মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সুপেয় পানির চরম সংকট, প্রতিনিয়ত ভোগান্তী পোহাতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে

0
914

এ,এইচ শাহিন, মোংলা:
সুপেয় পানির তীব্র সংকটে প্রতিনিয়ত চরম ভোগান্তী পোহাতে হচ্ছে মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য ষ্টাফসহ সকল রোগী সাধারণকে। হাসপাতালের অভ্যন্তরের একমাত্র পুকুরটি শুকিয়ে যাওয়া এবং পৌর কর্তৃপক্ষের নামমাত্র সরবরাহকৃত পানিতে চাহিদা পূরণ না হওয়াতেই মুলত এ পানি সংকট বিরাজ করছে। গত ৩ মাস ধরে হাসপাতালের ডাক্তার থেকে শুরু করে সাধারণ রোগী পর্যন্ত সকলকেই খাবার বিশুদ্ধ পানি ও বাথরুম এবং ধোয়া-মোছার জন্য বাহির হতে বোতলজাত পানি কিংবা বিভিন্ন পুকুর ডোবা-নালার পানি কিনে প্রয়োজন মিটাতে হচ্ছে। অহরহ পুকুর-ডোবার পানি ব্যবহার করায় ডায়রিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরাই। হাসপাতালের মধ্যে একটি অগভীর নলকুপ থাকলেও সেটির পানিও ব্যবহার অনুপযোগী। ভুক্তভোগী রোগী সাধারণ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্বহীনতার কারণেই মুলত এ পানির সমস্যা নিরসন হচ্ছে না।


সরেজমিন হাসপাতালে গিয়ে খোজ খবর নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯৮ সালের ২৩ মে ৩১ শয্যা বিশিষ্ট মোংলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের যাত্রা শুরু হয়। এরপর ২০০৭ সালে এটি ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়। বন্দর ও পৌর শহরসহ উপজেলার ৬ টি ইউনিয়নের বিশাল এ এলাকায় প্রায় ২ লক্ষাধিক মানুষের স্বাস্থ্য সেবার একমাত্র ভরসা সরকারী এই হাসপাতালটি। শুধু মোংলা নয় পার্শ্ববর্তী রামপাল, শরণখোলা, মোড়েলগঞ্জ, দাকোপ ও সুন্দরবন এলাকার দুর-দুরান্ত থেকে রোগীরা ছুটে আসে এ হাসপাতালে। বর্তমানে হাসপাতালটিতে সুপেয় পানি চরম সংকট বিরাজ করছে। ফলে রোগীরা সেবা নিয়ে সুস্থ্য হওয়ার চেয়ে পানির অভাবে আরো বেশি অসুস্থ্য হয়ে পড়ছেন। বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ না থাকায় বাধ্য হয়ে বোতলজাত পানি কিনে ব্যবহার করছেন ডাক্তার ও নার্সরা। আর দরিদ্র রোগী সাধারণ ও হাসপাতালের নি¤œস্তরের চাকুরীজীবিরা অর্থের অভাবে স্থানীয় বিভিন্ন পুকুর ও ডোবার পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। পুকুর-ডোবা-নালার অস্বাস্থ্যকর পানি ব্যবহার করায় তারা পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে রোগীর সাথে আসা রোগীর আত্মীয় শাহিদা বেগম (৩৭) বলেন, ১৫দিন ধরে রোগী নিয়ে এই সরকারী হাসপাতালে আছি, এখানে খুব পানির কষ্ট। খাবার পানি নেই, টয়লেটের পানি নেই। টাকা দিয়ে পানি কেনার সামর্থ্যও নেই, কি করবো যাবো কোথায়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ফরিদা বেগম (৪৩) বলেন, আমার পেটে ব্যথা, নার্সরা বেশি বেশি পানি খেতে বলেছে পানি নেই তা খাবো কি। ৩দিন পর রবিবার গোসল করলাম তাও পানি কিনে এনে।


হাসপাতালের পরিস্কার পরিছন্ন কর্মী মিথিলা রহমান বলেন, গত এক মাস ধরে পানির এ সমস্যা পূর্বের তুলনায় বেশি। পানির অভাবে পরিস্কার পরিছন্নতার কাজ করা যাচ্ছে না। যার ফলে হাসপাতালে নোংবা অবস্থা বিরাজ করছে। আমরা যারা ষ্টাফ আছি আমারও প্রচন্ড পানি সংকটে ভুগছি। ডায়রিয়ার রোগীরা টয়লেটে গিয়ে পানি পাচ্ছে না। কেউই পানির ব্যবস্থা করছে না।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত নার্স ফাতেমা বলেন, পানির কষ্ট সকলেরই হচ্ছে। রোগীদের দেখাশুনার পর হাত ধুতে হয়, সেই হাত ধুয়ার পানিও নেই, বাথরুমে যেতেও অসুবিধা হয়। বাহির থেকে বোতল ও বালতি করে পানি এনে আমাদের প্রয়োজন মিটাতে হচ্ছে। হাসপাতালের বাবুর্চি আব্দুল সাত্তার শেখ বলেন, পানির অভাবে তিন চারদিন পরপর গোসল করি। পৌরসভা থেকে যে পানি সরবরাহ করা হয় তা খুবই কম। তাতে আমাদের চাহিদা মিটে না। রান্না-বান্না, ধোয়া-মোচা ও রোগীদের খাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা এখানে নেই। আমাদের ভীষণ কষ্ট হচ্ছে পানির জন্য।
মোংলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা: মো: রাফিউল হাসান বলেন, পানির সংকটের কারণে আমি নিজেই পানি কিনে ব্যবহার করছি। রোগীরা পানির জন্য জ্বালাতন করছে কোথা থেকে পানি দিব। গত ৩ মাস ধরে পানির অভাবে পরিছন্ন কর্মীরা নিয়মিত পরিস্কার-পরিছন্নতার কাজ করতে পারছে না। অস্বাস্থ্যকর পানি ব্যবহারের ফলে এ এলাকায় ডায়রিয়া, কলেরা ও টাইফয়েড মারাত্মক আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া হাসপাতালের পানিও পুরোপুরি বিশুদ্ধ নয় এটা নিয়ে আমরাও খুব ভয়ের মধ্যে আছি কারণ যখন তখন ডায়রিয়া ও কলেরা ছড়িয়ে পড়তে পারে। আগামী ১০/১৫ দিনের মধ্যে পানির এ সমস্যা সমাধান করা না গেলে হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ার আশংকার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: জীবিতেষ বিশ্বাস বলেন, হাসপাতালে সুপেয় পানির প্রচন্ড সংকট রয়েছে। হাসপাতালের আবাসিক এলাকার পুকুরটি শুকিয়ে যাওয়ায় মুলত পানির সমস্যা বেশি দেখা দিয়েছে। এছাড়া পৌরসভা পাইপ লাইনের মাধ্যমে দিনে একবার যে স্বল্প পরিমাণ পানি সরবরাহ করে থাকে তা হাসপাতালের চাহিদার তুলনায় খুবই নগন্য তাই এ সংকট নিরসন সম্ভব হচ্ছে না।


বাগেরহাট সিভিজ সার্জন ডা: অরুন চন্দ্র মন্ডল মোংলা সরকারী হাসপাতালের পানি সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, এটি মুলত সিভিল সার্জন কিংবা টিএইচও’র কাজ বা দায়িত্ব নয়। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগকে অবহিত করা হয়েছে তারাই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।