মহাসড়কে অবৈধ যান উচ্চ আদালতের নির্দেশ কার্যকর নয় কেন?

0
768

সড়ক নিরাপত্তার স্বার্থে মহাসড়কে কোনোভাবেই থ্রি-হুইলার চলতে পারে না। তবে নসিমন-করিমনসহ থ্রি-হুইলার জাতীয় যানবাহনের চালকদের পুনর্বাসন করার দায়িত্ব সরকারের। থ্রি-হুইলারের ওপর নির্ভরশীল যাদের রুটি-রুজি, তাদের আয়ের সহজ বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা সবচেয়ে জরুরি। মহাসড়কে অবৈধ যান চলাচল বন্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে সড়ক দুর্ঘটনা কমবে বলে আশা করা যায়।

প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনার খবর গণমাধ্যমগুলোতে আসছে। এ ঘটনাগুলো আমাদের জন্য প্রশ্নাতীতভাবেই উদ্বেগজনক। গত শনিবার তিন জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় নারীসহ ১৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন। মোটরযান আইনে পণ্যবাহী ট্রাকে যাত্রী পরিবহন নিষিদ্ধ। মহাসড়কে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত যান চলাচলও অবৈধ। নিষিদ্ধ এ দুই কাজে শুধু গাইবান্ধায় প্রাণ গেছে ১১ জনের। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিছক দুর্ঘটনায় নয়, অনিয়মের বলি হয়েছেন তারা।

সারা দেশের মহাসড়কে অবৈধ (অনিবন্ধিত) নসিমন, করিমন ও ভটভটি চলাচল বন্ধে গত বছরের ২৫ জুন সার্কুলার জারি করতে সরকারের প্রতি নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। অবৈধ এসব যান বন্ধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। দেশের বিভিন্ন এলাকায় নির্বিঘ্নে এসব যান চলছে। আমরা দেখেছি, ঢাকঢোল পিটিয়ে মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহন বা থ্রি-হুইলার বন্ধ ঘোষণা করেছিল সরকার। তখন থ্রি-হুইলার মালিক-চালকদের আন্দোলন, বাস চালকদের সঙ্গে সংঘর্ষ অনেক নৈরাজ্যই ঘটেছে। কিন্তু সরকার সড়ক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার প্রশ্নে তার সিদ্ধান্তে অটল থেকেছে। আমরাও একে সাধুবাদ জানিয়েছি। প্রথম দিকে সড়ক-মহাসড়কে বেশ মনিটরিং করা হচ্ছিল। এ সবকিছু সবাইকে আশান্বিত করেছিল। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই পরিস্থিতি আবার আগের মতো। কয়েক মাসের ব্যবধানে দেখা যাচ্ছে, মহাসড়কে অবাধে সিএনজি অটোরিকশা, বেবিট্যাক্সি, করিমন-নসিমন সবই চলছে। ফের মহাসড়কে উঠেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত সব রকমের পরিবহন। এতে আবারো বাড়ছে দুর্ঘটনা। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৮ লাখ নসিমন, করিমন, ভটভটি বিভিন্ন সড়কে চলাচল করছে। যার একটিও সরকারিভাবে অনুমোদিত নয়। তিন লক্ষাধিক ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক মহাসড়কে চলতে দিয়ে কোনো অবস্থাতেই নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমাদের দেশে প্রতি ১০ হাজার যানবাহনের মধ্যে ৮৬ দশমিক ৬টি যানবাহন প্রতি বছর মারাত্মক দুর্ঘটনায় পড়ছে। এই পরিসংখ্যানে নিহতের সংখ্যা এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ১৬৯ জন। একের পর এক মর্মান্তিক ও ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আমাদের সমবেদনা প্রকাশের মধ্য দিয়ে আমরা যেন দায়িত্ব শেষ করতে চাই। দুর্ঘটনায় এত মৃত্যুর পরও আমাদের চৈতন্যোদয় হচ্ছে না কেন? স্বীকার করতেই হবে এ ব্যাপারে আমাদের সচেতনতা প্রায় শূন্যের কোঠায়। প্রতিটি মানুষের কাছে তার নিজের জীবনের চেয়ে প্রিয় আর কিছু নেই। জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন জড়িত যে বিষয়কে ঘিরে, সে বিষয়ে আমরা এতটা উদাসীন কেন, তা এক বড় প্রশ্ন।

সড়ক নিরাপত্তার স্বার্থে মহাসড়কে কোনোভাবেই থ্রি-হুইলার চলতে পারে না। শুধু তাই নয়, মহাসড়কের আশপাশে কোনো ধরনের জনবসতি, হাট-বাজার বা স্থাপনাও থাকতে পারে না। তবে নসিমন-করিমনসহ থ্রি-হুইলার জাতীয় যানবাহনের চালকদের পুনর্বাসন করার দায়িত্ব সরকারের। থ্রি-হুইলারের ওপর নির্ভরশীল যাদের রুটি-রুজি, তাদের আয়ের সহজ বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা সবচেয়ে জরুরি। মহাসড়কে অবৈধ যান চলাচল বন্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে সড়ক দুর্ঘটনা কমবে বলে আশা করা যায়।