বেপরোয়া অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট : লাশ নিতে বাধা : প্রতিবাদে লাঞ্ছনা

0
547

কামরুল হোসেন মনি:
খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতাল ঘিরে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চক্রটি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি অসহায় রোগী ও স্বজনরা। ওই সিন্ডিকেটের অ্যাম্বুলেন্স ব্যতীত বাইরের কোন অ্যাম্বুলেন্সে রোগী বা লাশ বহন করতে পারবে না। নিতে হলে তাদেরকে টাকা দিতে হবে।
বৃহস্পতিবার (১৪ জুন) সকালে এক ব্যক্তির লাশ নেওয়ার সময় ওই অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের হাতে মৃত ব্যক্তির ছেলে মারধরের শিকার হন। এ ঘটনায় হাসপাতালে চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি রবিউল ইসলাম প্রতিবাদ করলে তাকেও মারধর করে। মারধরের শিকার খন্দকার কামরুজ্জামান বাদী হয়ে সোনাডাঙ্গা মডেল থানায় ৫ জনের নাম উল্লেখ করে দ্রুত বিচার আইনে থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলার এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে আটক করা হয়েছে। আটককৃতরা হচ্ছে মোঃ সাইদুর রহমান শুকুর ও আল আমিন ওরফে কালু। এছাড়া এজাহারভুক্ত অন্যান্য আসামিরা হচ্ছেন ফারুক (১), ফারুক (২) ও ফরিদ। এছাড়া মামলায় আরও ৬-৭ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটে জিম্মি দক্ষিণাঞ্চলের খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম। এখানে সেবা নিতে আসা রোগীদের কোনো না কোনো সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়তে হয়। সেবার নামে অ্যাম্বুলেন্স’র চালকরা নির্দয় আচরণ করে। এরা একই সঙ্গে রোগীদের নানাভাবে প্রতারিত করে। হাসপাতালের রোগীকে জিম্মি করে কর্মচারীরা অ্যাম্বুলেন্স বাণিজ্যে লিপ্ত হচ্ছেন। এ সব সিন্ডিকেটের কারণে রোগী বা রোগীদের স্বজনকে অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া চার-পাঁচ গুণ পর্যন্ত গুণতে হয়। ভাঙাচোরা ও লক্করঝক্কড় যেমনই হোক, এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে বা গন্তব্যে রোগী নিয়ে যাওয়ার জন্য স্বজনদের আর কোনো উপায়ও থাকে না। লাশ নিতে আরও হয়রানির শিকার হতে হয় সাধারণ মানুষকে। স্বয়ং হাসপাতালের কর্মচারী ও দালালদের হাতে রেখে অনেকটা রেন্ট-এ কারের মতোই চালানো হচ্ছে এই অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসা। এই চক্রটি বিভিন্ন মডেলের পুরনো গাড়ি বাইরে থেকে রঙচঙ মাখিয়ে অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে ব্যবহার করে। ওপরে লালবাতি ও হুঁইসেল বসিয়েই অ্যাম্বুলেন্স তৈরি করা হয়। বাইরে চকচক করলেও ভেতরে দেখা গেছে, রোগীকে শোয়ানোর মতো শুধু একটি সিট। আর দুই একজন বসার মতো আরেকটি সিট। বড় অক্ষরে লেখা অ্যাম্বুলেন্স। এভাবে চলছে নিরীহ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা।
সূত্র জানায়, অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসা অনেকটা ওয়ার্ডবয় ও কর্মচারীদের নিয়ন্ত্রণে। কারণ কোন ওয়ার্ড থেকে কোন রোগী বের হবেন সেই তথ্য ওয়ার্ড বয়দের কাছে থাকে। এর জন্য কমিশনও পেয়ে থাকেন তারা।
খুমেক হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি শেখ রবিউল ইসলাম বলেন, মৃত ব্যক্তির ছেলে মোঃ খন্দকার কামরুজ্জামান পাইকগাছা থেকে যে অ্যাম্বুলেন্সে করে তার পিতাকে নিয়ে আসেন, ওই অ্যাম্বুলেন্সে লাশ নিয়ে আবার ফিরে যেতে চান। কিন্তু জরুরি বিভাগের সামনে অ্যাম্বুলেন্স চালকরা তাদের নিয়েজিত অ্যাম্বুলেন্সে লাশ বহন ছাড়া কোন অ্যাম্বুলেন্স এখান থেকে লাশ নিয়ে যেতে দেবে না। এর প্রতিবাদ করায় প্রথমে পাইকগাছা থেকে আসা অ্যাম্বুলেন্স চালককে মারধর করে পরে রোগীর ছেলে প্রতিবাদ করলে তাকেও সংঘবদ্ধ চালকরা মারধর করে। রবিউল ইসলাম জানান, আমি ওই সময় হাসপাতালে কর্মরত ছিলাম। জরুরি বিভাগের সামনে রোগীদের কান্নাকাটি দেখে বাইরে আসি। সব কিছু শোনর পর আমি এর প্রতিবাদ করলে আমাকে অ্যাম্বুলেন্স চালক ফরিদ প্রথমে আমাকে মারে। তারপর শুকুর, কালুসহ ১৫-২০ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল একত্রিত হয়ে হামলা শুরু করে। ঘটনাটি হাসপাতাল ক্যাম্পসে ছড়িয়ে পড়লে খুমেক হাসপাতালের সব স্টাফ এক হয়ে এর প্রতিরোধ করে। পরবর্তীতে রবিউল ইসলাম হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ করেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। এখান থেকে পুলিশ অভিযুক্ত দুইজনকে আটক করেছে।
এ ব্যাপারে সোনাডাঙ্গা থানার ওসি মমতাজুল হক বলেন, রোগীর লাশ অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র ঘটনার সূত্রপাত। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী রোগীর ছেলে বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেছেন। ঘটনাস্থল থেকে দুই আসামিকে আটক করা হয়েছে। বাকীদের ধরতে তাদের টিম অভিযানে রয়েছে।