ পর্যায়ে জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের পরিমাপক হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। মূলত এ কারণেই প্রধান দুটি দলের সামনে এ নির্বাচন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
এদিকে অনুকূল ফল ঘরে তুলতে ভোটযুদ্ধের কর্মকৌশল সাজাচ্ছে উভয় দলের হাইকমান্ড। বসে নেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শরিকরাও। প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টিসহ বাম প্রগতিশীল ঘরানার দলগুলোও প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচনী যুদ্ধে নামার।
বিগত ২০১৩ সালের ১৫ জুন খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেককে বিপুল ভোটে পরাজিত করেন বিএনপি মনোনীত মনিরুজ্জামান মনি মেয়র নির্বাচিত হন। বিএনপি প্রার্থী মনিরুজ্জামান মনি আনারস প্রতীকে ১ লাখ ৮০ হাজার ৯৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি আওয়ামী লীগের তালুকদার আব্দুল খালেক চেয়ার প্রতীকে পান ১ লাখ ১৯ হাজার ৪২২ ভোট। ওই নির্বাচনে জেলা জাতীয় পার্টি প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মধু জামানত হারান।
শুধু মেয়র পদই নয় অধিকাংশ কাউন্সিলর পদও যায় বিএনপির ঘরে। যদিও ওই নির্বাচনে প্রার্থীদের কোন দলীয় প্রতীক ছিলো না। যেহেতু আসন্ন নির্বাচন হবে দলীয় প্রতীকে সেহেতু বিগত নির্বাচনের সমীকরণটাও পাল্টে যেতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মতে,চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের আগস্টের মধ্যে খুলনাসহ ছয় সিটি নির্বাচন শেষ করার পরিকল্পনা করেছে ইসি। এদিকে সময় দ্রুত এগিয়ে আসছে কেসিসি নির্বাচনের। যদিও এখন পর্যন্ত ভোটদের কাছে আসন্ন নির্বাচন প্রসঙ্গ তেমন একটা গুরুত্ব পায়নি। তবে কেসিসি নির্বাচন ইস্যুতে ইতোমধ্যে বেশ সরগরম হয়ে উঠেছে খুলনার রাজনৈতিক অঙ্গণ। ‘কে হতে যাচ্ছেন নৌকার মাঝি আর কে পেতে পারেন ধানের শীর্ষ।’ ভোটদের কাছে কোন প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু।’ কাকে দিলে জিতে আসা সম্ভাব।’এমন আলোচনা-সমালোচনায় সরব হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র দলীয় শিবির। আলোচনায় প্রার্থী তালিকায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি’র একাধিক নেতার নাম উঠে আসছে। ক্ষমতাসীন দলের তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন সাবেক মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি তালুকদার আব্দুল খালেক। এবার দলীয় মনোনয়ন চাইবেন সদর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ্যাড.সাইফুল ইসলাম এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও নগর যুবলীগের আহবায়ক এ্যাড.আনিসুর রহমান পপলু। ইতোমধ্যে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দলীয় হাইকমান্ডসহ ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণে নিজেদের তুলে ধরতে রাজপথে সরব আছেন ক্ষমতাসীন দলের এই দুই নতুন মুখ। যদিও ভোটের ময়দানে তারা নতুন তবে রাজনৈতিক অঙ্গণে যথেষ্ট পরিচিতি রয়েছে তারুণ্য নির্ভর এই নেতা দ্বয়ের। তবে দল মনোনয়ন না দিলে প্রার্থী হবেন না। দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন এমনটি জানিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের এই দুই নেতা।
আলোচনায় বিএনপির প্রার্থী তালিকায় বর্তমান মেয়র ও নগর বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনি ও জেলা বিএনপি সভাপতি এ্যাড.শফিকুল আলম মনা’র নাম তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। নির্বাচনী ময়দানে নিজেকে তুলে ধরতে বিশাল কর্মী-সমর্থক নিয়ে মাঠে নেমেছেন মনা। নিজেকে যোগ্য প্রার্থী দাবি করলেও দলের সিদ্ধান্তের বাইরে নয়,এমন দাবিও তার।
অপরদিকে,কেসিসি নির্বাচনী ডামাডোল বাঁজতে শুরু হওয়ায় বড় দু’ল আওয়ামী লীগ বিএনপির সম্ভব্য কাউন্সিলর প্রার্থীরা মাঠে নেমে পরেছেন।
বিশেষ করে গত দু’টি ঈদ উৎসবে নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে সম্ভব্য প্রার্থীদের উপস্থিতিতে ইফতার পার্টিসহ গণসংযোগ ছিলো চোখে পড়ার মতো। আর এবার যুক্ত হয়েছে শারদীয় দূর্গা উৎসবে শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে নিজেদের প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরার প্রতিযোগীতা। এছাড়া বিভিন্ন দিবসে এলাকাবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রার্থীর ছবিসহ পোষ্টার ও প্যানা সাইন প্রদর্শন করা হচ্ছে। ফলে এলাকায় এলাকায় চায়ের দোকানসহ একাধিক আড্ডাস্থলেও কেসিসি নির্বাচন ইস্যু আলোচনায় উঠে আসতে শুরু করেছে। পাড়া-মহল্লায় ভোটারদের মধ্যে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে কাউনিসলর প্রার্থীদের নিয়ে।
এদিকে,দলীয় প্রতীকে হওয়ায় এবারের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন হবে মূলত সংসদ নির্বাচনের আদলে। তাই প্রার্থী বছাই থেকে শুরু করে ভোটের মাঠে দলের সর্বোস্থরে নেতা-কর্মীদের সরব উপস্থিতি নিশ্চিত করাটাও বড় দু’দলের নীতি নির্ধারনী মহলের কাছে অনেকটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে। খুলনায় বড় দ’লের তৃণমূলে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। যা আসন্ন নির্বাচনে মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাড়াতে পারে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জন্য।
ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ের একাধিক নেতা-কর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, কেসিসি’র এবারের নির্বাচনে বিএনপির তুলনায় আওয়ামী লীগ অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। গত নির্বাচনে ‘হেফাজত’ ইস্যু এবং বিএনপি প্রার্থীর নানা প্রতিশ্রুতি ভোটারদের বিভ্রান্ত করে ছিলো বলে মনে করেন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা। তাদের দাবি খুলনা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় যতটুকু উন্নয়ন দৃশ্যমান,তার সবটুকুর দাবিদার তালুকদার আব্দুল খালেকের। বর্তমান মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পূর্বে যে সব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তার একটিও বাস্তবায়ন করতে পারেনি। গত নির্বাচনে নগরবাসী যে ভুল করেছিলেন তা আর করবেন না বলে মনে করেন ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা। তারা মনে করেন নগর উন্নয়নে তালুকদার আব্দুল খালেকের বিকল্প নেই। আসন্ন নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে তালুকদার আব্দুল খালেক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন এটা প্রায় নিশ্চিত বলে মনে করেন দলটির মাঠের কর্মীরা। তবে নির্বাচনে আগ্রহী নন,সম্প্রতি সাংবাদিকদের কাছে তালুকদার খালেকের এমন মন্তব্যে কিছুটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যায় দলীয় হাইকমান্ড। এটি তার অভিমানের সুর এমন দাবি করে হাইকমান্ড জানায় খালেকই মূলত আওয়ামী লীগের প্রার্থী হবেন এটা প্রায় নিশ্চিত।
বিএনপির মাঠের কর্মীদের মতে, কেসিসি’র এবারের নির্বাচনে প্রার্থী নির্ধারণে দলের নীতি নির্ধারনী মহলকে বেশ কৌশলী হতে হবে। বর্তমান মেয়র মনিরুজ্জামান মনিকে দিয়ে নির্বাচনী বৈতরনী পার হওয়া এবার কষ্টসাধ্যের ব্যাপার। আওয়ামী লীগ প্রার্থী তালুকদার খালেকের বিরুদ্ধে বিএনপি নগর সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু হতে পারেন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বি। যেহেতু আসন্ন সিটি কর্পোরেশন ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন কাছাকাছি সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সেহেতু এ দু’টি নির্বাচনে প্রার্থী নির্ধারণসহ কর্ম কৌশলে নানা সমীকরণ থাকবে রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিতে। প্রার্থী নির্ধারণে পূর্বে সকল হিসেব নিকাশ পাল্টে দিয়ে বেশ চমক রাখতে চাইছে দলটির হাইকমান্ড।
এদিকে নির্বাচনী ডামাডোল বাঁজতে শুরু হওয়ায় খুলনায় নড়ে চড়ে বসেছে বিএনপি-আওয়ামী লীগের শরীক দলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো। জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি বেশ আগে থেকেই প্রার্থী ঘোষনা করেছে। কেসিসি নির্বাচনে জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের মেয়র প্রার্থী মুশফিকুর রহমান। ইসলামী আন্দোলন ইতোমধ্যে কেসিসি নির্বাচনে তাদের প্রার্থীতা ঘোষনা দিয়েছে। সংগঠনের নগর সভাপতি অধ্যক্ষ মাওলানা মোজাম্মিল হক ইসা আন্দোলনের মেয়র প্রার্থী।