মাদকবিরোধী অভিযান হঠাৎ শুরু করিনি: প্রধানমন্ত্রী

0
330

টাইমস রিপোর্ট: সাম্প্রতিক ভারত সফর নিয়ে সংবাদ সম্মেলনের প্রশ্নোত্তর পর্বের শুরুতেই মাদকবিরোধী সাম্প্রতিক অভিযান নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ অভিযান নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে শেখ হাসিনা বলেছেন, অভিযানে নিরীহ কেউ হয়রানির শিকার হয়নি। আর এ অভিযান হঠাৎ করে শুরুও হয়নি।

শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘যদি কোনো নিরীহ ব্যক্তি শিকার হয়ে থাকে, তাহলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব। কিন্তু মাদক দূর করতে হবে সমাজ থেকে। এটা কিন্তু আসলে সবারই দাবি ছিল। একটা অভিযান চালাতে গিয়ে যদি কোনো ঘটনা ঘটে, তো সেটাই যদি বড় করে দেখান, তাহলে বলেন এটা বন্ধ করে দিই।’

সম্প্রতি ভারত সফর সম্পর্কে জানাতে বুধবার (৩০ মে) বিকেল চারটায় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে সংবাদ সম্মেলন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে তিনি সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে এ মন্তব্য করেন। এর আগে তিনি ভারত সফর সম্পর্কে সাংবাদিকদের মাধ্যমে জাতির কাছে বিস্তারিত তুলে ধরেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ডক্টর অব লিটারেচর (ডি-লিট) উপাধিটি বাংলাদেশ এবং বাঙালিদের উৎসর্গের কথা জানান।

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের একটি বড় অংশজুড়ে ছিল সাম্প্রতিক মাদকবিরোধী অভিযান। এ ছাড়া তিস্তা চুক্তি, নির্বাচন, তারকাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ, দেশীয় রাজনীতিতে বিদেশি মহলের চাপ—এমন নানা বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রশ্নোত্তর পর্বের শুরুতে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, তিস্তা চুক্তি এবং রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে আপনার সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী দুজনের একান্ত সাক্ষাৎ হয়েছে। এই সাক্ষাতে এই দুটি বিষয় নিয়ে কী কথা হয়েছে, তা জানতে চান। এ ছাড়া তিনি মাদকের বিষয়ে জানতে চান।

মাদকবিরোধী অভিযান বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা জানেন যে মাদক সমাজে একটি ব্যাধির মতো। আপনারই পত্র-পত্রিকায় কিন্তু লিখেছেন এই মাদকের বিরুদ্ধে। আবার আজকে যখন মাদকবিরোধী অভিযান চলছে, তখন আবার সেটা আপনারা কীভাবে কী হচ্ছে না, হচ্ছে সেটার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার শুরু করেছেন। কোনটা চান? অভিযানটা চলুক, না বন্ধ হয়ে যাক?

শেখ হাসিনা বলেন, আইনগতভাবে কিন্তু কয়েক হাজার মাদক পাচারকারী, মাদক সেবনকারী ও সরবরাহকারীকে কিন্তু গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সংখ্যাটা ১০ হাজারের কম না। ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার হয়েছে। কিন্তু আমি একটু অবাক হই, আপনারা কিন্তু কোন পত্রিকায় সেটা কিন্তু উল্লেখ করেননি। বন্দুকযুদ্ধের বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘মাদক যারা পাচার করে, স্বাভাবিকভাবেই যেকোনো একটা ঘটনা যদি ঘটে, সেখানে যদি কিছু ঘটে আপনারাই বলবেন আইনগতভাবে এটা ঠিক নয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, একটা জিনিস (মাদক) ঘরে ঘরে। আজকে মেয়ে বাবাকে হত্যা করছে। ছেলে মাকে হত্যা করছে। ভাই ভাইকে হত্যা করছে এই মাদকের কারণে। কাজেই সমাজে একটা হাহাকার এই মাদক নিয়ে। তার বিরুদ্ধে কি অভিযান চালানো যাবে না? আপনারা দেখেন কতজনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে? মোবাইল কোর্ট করে সাজা দেওয়া হচ্ছে, তাৎক্ষণিকভাবে। গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, আইনের হাতে সোপর্দ করা হচ্ছে।

শেখ হাসিনা এ অভিযান সম্পর্কে বলেন, ‘খুব স্বাভাবিক এ ধরনের একটা অভিযান চালাতে গেলে কিছু ঘটনা ঘটতেই পারে। কোনটা বড় করে দেখবেন? মাদকবিরোধী অভিযান করা, মাদক বন্ধ করা? যখন সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান বন্ধ করতে গেছি, তখনো কিন্তু একই প্রশ্ন এসেছে। এখন সন্ত্রাস আমরা নির্মূল করতে পেরেছি।’ তিনি বলেন, মাদকবিরোধী অভিযান সারা দেশে যেটা চলছে, সারা দেশের মানুষই কিন্তু স্বস্তিতে আছে। এটা মানুষের দাবি, আপনাদের পত্র-পত্রিকায় তো বড় বড় শিরোনাম হয়েছে। কত নামীদামি পত্রিকায় বিশাল শিরোনাম হয়েছে সমাজ মাদকে ছেয়ে গেছে।

আমি যখন ধরি, ভালো করেই ধরি

মাদক বিষয়ে এক সাংবাদিক প্রশ্নে করেন, ‘যাদের কারণে মাদকের বিস্তার ঘটল, বিশেষ করে গডফাদার, কখনো কখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জড়িত না থাকলে তাহলে কেমন করে বিস্তার ঘটল? ওই যে শ্রেণিটি (গডফাদার), তাদের বিরুদ্ধে আমরা কতটা কঠোর হব?’

প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘গডফাদার বলতে আপনারা কাকে কাকে গডফাদার বলছেন, আমি সেটা জানি না। এটুকু বলতে পারি, কে গডফাদার, কে কী সেটা কিন্তু আমরা বিচার করছি না। যারা এর সঙ্গে জড়িত, দীর্ঘদিন থেকে গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করেছে। যে কারা এর ভেতরে জড়িত। আমরা কিন্তু হঠাৎ করে যাইনি।’

শেখ হাসিনা বলেন ‘যে-ই গডফাদার থাকুক, সে যে বাহিনীতেই থাকুক, কাউকে ছাড়া হচ্ছে না, হবে না। আমি যখন ধরি, ভালো করেই ধরি। ভালো করেই জানেন। কে কী, কার ভাই, কার চাচা, কার কে, ওটা কিন্তু দেখি না। এটা কিন্তু মাথায় রাইখেন।’

মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, এ অভিযানে এ পর্যন্ত ১০ হাজারের ওপর গ্রেপ্তার হয়েছে। কোন পত্রিকায় কত গ্রেপ্তার হয়, তা বলা হয় না।

লবিস্ট নিয়োগ করে নোবেল পাওয়ার ইচ্ছা নেই

সংবাদ সম্মেলনে সমকাল পত্রিকার সম্পাদক গোলাম সারওয়ার প্রশ্ন করেন, যে পুরস্কারটি আপনার প্রাপ্য রয়েছে, সেই পুরস্কারটি কিন্তু আপনি নোবেল শান্তি পুরস্কার…। এই পুরস্কার পাওয়ার জন্য একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা দরকার। এমনিতে কিন্তু এই পুরস্কার আসবে না। লবিস্ট নিয়োগ করতে হয়। অনতিবিলম্বে সেই প্রক্রিয়াটি শুরু করবেন কি না?

এই প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। এ ধরনের কোনো প্রক্রিয়া চালানোর আমার কোনো প্রবৃত্তি নেই, আমি সত্যি কথা বলব। আর লবিস্ট রেখে পুরস্কার পাওয়া, প্রথম কথা হচ্ছে, ওই লবিস্ট রাখার মতো আর্থিক সামর্থ্য আমার নেই। দ্বিতীয় কথা, থাকলেও বা কেউ করলেও আমি কোনো দিন সমর্থন করব না, করি না।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার নামে বহুবার পৃথিবীর বহু দেশ থেকে প্রস্তাব গেছে। আমি কোনো দিনই এটার বিষয়ে চিন্তা করিনি। ওটা নিয়ে আমার কোনো কিছু নেই। আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার মানুষকে দুবেলা পেট ভরে খেতে দিতে পারলাম কি না, তারা শান্তি পেল কি না, সেটা বড় কথা। কিন্তু সুদের টাকা নিয়ে নিজে অর্থ করে আবার সেই টাকা দিয়ে লবিস্ট নিয়োগ করে ওই নোবেল পাওয়ার ইচ্ছা আমার নেই, প্রয়োজনও নেই।’ তিনি বলেন, ‘কোনোটার জন্য আমি কিন্তু কখনো আমার কোনো চাহিদা ছিল না, আমি চাইওনি বলিনি, আমি জানিও না। এখনো অনেক প্রস্তাব আসছে আমার কাছে। আমি কিন্তু ওগুলোর পিছু ছুটি না। হ্যাঁ, নজরুলেরটা গিয়েছি যে কারণে, কবি নজরুল আমার কাছে একটু আলাদা মর্যাদার।’

বিএনপিসহ কিছু কিছু রাজনৈতিক দল বলছে, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বারবার আপনি ভারত সফর করছেন, সাংবাদিকের এই প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘স্বাভাবিক, যেতেই হবে। খালেদা জিয়া কি ভারতে যাননি? জিয়াউর রহমান কি ভারতে যাননি? জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করার দুই বছরের মধ্যে ভারতে গিয়েছিলেন। সেটা মনে হয় ১৯৭৭ সালে।’ ৭৭ সালের ডিসেম্বরে ভারতে গিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। কেন গিয়েছিলেন? সেটা বিএনপিকে জিজ্ঞেস করেন। ক্ষমতা দখল করেই তো প্রথমে ভারত সফরে গিয়েছিল। খালেদা জিয়া, তিনিও গিয়েছিলেন।

তিস্তা চুক্তি করতে যাইনি

ভারত কি তিস্তা চুক্তি এড়িয়ে যেতে চায়? এ প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সমস্যার কথা তুলে ধরে তিক্ততা তৈরি করতে চাই না। তিস্তা চুক্তি করতে সেখানে যাইনি। তিস্তা ব্যারাজ তো আমরা নিজেরা করেছি। ব্যারাজ করে পানি পানি করে আমরা চিল্লাচ্ছি কেন?’

তিস্তা নিয়ে ভারতের প্রতিশ্রুতির বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তারা কথা দিয়েছে। ওই পানি না পেলে আমরা চলতে পারব না? আমরা নদীগুলোর ড্রেজিং করছি। পায়রা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, যমুনা—সব কটির ড্রেজিং করছি। জলাধার খননের ব্যবস্থা করছি। বাংলাদেশজুড়ে আমরা বিভিন্ন প্রোজেক্টের কাজ করছি।’ এ সময় ঢাকার খালগুলো উদ্ধার করার কথা বলেন তিনি। আগামী মেয়াদে ক্ষমতায় এলে ঢাকার খাল খনন করে তার ওপর দিয়ে রাস্তা করার কথা জানান তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, আজকে তারা তিস্তা-তিস্তা করে। খালেদা জিয়া যখন ভারতে গেলেন, ফিরে এসে বলেছিলেন? ‘গঙ্গা পানির কথা, ওহো ওটা তো ভুলেই গিয়েছিলাম।’ তো ভুলে যায়নি? তিনি ভুলে যেতেন। আমাদের বিএনপির নেতাদের কি সে কথা মনে আছে যে তিনি গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা চাইতে ভুলে গিয়েছিলেন?’ এ সময় তিনি বলেন, ‘ওরা (বিএনপি) বলল যে আমি নাকি এক বালতি পানিও আনতে পারি নাই। এক বালতি পানি বোধ হয় রিজভীরে (বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী) একটু পাঠিয়ে দেওয়া উচিত।’

তিস্তা চুক্তি নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার মমতা ব্যানার্জির বিকল্প প্রস্তাব বিবেচনা করছে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সব কথা এখন তো জানার দরকার নেই। এটা তো তাদের বিষয়, তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তারা বিকল্প প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করবে। বিষয়টি ওখানেই থাকতে দিন, আমাকে জিজ্ঞেস করেন কেন? এ সময় সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন আপনার (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) মেয়াদ ও তাঁর মেয়াদের মধ্যে তিস্তা চুক্তি হবে। এই আশ্বাসের ওপর বিশ্বাস করেন কি না? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘শোনেন, আমি কারও ওপর ভরসা করে চলি না। আমার দেশের পানির ব্যবস্থা আমার নিজের কীভাবে করতে হবে, সেটা আমি করে যাচ্ছি। আমি নদীর ড্রেজিং করছি, জলাধার তৈরি করছি।’

ভারতের পত্রিকায় ছাপা হয়েছে যে বাংলাদেশ এখন ভারতের কাছে প্রতিদান চায়, আসলে আপনি কী আশ্বাস পেয়েছেন বা কোনো প্রতিদান চেয়েছেন কি না? সাংবাদিকের এই প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি কোনো প্রতিদান চাই না। প্রতিদানের কী আছে এখানে? কারও কাছে চাওয়ার অভ্যাস আমার একটু কম, দেওয়ার অভ্যাস বেশি। আমরা ভারতকে যা দিয়েছি, সেটা ভারত সারা জীবন মনে রাখবে। অতীতের গুলি, বোমাবাজি—আমরা কিন্তু তাদের শান্তি ফিরিয়ে দিয়েছি। এটা তাদের মনে রাখতে হবে। আমরা কোনো প্রতিদান চাই না। তবে হ্যাঁ, স্বাধীনতাযুদ্ধে সহায়তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি।’

নির্বাচনে ছোট ছোট দল এলে ভালো
ছোট ছোট দলের নির্বাচনে আনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ছোট ছোট দল যদি নির্বাচনে আসতে পারে, তাহলে খুব ভালো কথা। বিএনপির মতো অগ্নিসন্ত্রাস করা দলের চেয়ে এমন ছোট ছোট দল এলে ভালো।

সামনে নির্বাচন থাকায় কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক চাপ আছে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের জনগণই ঠিক করবে। আন্তর্জাতিক চাপ থাকবে। দেশের একটি গোষ্ঠী সব সময় থাকবে। তারা সব সময় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নালিশ করবে। সংবিধানসম্মতভাবে নির্বাচন হবে। নির্বাচন কমিশন নির্বাচন করবে। বিএনপি যাকে চেয়েছে, তাদেরই নির্বাচন কমিশনে রাখা হয়েছে। আমাদের একজন রাখা হয়েছে।