মজুরী বৈষম্যসহ কুমতলবের শিকার হচ্ছেন নারী শ্রমিক

0
1310

# মহানগরীতে বাড়ছে ভাসমান নারী শ্রমিকের সংখ্যা

নিজস্ব প্রতিবদক:
খুলনা মহানগরীর সাতরাস্তার মোড়ে কাজের আশায় প্রতিদিনই কাকডাকা ভোরে ছুটে আসেন নাসিমা বেগম (৩০)। ছিপ ছিপে পাতলা দেহের নাসিমা রাজমিস্ত্রির যোগালের কাজ করে থাকেন। এই কাজ করতে এসে পরিচয় হয় রাজমিস্ত্রি ইব্রাহিমের সাথে। নাসিমাকে বিয়ে করার আগে ইব্রাহিম আরো ১১ টি বিয়ে করেছেন। তাদের ছেড়েও দিয়েছেন। এরা এখন সকলে রাজমিস্ত্রির যোগালের কাজ করেন। নাসিমার ভাষায়, ‘কাজ দেয়ার কথা বলে নানা আ-কথা কু-কথা (কু প্রস্তাব) কয়। কিন্তু কি করবো পেটের দায়ে সব নিরবে সহ্য করে কাজ করতে এসে ওদের খপ্পরে পড়তে হয়।’ একই স্থানে কাজের আশায় ছুটে আসেন আয়েশা, শাফিনা ও ছাবিনা। নাসিমা জানায়, এরাও ইব্রাহিমের মতো কোন না কোন রাজমিস্ত্রির স্ত্রী। কাজ করতে এসে ওরা সকলেই তার মতো ইব্রাহিমদের কুমতলবের শিকার হচ্ছেন।

কাথা হয়, চলি¬শ বছর বয়স্কা রাশিদা বেগমের সাথে। তার ভাষায়, ‘একজন পুরুষ শ্রমিক যে কাজ করেন আমিও সে কাজ করতে পারি, করেও থাকি। তথাপি আমাকে মজুরী কম দেয়া হয়। তারপর রয়েছে পুরুষ শ্রমিকদের বাজে কথা।’পেশায় রাজমিস্ত্রির যোগালে রাশিদা একজন ভাসমান শ্রমিক। পুরুষের পাশাপাশি তিনি কাজ করে আসছেন। নগরীর সাতরাস্তার মোড়ের কাজের জন্য আসা ফরিদা জানান, ‘প্রথম যহন কাজ করতে আইলাম তহন কিছু দিন এক রাজমিস্ত্রি যোগালের কাজ দিলো। তারপর একদিন বিয়ের প্রস্তাব দিলো। কিন্তুু যহন শুনলো আমার বিয়ে হয়ে গেছে তহন আর কাজ দিলো না। আমরা কাজ বেশী করলিও ওনাগে (পুরুষ শ্রমিকের) চাইতে টাহা (টাকা) কোম দেয়।’
অনুসন্ধানে জানাযায়,খুলনা মহানগরীতে ভাসমান নারী শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিদিন শত শত নারী কাজের আশায় নগরীর নিদৃষ্ট কয়েকটি স্থানে ছুটে আসেন। একই কাজের জন্য একজন পুরুষ শ্রমিককে যে মজুরী দেয়া হয়, একজন নারী শ্রমিককে সে মজুরী দেয়া হয় না। বিভিন্ন বস্তি এবং সংলগ্ন উপজেলা থেকে কাজের জন্য ছুটে আসা এই দরিদ্র, নির্যাতিত, নিপিড়িত, স্বামী পরিত্যাক্ত ভাসমান নারী শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রে শ্রম বৈষম্য এবং অশ¬ীল আচরণের শিকার হয়ে থাকেন।
এক সময়ের শিল্প ও বন্দর নগরী হিসাবে খ্যাত খুলনার আজ আর সেই জৌলুস নেই। বড় বড় মিল-কলকারখানা একে একে বন্দ হয়ে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে খুলনা নিউজ প্রিন্ট মিল, দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরী, বেশ কয়েকটি জুটমিল, লবণ কল এবং অনেকগুলো ম্যৎস প্রক্রিয়াজাতকরণ কোম্পানি। দু’চারটি যা চালু আছে তাও চলছে ঢিলেঢালা ভাবে। এই পরিস্থিতিতে বেকার হয়ে যাওয়া শ্রমিকদের সামনে শুধু আন্ধকার। জীবিকার সন্ধানে মাঠে নেমে এসেছে তাদের স্ত্রী ও শিশু সন্তানেরা। তাছাড়া খুলনাঞ্চলের উপজেলাগুলোতে এখন আর তেমন কাজ নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের চড়া মূল্যের এই বাজারে অনেক গরীব গৃহবধুকেও জীবিকার সন্ধানে ছুটতে হয় গ্রাম থেকে শহরে। এভাবে প্রতিদিনই বাড়ছে ভাসমান নারী শ্রমিকের সংখ্যা।
খুলনা মহানগরীর প্রায় ১৫ থেকে ২০ টি স্থানে প্রতিদিন কাজের আশায় ছুটে আসেন ভাসমান নারী শ্রমিকেরা। এসকল শ্রমিকরা নগরীর ময়লাপোতা, শিববাড়ি, দোলখোলা, সাতরাস্তার মোড়, রূপসা ফেরী ঘাট, দৌলতপুর বাস স্টান্ড, বয়রা বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রম বিক্রির জন্য আসেন । পুরুষের পাশে দাড়িয়ে কাজ ঠিক করে নেন। সাধারনত নির্মাণ কাজে রাজমিস্ত্রির যোগাল, ইট ভাঙ্গা, রাস্তা খোড়া, মাটি কাটা, বেলচা মার (নির্মাণ সামগ্রী মিশানো) ছাদ ঢালাইসহ কায়িক পরিশ্রমের প্রায় সকল প্রকার কাজ করে থাকেন। বিভিন্ন কাজের জন্য একজন নারী শ্রমিককে একজন পুরুষ শ্রমিকের চেয়ে গড়ে ৫০ থেকে ১০০ টাকা মজুরি কম দেয়া হয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, রাজের কাজের যোগাল দেয়ার জন্য একজন নারী শ্রমিক পারিশ্রকি পান ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। তবে একই কাজের জন্য একজন পুরুষ শ্রমিক পেয়ে থাকেন নূন্যতম ৪০০ টাকা। ইট ভাঙ্গা,মাটি কাটা, রাস্তা পরিস্কার এবং বেলচা মারা কাজের জন্যও নারী শ্রমিকে মজুরী কম দেয়া হয়ে থাকে। অথচ কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষ উভয়ে সমান পরিশ্রম করে থাকেন। শ্রমবৈষম্য ছাড়াও অনেক সময় নারী শ্রমিকেরা লেবার সরদার কর্তৃক অশ¬ীল আচরণের শিকার হয়ে থাকেন।