মাদকে জড়িয়ে পড়ছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা,ঘরে ঘরে মায়েদের কান্না!

0
1206

আসাদুজ্জামান রিয়াজ ॥
‘খুলনা মহানগরীর সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা আফরোজা আহমেদ (ছদ্মনাম) তার কলেজ পড়ুয়া ছেলে সাবিলকে নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। স্বনামধন্য স্কুল থেকে যে ছেলেটি পঞ্চম শ্রেণীতে পেয়েছিল বৃত্তি, এসএসসিতেও গোল্ডেন। সেই ছেলে কি না এইচএসসিতে ফেল ! প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা ছেলেটি যেন আগের মতো আর নেই। ছেলের এই আকস্মিক পরিবর্তনের কারণ দীর্ঘ দিন ধরে খোঁজ নিয়ে আফরোজা যা জানতে পারেন, তা রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো। ছেলে তার মাদকের মরণনেশায় আসক্ত। তার সন্তান প্রধমে গাঁজা পরে ইয়াবা সেবনে আসক্ত হয়ে পরেছে। ছেলের বাবাকেও এ বিষয়ে বলতে পারছেন না তিনি। একা একা ছেলেকে বোঝান। ছেলেটি বোঝে না। নীরবে নিভৃতে কাঁদতে কাঁদতে আফরোজা নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিভিন্ন জায়গায় ধরনা দিয়েও তিনি তার ছেলেকে মাদকের পথ থেকে ফেরাতে পারছেন না। আফরোজা তার একমাত্র সন্তানের জীবন নিয়েই এখন শঙ্কিত।’
মাদকের ভয়াবহ এ ছোবল থেকে আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও রাজনীতিকদের আরো কঠোর হওয়ার আহবান জানিয়েছেন আফরোজা।
মাদকের আগ্রাসন প্রসঙ্গে নগরীর দুটি স্কুলে প্রধান শিক্ষকের সাথে কথা বলতে চাইলে তারা এ বিষয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। তবে নাম প্রকাশ না করার সর্তে একাধিক অভিবাবক এ বিষয়ে খোলা মেলা কথা বলেন। উদ্বিগ্ন এসব অভিবাবকদের অধিকাংশের অভিযোগ রাজনীতিক ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মদদেই সর্বনাশা এই মাদক ছড়িয়ে পড়েছে। যার ফলে হাজারো মায়ের কান্না এখন ঘরে ঘরে। ভয়ঙ্কর মাদক সর্বনাশা থাবায় বিপন্ন হয়ে পড়েছে এমন অসংখ্য পরিবারের সন্তানদের জীবন। নেশায় আসক্ত হয়ে পড়া ছেলে-মেয়েদের মায়ের কান্নাও থামছে না। অসহায় এই মায়েদের সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে।
পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের তথ্য মতে,সমাজে সংঘটিত অধিকাংশ অপরাধের সাঙ্গে তরুণরা জড়িত। যার অধিকাংশ স্কুল-কলেজ পড়–য়া শিক্ষার্থী। এরা প্রত্যেকেই মাদকাসক্ত। মাদকের মরণ নেশায় আসক্ত হয়ে এসব তরুণ-যুবক চুরি,ছিনতাই,চাঁদাবাজী,ডাকতি এমনকি খুনের মতো অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে। এর থেকে সহযেই অনুধাবন করা যায় মাদকের মরণ ছোবল এখন পৌছে গেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। এই পরিস্থিতি ভয়াবহ রুপ নেয়ার আগেই আরো কঠোর ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন ভুক্তোভগি মহল। অন্যথায় শিক্ষা ব্যবস্থাসহ আমাদের তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ চরম হুমকির মধ্যে পড়তে পারে।
খুলনাসহ সারাদেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ সর্বনাশা মাদক ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়েছে। সারাদেশে ইয়াবার সেবন যে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছেতা এখন পুলিশ, র‌্যাব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা অকপটে স্বীকার করছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়,সারা দেশে মাদক সেবনকারীর সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ। যার মধ্যে খুলনায় প্রায় ২৫ হাজার মাদকাসক্ত রয়েছে। এর মধ্যে শুধু মাত্র খুলনা মহানগরীতে রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার। মাদক সেবনকারী সিংহভাই তরুণ-যুবক। তালিকায় তরুণীরাও রয়েছে। এ ব্যবসার প্রসার ঘটাতে এই পর্যায়ে মাদকের ভয়াবহ থাবা পড়েছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে তাদের স্কুল ব্যাগে করে মাদক বহন ও বিক্রি করতে পারে। যে কারণে মাদক বিক্রেতাদের এখন প্রধান টার্গেট স্কুল-কলেজের শিক্ষাথীরা। মাদক মধ্যে ইয়াবা ও ফেন্সিডিল সেবনকারীর সংখ্যা বেশি। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী,শিক্ষক,আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য,রাজনীতিক,সরকারী চাকুরীজীবি এমনকি চিকিৎসকরাও মাদক সেবনে জড়িয়ে পরেছেন। একাধিক মাদক নিরাময় কেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে এ খবর জানা গেছে।
একাধিক সুত্র জানায়,খুলনায় সাধারণত গাঁজা,হেরোইন ও ফেন্সিডিল সেবনকারীর সংখ্যা বেশি। তবে গত চার বছর ধরে ইয়াবা নামের টেবলেট (মাদক) মাদকের মার্কেট দখল করে নিয়েছে। মাদকের রাজ্যে ইয়াবাই এখন সর্বনাশা নীল নেশার রাজা। বিশেষকরে অভিজাত ধনাঢ্য পরিবারের তরুণ-তরুণীদের কাছে ইয়াবা নামের মাদক খুবই জনপ্রিয়। খয়রি রংয়ের আকারে ছোট আকারের ট্যাবলেট যা ইয়াবা বা বাবাসহ নানা নামে পরিচিত।
এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তীর সকল পথেই অবৈধভাবে মাদক প্রবেশ করছে। যশোর, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, সিলেট, কুমিল¬া, আখাউড়া, চট্টগ্রামের সীমান্ত পথ দিয়ে প্রায় প্রতিদিনই ফেনসিডিল ও হেরোইন আসছে এবং উদ্ধারের ঘটনাও ঘটছে। বাস-ট্রেন এবং অন্যান্য যানবাহনে অভিনব পন্থায় মাদকদ্রব্য বিভাগ ও জেলা শহরগুলো থেকে রাজধানী ঢাকায় প্রবেশ করছে। অজ্ঞান করার ওষুধ হিসেবে আমদানি করা প্যাথেডিন, মরফিন জাতীয় দ্রব্য মাদক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে অবাধে ও প্রকাশ্যে। সারাদেশে প্রতিবছর সীমান্তের চোরাপথে অবৈধভাবে ৫ হাজার কোটি টাকার মাদক আসছে।
চিকিৎসকদের মতে,ইয়াবা বেশ ভয়ংকরই বটে। এতে ফুসফুস ও কিডনী নষ্ট হয়ে যায়। হৃদকম্পন বেগবান হয়, উচ্চ রক্তচাপ হয় এবং মস্তিস্কের ছোট ছোট রক্তনালীগুলো নষ্ট করে ফেলে। ফলে অভিঘাত বা ষ্ট্রোক হওয়ার আশংকা থাকে। অবিরাম ব্যবহারে গাত্রদাহ বা হৃৎপিন্ড প্রদাহ হয়ে থাকে। অতিরিক্ত ব্যবহারে রক্তে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং শরীরের বিধ্বংসী আলোড়ন বা পেশী সংকোচন হয়ে থাকে। এতে মৃত্যুও হয়ে থাকে। এছাড়া মানষিক বৈকল্য, শুক্রোধনীয়তা, উদ্বেগ, দুঃশ্চিন্তা, বিভ্রান্তি, দৃষ্টিভ্রম, সিদ্ধান্তহীনতা, অনিদ্রা ইত্যাদি হয়ে থাকে এবং ক্রমাম্বয়ে যৌনশক্তি লোপ পায়। অনেকে ইয়াবা গুড়ো করে তরল পদার্থের সাথে মিশিয়ে সিরিঞ্ছের মাধ্যমে সেবন করে। এটা আরো বেশী বিপজ্জনক।
অভিযোগ রয়েছে,খুলনা মহানগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান,আবাসিক এলাকাসহ একাধিক স্থানে বিক্রি হচ্ছে মাদক। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কতিপয় অসাধু সদস্যদের যোগসাজসে ম্দক বিক্রি হলেও রহস্যজনক কারণে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। প্রথম দিকে ইয়াবা সীমাবদ্ধ ছিল উচ্চবিত্তদের মধ্যে। এখন সমাজের সব শ্রেণীর মানুষই এই নেশায় আসক্ত। বিস্তার বাড়ার পেছনে বড় ভূমিকা পালন করেছে প্রশাসনের রহস্যময় নীরবতা। এছাড়া নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে কথিত রাজনীতিকদের অনেকের নামই উঠে এসেছে, যারা মাদক ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত।