ব্রেক ড্যান্সে যে পাগল ভেঙেছিল মন!

0
891

বিনদোন ডেস্কঃ
মাইকেল জ্যাকসনমাইকেল জ্যাকসনগানের শতক বলতেই বিগত শতক। হৃদয়ের গানের শতক। অমর গানের শতক। গান শাসন করেছে বিশ্ব। সব ভাষায়। এখনো সেই গান আর শিল্পীরা করে চলেছে শাসন। গত শতকে সবখানেই জন্মেছে রাজা-রানি, দাপিয়ে বেড়িয়েছে মাসট্যাং বা অ্যাপালুসা ঘোড়ার মতো। উল্কাবৃষ্টির মতো এই গ্রহে বর্ষিত হয়েছে কণ্ঠের ঝাঁক ঝাঁক প্রতিভা। সব কোনায়, সব ভাষায়। ভারতে উৎপলা সেন, গীতা দত্ত, লতা মঙ্গেশকর, সামশাদ বেগম, আশা ভোসলে, সতীনাথ, শচীন দেববর্মন, কিশোর কুমার, রাহুল দেববর্মন, মোহাম্মদ রফি, মুকেশ, হেমন্ত, মান্না দে, ভুপেন হাজারিকারা মাতিয়েছেন বাংলা-হিন্দি। গজলে মেহেদি হাসান, অনুপ জালোটা, জগজিৎ সিং, চিত্রা সিং, বড়ে গোলাম আলী, নুসরাত ফাতেহ আলী খানরা খেলেছেন টোটাল ফুটবল। বাংলাদেশে রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমীন, শাহনাজ রহমতউল্লাহ, আনজুমান আরা বেগম, ফেরদৌসী রহমান, ফিরোজা বেগম, আবদুল জব্বার, মাহমুদুন নবী, খান আতা, খুরশিদ আলম, সত্য সাহারা স্বাধীনতা-পরবর্তী রেডিও-টিভি-মুভি চাঙা করে রেখেছিলেন। তরুণ প্রতিভা হিসেবে উদয় হন লাকী আখান্দ্‌-হ্যাপী আখান্দ্‌ ব্রাদার্স। উদয় হয় একঝাঁক নজর ও হৃদয়কাড়া পপ গায়ক—আজম খান, ফেরদৌস ওয়াহিদ, ফিরোজ সাঁই, ফকির আলমগীর, পিলু মমতাজ!

হ্যাঁ পপ গান। ‘পপ মিউজিক’ কথাটা ‘পপুলার মিউজিক’-এরই সংক্ষেপ। এসেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। গত শতকের পঞ্চাশের দশক থেকেই এর শুরু। পপ গানই পপুলার বা জনপ্রিয় গান। পরে ‘পপ’ আর ‘রক এন রোল’ প্রায় এক অর্থে মিলে যায়। পপ গায়কেরা বের করে নিয়েছিলেন নিজেদের আলাদা ঢং। চলনবলন, পোশাক-আশাক, গায়কি ঢঙে। যেমন বব মার্লে, জন লেনন, এলভিস প্রিসলি, মার্ক নফলার, এন্ডি গিব আর প্রশ্নাতীতভাবেই মাইকেল জ্যাকসন! বিশেষ ধরনের ট্রাউজারস, বড় কলারে ছোট্ট স্কিনটাইট শার্ট, স্টাইলিশ চুলের ঢঙে পপ গায়কেরা স্বতন্ত্র। আবার বিটলসের জন লেননের ধাঁচটা ইন্টেলেকচুয়াল। প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা ঢং। আমাদের আজম খান-ফিরোজ সাঁইরা অবশ্য বেলবটম প্যান্টে ছোট জ্যাকেট আর কাঁধসমান চুলকেই লুফে নিয়েছিলেন!

ষাটের দশক থেকে সত্তরের দশকে আমেরিকা-ইউরোপের গানের জগতে এক চমৎকার ট্রেন্ড চালু হয়। পরিবারভিত্তিক গানের ব্যান্ডস। যেমন: ভাই আর বোন মিলে ‘কারপেন্টার্স’, চার ভাই মিলে ‘বি জিস’, যেখান থেকে এন্ডি গিব তিন ভাই থেকে আলাদা হয়ে যান, দুই ভাই ও তাঁদের বউরা মিলে ‘অ্যাবা’, পাঁচ ভাই মিলে ‘দ্য জ্যাকসন ফাইভ’, যেখান থেকে বেরিয়ে আসেন গত শতকের কিংবদন্তি মাইকেল জ্যাকসন! বাংলাদেশেও এর ঢেউ লাগে। ‘জিঙ্গা শিল্পী গোষ্ঠী’ নামের ব্যান্ড তৈরি করেন শাফাত আলী-নাজমা জামানরা ভাই-বোন-ননদ মিলে। ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় সে ব্যান্ডের গানগুলো।

গেল শতকে প্রথম একক ‘ক্রেজ’ তৈরিতে সফল হন আমেরিকান লেডি কিলার গায়ক-অভিনেতা এলভিস প্রিসলি। মাতিয়ে রাখেন পঞ্চাশ থেকে ষাটের দশক। রক এন রোল রাজা এই সুদর্শন গায়কের জন্য পাগল আমেরিকা-ইউরোপের লাখো-কোটি দর্শক-শ্রোতা। আর পেছনে লেগে থাকে দুষ্টু সুন্দরীরা। শো করতে সাদা গাড়িটি বাইরে পার্ক করে ভেতরে যান, শো শেষে ফিরে এসে দেখেন মেয়েদের লিপস্টিকে সাদা গাড়ি লাল হয়ে আছে। বিরক্ত হয়ে গাড়ির রংই পাল্টে লাল করে ফেলেন।

কিন্তু তখনো বিশ্ব জানে না, খোদ এই যুক্তরাষ্ট্রেই এক সুরের জাদুকর আস্তে আস্তে হেঁটে আসছে, শুধু আমেরিকা-ইউরোপ জয় করতে না, সারা বিশ্ব মাতাতে। ছোট ছেলে, কোঁকড়ানো চুল। মন-শরীর-গলা-আত্মা দিয়ে গান গায়। নাম তার মাইকেল জ্যাকসন!

পাঁচ ছেলেকে দিয়ে এক ব্যান্ড গড়ে দেন মাইকেল জ্যাকসনের বাবা। নাম দেন ‘জ্যাকসন ব্রাদার্স’। যেন ফাইভ মেন আর্মি! পরে হয় ‘দ্য জ্যাকসন ফাইভ’! মূল গায়ক ছোট্ট মাইকেল জ্যাকসন। একের পর এক অ্যালবাম বের হয়, হিট হয়। শ্রোতা-দর্শক চোখ ছোট ছোট করে মাপে, কে এই দৈব পিচ্চি? হঠাৎ হ্যালির ধূমকেতু?

যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা ছাড়িয়ে মাইকেল জ্যাকসন চলে আসে ঢাকার আজিমপুরের হুদার হোটেলে। আশির দশকে। আসবেই-বা না কেন? তখন সারা বিশ্ব চিনে গেছে এই অবাক বিস্ময় কে। তার ‘থ্রিলার’ অ্যালবামের ‘থ্রিলার’ আর ‘বিট ইট’ গান দুটো এই গ্রহের সবার প্রিয়। হুদারও। আমরা বন্ধুরা শিঙারা-চায়ে আড্ডা মারি হুদার হোটেলে, ক্যাসেটে সারাক্ষণ বাজে ‘জাস্ট বিট ইট’!

গান যে শুধু গলায় না, শরীর দিয়েও গাওয়া যায়, তা নতুন এক ধরনের ড্যান্স মিশিয়ে দেখিয়ে দেয় এই বিরল প্রতিভা মাইক জ্যাক। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে পায়ের পাতায় উঁচু-নিচু ঢেউ খেলিয়ে হাঁটার স্টাইলকে সে নাম দেয় ‘মুন ড্যান্স’ বা ‘চাঁদে হাঁটা’। গানের বিটে হঠাৎ যান্ত্রিক রোবটের মতো শরীর ঘুরিয়ে নিজস্ব মজার ভয়াবহ স্টাইলকে সে নাম দেয় ‘রোবট ড্যান্স’। তার এই নিজস্ব স্টাইল যে শুধু কোটি কোটি ভক্তই প্র্যাকটিস করতে শুরু করে তা না, নামকরা গায়কদেরও পছন্দের স্টাইল হয়ে দাঁড়ায় এটা। সহজ করার জন্য মানুষ একে বলে ‘ব্রেক ড্যান্স’। ‘ব্রেক ড্যান্স’ হয়ে ওঠে স্মার্টনেসের প্রতীক। এই পপের রাজার গান আর তার গড গিফটেড প্রতিভায় ভক্ত হয়ে যান বিশ্বের নামকরা ব্যক্তিরাও। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন, তাঁর প্রিয় গায়ক মাইকেল জ্যাকসন। একই ঘোষণা দেয় লালবাগের বন্ধু সেলিমও। আজাদ অফিসের সামনে বালুর মাঠের পাশে ওদের বাসা। কেউ গেলেই ধরে বসিয়ে ‘থ্রিলার’ ছেড়ে ব্রেক ড্যান্স দেখিয়ে দেয়। ওর মনে শুধু মাইকেল জ্যাকসনই না, যুক্তরাষ্ট্রও। তার ধারণা, সেখানে গেলে সে রাস্তাঘাটে মাইকেলের ব্রেক ড্যান্স দেখাতে পারবে। আজ দুই দশকের বেশি সে যুক্তরাষ্ট্রে থাকে। তবে ‘ব্রেক ড্যান্স’ নিয়ে রাস্তায় নামার চেষ্টা করেছে বলে শুনিনি।

বিরল প্রতিভা মাইকেল জ্যাকসন এ দেশের আনাচকানাচে কত জনপ্রিয় ছিল, তার একটা নমুনা। পিকনিকে যাচ্ছি কলেজবন্ধুরা। তখন পিকনিক মানে একটা বাস ভাড়া করে ছাদে ড্যাগ-ডেকচি-কুকসহ মাইকে গান ছেড়ে চন্দ্রার শালবনে চল। মাইকে চলছে মাইকেল জ্যাকসন। গাজীপুর মোড়ে বাস থামায় গানটা বন্ধ করা হলো। কী আশ্চর্য! পাশের চায়ের দোকানে এই গানটাই বাজছিল। দোকানি মজা পেয়ে দিল গানের ভলিউম বাড়িয়ে। গানের অর্থ বোঝার দরকার নেই, ‘বিট ইট-বিট ইট’ হলেই তো সেটা মাইকেল জ্যাকসন। বুঝিয়ে দিল, মাইকেল তোমরা এগিয়ে চলো, আমরা আছি তোমার সঙ্গে!

কথায় আছে, গাছের পাকা আমেই সবাই ঢিল মারে। ‘গোল্ডেন চাইল্ড’ মাইকেল জ্যাকসন বাদ যাবে কেন? তার চরিত্র হননের এমন চেষ্টা হয়েছে। যে কিনা অসম্ভব শিশু অনুরাগী, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হয়েছে যৌন হয়রানির। আদালত বলেছে, সম্পূর্ণ ভুয়া, জাস্ট হয়রানি। তার ধর্মান্তরিত হওয়া নিয়ে ঘোলা জল বানালেও মাটির মানুষ সুরসম্রাট এ বিষয়ে কিছুই বলেননি।

জীবনে পাননি কী? অর্থবিত্ত, প্রতিপত্তি, ভালোবাসা, আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা? কী ব্যথা ছিল তাঁর? নাকি রহস্য? সব পাওয়ার হতাশা, নাকি অন্য কিছু? ২০০৯ সালের ২৫ জুন, মানে এই দিনে মাইকেল জ্যাকসনকে তাঁর নিজ বাসভবনে মৃতপ্রায় পাওয়া যায়। তাঁর ব্যক্তিগত ডাক্তারের মতে আগের রাতে তিনি ঘুমের ওষুধ খেয়েছিলেন। মাত্র ৫১ বছর বয়সে ভেঙে দিয়ে গেলেন কোটি কোটি হৃদয়, যারা একেবারেই প্রস্তুত ছিল না তাঁর চিরবিদায়ের জন্য।

কিংবদন্তি এই সুরের রাজা ব্রেক ড্যান্সে হৃদয় ভেঙে দিয়ে গেছেন। কিন্তু সেই ভাঙা হৃদয়েই তিনি দাঁড়িয়ে আছেন আকাশছোঁয়া খাড়া ইউক্যালিপটাসের মতো।

সেটা তিনি জানেন তো? তাঁকে কি কেউ জানিয়ে দেবেন, তাঁর প্রতি ভালোবাসার কোনো দেশ, ভাষা বা কোনো গণ্ডি ছিল না? যোগাযোগের কি কোনো মাধ্যম নেই, তাঁকে এ কথা জানানোর?