রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অনিশ্চয়তার অবসান হোক

0
296

আমরা মনে করি যত দ্রুত সম্ভব প্রস্তুতিমূলক এ কাজগুলো সম্পন্ন করে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা দরকার। অন্যদিকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ফেরত যাওয়ার পাশাপাশি সে দেশে তাদের নিরাপদ বসবাসের পরিবেশ ও নাগরিক মর্যাদা নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টিও জরুরি। এ ব্যাপারে মিয়ানমারের ওপর জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ অব্যাহত রাখার বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী গত ২৩ জানুয়ারি থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা শুরু করা যায়নি। শুরু না হওয়ার কারণ নিয়েও রয়েছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। এই প্রক্রিয়া ফের কবে শুরু হবে তাও নিশ্চিত হয়নি এখনো। এটা হতাশাব্যঞ্জক।

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে এ দেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্য গত ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশের সঙ্গে রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসন সম্পর্কিত চুক্তি করে মিয়ানমার। ওই চুক্তির আলোকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে কার্যকর করার জন্য গত ১৫-১৬ জানুয়ারি মিয়ানমারের নেপিডোতে অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ-মিয়ানমার যৌথ ওয়ার্কিং কমিটির প্রথম বৈঠক। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, প্রত্যাবাসন শুরুর দুই বছরের মধ্যে এ প্রক্রিয়া শেষ করার। বৈঠকে মাঠ পর্যায়ের প্রত্যাবাসন কর্মপরিকল্পনাও চূড়ান্ত হয়। স্বাক্ষরিত ‘ফিজিক্যাল এরেঞ্জমেন্ট’ চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ পাঁচটি ট্রানজিট ক্যাম্প স্থাপন করবে যেখান থেকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নেয়া হবে। মিয়ানমার শুরুতে দুটি রিসেপশন সেন্টারের মাধ্যমে প্রত্যাবাসনকারী রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করবে। পরে সাময়িকভাবে তাদের থাকার ব্যবস্থা হবে অস্থায়ী ক্যাম্পে। পাশাপাশি ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গাদের ভিটেমাটিতে দ্রুততার সঙ্গে বাড়িঘর পুনর্র্নিমাণের ব্যবস্থা নেবে মিয়ানমার। এরমই কথা। প্রত্যাবাসনের পর রাখাইনে রোহিঙ্গাদের জীবন-জীবিকার বিষয় নিশ্চিত করার বিষয়টিও চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত আছে। চুক্তি অনুযায়ী প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারেও বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সম্মত হয়। স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী প্রতিদিন তিনশ জন রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কথা ছিল, ২৩ জানুয়ারি থেকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু করার। কিন্তু শেষ নির্দিষ্ট দিনে প্রত্যাবাসন শুরু হলো না। জানা গেল প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির অভাব।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত হওয়া যেমন জরুরি, তেমনটাই জররুর রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদে ও নাগরিক মর্যাদা নিয়ে থাকতে পারার নিশ্চয়তা, তা না হলে একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন হতে হবে অবশ্যই স্বেচ্ছামূলক। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থাসহ অপরাপর দেশের কূটনীতিক, সর্বোপরি বাংলাদেশও এ বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। নিজ দেশে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না পেলে এদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারা স্বাভাবিক কারণেই ফেরত যেতে আগ্রহী হবে না। আর যেনতেনভাবে ফেরত পাঠানো গেলেও, সেখানে পুনরায় তারা নিগৃহীত হলে আবারও এ দেশে পালিয়ে আসবে। কাজেই মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ বসবাস ও নাগরিক অধিকারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, যে বিষয়টাতে কথা বলতে মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠী বরাবরই অনাগ্রহী। এটাই সত্যি যে চুক্তি অনুযায়ী প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয় শর্ত এখনো পূরণ করতে পারেনি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। অথচ প্রত্যাবাসনে বিলম্বের জন্য মিয়ানমার প্রথমে বাংলাদেশকেই দায়ী করেছিল। পরে অবশ্য সুর পাল্টে অভিযোগের আঙুল তোলে কিছু ব্যক্তি-গোষ্ঠীর দিকে, যারা মিয়ানমারে ফেরত যাওয়াদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নিয়ে কথা বলে আসছে। এ প্রেক্ষাপটে প্রত্যাবাসন প্রশ্নে মিয়ানমারের সদিচ্ছা নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়া এবং এ প্রশ্ন উঠাই স্বাভাবিক যে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার টালবাহানা শুরু করেছে কিনা?

বিলম্বের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারে তরফেও জানানো হয়েছে এখনো অনেক বিষয়ের সমাধান হয়নি। স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের কথা চুক্তিতে বলা থাকলেও এ সংক্রান্ত দলিলাদি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বাংলাদেশে এখনো ট্রানজিট ক্যাম্প নির্মাণ সম্পন্ন হয়নি। আমরা মনে করি যত দ্রুত সম্ভব প্রস্তুতিমূলক এ কাজগুলো সম্পন্ন করে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা দরকার। অন্যদিকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ফেরত যাওয়ার পাশাপাশি সে দেশে তাদের নিরাপদ বসবাসের পরিবেশ ও নাগরিক মর্যাদা নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টিও জরুরি। এ ব্যাপারে মিয়ানমারের ওপর জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের চাপ অব্যাহত রাখার বিকল্প নেই।