ভদ্রা নদী খনন শুরু হলেও ভুমিহীনদের বাঁধায় একাংশের কাজ বন্ধ

0
1056

ডুমুরিয়া প্রতিনিধি : ডুমুরিয়ায় সকল বাঁধা ও জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ভদ্রা নদী খনন কাজ শুরু হলেও ডুমুরিয়া সদর ইউনিয়নে ভূমিহীনদের বাঁধায় নদীর একাংশের কাজ বন্ধ রয়েছে। এছাড়া অন্য এলাকায় অনেক ভুমিহীন অসহায় পরিবার তাদের বসত ঘর ভেঙ্গে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে। তবে তাদের আশ্রয়স্থল এখন খোলা আকাশের নিচে। ৭৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দে ভদ্রা নদী ও সালতা নদী খনন প্রকল্পটি ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে খনন কাজ শুরু হয়। ২০১৯ সালের জুন মাসের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও নানা জটিলতায় খনন শুরুর ইতিমধ্যে একটি বছর পার হয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্ট সুত্র জানা যায়, এককালের প্রমত্তা ভদ্রা নদী ভরাট হয়ে প্রভাবশালীদের দখলে চলে গেছে। ওই নদীর অবশিষ্ট কোন অংশ নেই যা দখল নেই। ভদ্রা নদীর একাংশ সাগরের সাথে মিশেছে, অপর অংশটি ডুমুরিয়ার শোলগাতিয়ার বুড়ি ভদ্রায় গিয়ে মিশেছে। এছাড়া ডুমুরিয়া বাজারের কাছে ভদ্রা নদীর সংযোগ থেকে শোলমারি নদীতে মিশেছে সালতা নদীটি। যে দু’টি নদী ভরাট হয়ে প্রভাবশালীদের দখলে গেছে। নব্বই দশকের পর থেকে ভদ্রা নদীটি ভরাট হতে থাকে। ভদ্রা নদীর প্রায় ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত ভরাট হয়ে গেছে। নদী ভরাটের সাথে সাথে দখলদাররাও গ্রাস করে নেয়। ভদ্রার বুকে যে যার মত স্থাপনা গড়ে তুলেছে। নদীর বুকে সমতল ভুমিতে গড়ে উঠেছে রাইস মিল, স মিল, বাজার, বহুতল ভবনসহ নানা অবৈধ স্থাপনা। এছাড়া ভরাট নদীর বুকে সরকার আশ্রয়ণ প্রকল্পও গড়ে তুলেছে। পানি নিষ্কাশনের পথ আটকিয়ে যত্রতত্রভাবে বেড়ি বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করছে দখলদারেরা। যেকারণ ভারী বর্ষন নামলে এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে আসছে। এই পরিস্থিতি’র মোকাবেলায় নদী খননের উদ্যোগ নেয় সরকার। যার একনেকে প্রকল্প বাস্তবায়নে ৭৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়। যা বাস্তবায়ন করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু এ নদী খনন নিয়ে একাধিকভাবে বাঁধা পড়ে দখলদারদের পক্ষ থেকে। ২০১৬ সালের পহেলা জুলাই হতে কাজ শুরু করার কথা থাকলেও ইতোমধ্যে একটি অর্থ বছর পার হয়ে গেছে। এসব বাঁধার অবসান ঘটিয়ে চলতি সপ্তাহে কাজ শুরু হয়েছে। যাহা আগামী ২০১৯ সালের ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা রয়েছে। প্রায় ২১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যর নদী খনন প্রকল্প ৯টি প্যাকেজে ৭ জন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্র জানা যায়, ভদ্রা নদীটি দুই প্রান্ত থেকে ভিন্ন ভিন্ন মাপে খনন করা হবে। এরমধ্যে দক্ষিন অংশে ডুমুরিয়ার দিঘলিয়া থেকে ডুমুরিয়া বাজার পর্যন্ত ১১ দশমিক ৭ কিলোমিটার এবং উত্তর অংশের তেলিগাতি হতে ডুমুরিয়া বাজার পর্যন্ত ৯ দশমিক ৮ কিলোমিটার খনন করা হবে। দিঘলিয়ার ভদ্রা মুখে ১০ ভেটর স্লুইসগেট নির্মান করা হবে। তেলিগাতিতেও একটি স্লুইসগেট নির্মান হবে। ভদ্রা নদীটি খনন সম্ভাব্য মাপ নির্ধারণ করা হয়েছে ১১০ মিটার এবং তলদেশ ৬০ মিটার। এছাড়া সালতা নদীটি ডুমুরিয়ার ভদ্রা নদী থেকে শুরু হয়ে ৯ কিলোমিটার খনন হয়ে শোলমারি নদীতে সংযুক্ত করা হবে। সালতা নদীর তলদেশ ১০ মিটার সম্ভাব্য মাপ নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, ‘২০১৪-২০১৫ অর্থ বছরে নদী দুটি খননের জন্য প্রকল্প জমা দেয়া হয়। প্রকল্পটি সম্ভাব্যতা যাচাই করে এবং এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে সরকার গত ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একনেকের বৈঠকে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ৭৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। যা ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে খনন কাজ শুরু হয়ে শেষ হবে ২০১৮-২০১৯ সালে মোট ৩ অর্থবছরে।’
এদিক সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নদীর বুকে বসবাসরত পরিবারগুলো তাদের কাঁচা-পাকা ঘর বাড়ি ভেঙ্গে সরিয়ে নিচ্ছে। তবে দখলদারেরা এখন অসহায়ভাবে জীবনযাপন করছে। গৃহ ছেড়ে তারা খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছে। দক্ষিন চিংড়া গ্রামের মোঃ আবুল হোসেন জানান, মাটি কাটা শুরু হলে ঘর ভেঙ্গে নিয়েছি, এখন আমরা পরিবার নিয়ে কোথায় থাকবো? ওই পরিবারটি স্থানীয় শ্মশান ঘাটের পাশে অবস্থান করছে। আশ্রয়ন প্রকল্পের পাশে সুধীর বিশ্বাস তার পাকা বাড়ি ভেঙ্গে নিচ্ছে। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ঘর ভেঙ্গে এখন ফুটবল খেলার মাঠে পাশে আশ্রয় নিয়েছি। আমাদের এখন উপায় কি? তবে এমন শতশত পরিবারের আশ্রয়স্থল এখন খোলা আকাশের নিচে।
উল্লেখ্য, বড় বড় রাঘবরা প্রথম ভদ্রা নদীর জায়গা দখল করে, পরবর্তিতে তারা বড় অংকের বিনিময়ে পজিশন বিক্রি করে দিয়েছে এসব অধিকাংশ পরিবারের কাছে।
ডুমুরিয়া সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গাজী হুমায়ুন কবির বুলু বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য ভদ্রা ও সালতা নদী খনন করা বর্তমান সরকারের প্রসংশনীয় উদ্যোগ। কিন্তু নদী খননের আগে ভদ্রার বুকের সীমানা নির্ধারণ পূর্বক একটি স্কেচ ম্যাপ করে নদীর বুকে বসবাসরত প্রকৃত ভুমিহীনদেরকে পুনর্বাসিত করার কথা ছিল। কিন্তু আজো তা করা হয়নি। ফলে আমার ইউনিয়নে কাজ বন্ধ রয়েছে।
শোভনা ইউপি চেয়ারম্যান সুরঞ্জিত কুমার বৈদ্য বলেন, আমার ইউনিয়নে একাংশ শোভনা গাবতলা এলাকায় (মঙ্গলবার) খনন কাজের উদ্বোধন করা হয়েছে। ভদ্রা নদী খনন হলে এ অঞ্চলে স্থায়ী জলাবদ্ধতার নিরশন হবে। কিন্তু নদী খননে শোভনা মৌজায় দেখা যাচ্ছে সালতার দিঘলীয়া এলাকায় প্রায় ৩ কিলোমিটার পর্যন্ত মুল নদী বাদ রেখে রেকর্ডীয় মালিকানা জমিতে খনন প্রক্রিয়া শুরু হয়। ¯ানীয় জমির মালিকরা গত সোমবার খনন কাজ বাঁধা দিয়ে বন্ধ রেখেছে। বিষয়টি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীকে অবগত করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ শরীফুল ইসলাম বলেন, চলতি সপ্তাহে অনানুষ্ঠানিকতার মধ্যদিয়ে নদী খনন কাজ শুরু হয়েছে। আমরা ডিসি অফিসের প্রতিনিধিদের নিয়ে নদীর সীমানা নির্ধারণ করে মাঝ বরাবর লাল পতাকা টানিয়েছি। সেনুযায়ী খনন কাজ চলছে। তবে নদী সীমানার বাহিরে আমরা কোনভাবেই যাবোনা। যদি কেউ অভিযাগ দেয় তা সঠিক না।
এ প্রসঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ এমপি বলেন, নদীর সঠিক ম্যাপ অনুযায়ী খনন কাজ হবে এতে কোন সন্দেহ নেই। আমি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীকে বলেছি নদীর ম্যাপ অনুযায়ী খনন করতে। এছাড়া ভদ্রার বুকে বসবাসরত প্রকৃত ভূমিহীনদের যাচাই বাছাই করে তাদের পূনর্বাসিত করা হবে। ভদ্রা নদী খনন হলে ডুমুরিয়ার মানুষের ব্যাপক উপকার হবে। এলাকায় আর জলাবদ্ধতা থাকবে না।