বিদ্যুতের পয়ত্রিশ পয়সা দাম বৃদ্ধি, আসলে কত!

0
607

কৌশিক দে:
অন্তহীন ঘটনায় আমাদের জীবন কেটে যায়। গত কয়েকটি সপ্তাহও এমনভাবে কেটে গেছে। আমার প্রিয় পাঠকরাও বঞ্চিত হয়েছেন ‘কানামাছি’ থেকে। এরমধ্যে আমাদের প্রিয় পত্রিকা ‘দৈনিক খুলনাঞ্চল’ দ্বিতীয় বর্ষ কাটিয়ে তৃতীয় বর্ষে পদাপর্ণে পাঠকের ভালবাসায় সিক্ত হয়েছে। আমরা যারা খুলনাঞ্চল পরিবারের সাথে সম্পৃক্ত, তারা এ ভালবাসায় অবিভূত হয়েছি। এসব আনন্দের মাঝে আমরা দেশের অন্যতম দুই শ্রেষ্ঠ সন্তান গায়ক, গীতিকার বারী সিদ্দিকী ও সাধারণ মানুষের প্রিয় ব্যক্তিত্ব মেয়র আনিসুল হককে হারিয়েছি। এ দুজনের হঠাৎ চলে যাওয়ায় আমাদের এক গভীর শূণ্যতায় ফেলে দিয়েছে। বলা হয়, ‘সময় ও নদীর স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করেনা’। সময়ের পরিক্রমনায় বারী সিদ্দিকী ও আনিসুল হককে হারানোর শোক আমাদের নতুন কোন শক্তি যোগাবে। আবারও সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি পাব। তারপরও এ দু’জনের অভাব পুরণ হবার নয়। আমরা তাদের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি। যেখানেই থাকুন ভাল থাকুন বারী সিদ্দিকী ও মেয়র আনিসুল হক।
তবে আজ এখানে কোন শোক গাঁথা নয়, লিখতে চাই নাগরিক জীবনের কষ্ট গাঁথা, বেদনার কথা। ভুল না হলে গেল ২৩ নভেম্বর আরেক দফা বেড়েছে নাগরিক জীবনের অন্যতম অনুসঙ্গ বিদ্যুতের দাম। চলতি মাস অর্থাৎ এই ডিসেম্বর থেকেই প্রতি ইউনিটে আমাদের এখন আগের দামের চেয়ে ৩৫ পয়সা বেশী গুনতে হবে। বিদ্যুতের এই দাম বৃদ্ধি নিয়ে বেশকিছু দিন ধরেই অনেক লুকোচুরি চলছিল। এ নিয়ে গণশুনানিও হয়েছে। কিন্তু সেই গণশুনানিতে দাম বৃদ্ধি নয়, নাগরিকরা বিদ্যুতের দাম কমার পক্ষেই কথা বলেছেন। শেষ পর্যন্ত আর ওই শুনানির কার্যকরীতা রক্ষা হয়নি, দাম বেড়েছে।
পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) তথ্যমতে জানুয়ারি মাস থেকে গ্রাহকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়তি বিল দিতে হবে। আর এতে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো অতিরিক্ত ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বেশি আয় করতে পারবে। দাম বাড়ানোর েেত্র সবশ্রেণির গ্রাহকের স্বার্থ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর আর্থিক প্রভাব, বিত্তহীন ও নিম্নবিত্তসহ সব গ্রাহকের ওপর আর্থিক চাপ কমানো, সারাদেশে বিদ্যুতের অভিন্ন দাম, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও সর্বোপরি দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ভাবা হয়েছে বলে তাদের দাবি।
এর আগে সবশেষ ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। ২০০৯ থেকে এ পর্যন্ত ৯ বার বিদ্যুতের দাম বাড়লো। বিদ্যুত নিয়ে আমাদের আলোচনা-সমালোচনার শেষ নেই। আলোচনা হয় লোডশেডিং নিয়ে। চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাওয়া-না পাওয়া নিয়ে। বিদ্যুতের উৎপাদন, বিপনন ও বিতরণ, বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে। আমার কথা এসব নিয়ে নয়, আমাদের দেশে এখন মানুষের সামর্থ্য বেড়েছে। এখন অনেকেই বলেন লাখ টাকা আর টাকা নয়। কিন্তু আমার মতো মধ্যবিত্ত পরিবার মানুষের কাছে এখনও লাখ টাকা স্বপ্নের মতো। ছোট পরিবার পরিজনের ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করতে রাত-দিন অকান্ত পরিশ্রম করতে হয়। তারপরও দিন আনি, দিন খাই অবস্থা। এবার বিদ্যুতের দাম ইউনিট প্রতি ৩৫ পয়সা বাড়ায় হয়তো বিদ্যুত বিলে খুববেশী পরিবর্তন হবে না। হয়তো প্রতিমাসে ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে কমপক্ষে ৭৫টাকা বাড়বে। এর সাথে যুক্ত হবে ভ্যাট, সার্ভিসসহ আরও কতকিছু। এতো গেল বিদ্যুৎ বিল। এবার আসি জনজীবনের সাথে। প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধণের পর এখন আর আমাদের বিদ্যুৎবিহীন একটি দিনের কথা চিন্তা করতে পারিনা। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদন থেকে বিপনন, সংরক্ষণ, চিকিৎসা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা কোনকিছু আর বিদ্যুৎ ছাড়া সম্ভব হচ্ছেনা। অনেক সময় চিন্তাও করতে পারিনা।
তাই বিদ্যুতের ৩৫ পয়সা মূল্য বৃদ্ধি কী শুধু ৩৫ পয়সা! আসলে তা নয়, এই বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি নিয়েই অনেক পণ্যেরই দাম বাড়বে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুতের খুচার দাম ৩৫ পয়সা বা ৫ দশমিক ৩০ শতাংশ বাড়ায় সাধারণ গ্রাহকদের বার্ষিক সরাসরি খরচ বাড়বে এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এই অর্থ বিতরণকারী কোম্পানি-সংস্থাগুলোর কোষাগারে যাবে জনগণের পকেট থেকে। বিদ্যুৎনির্ভর পণ্য উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এর বাইরে রয়েছে। খাতওয়ারি দেখা যাবে ৭ থেকে ১৫ শতাংশ ব্যয় বেড়ে যাবে। চালসহ নিত্যপণ্যের চড়া দামের পর বিদ্যুতের বাড়তি দাম তাদের ফেলবে আরো ভোগান্তিতে।
কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলমের অভিমত, বিদ্যমান বাস্তবতায়ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি নয়, কমানো যায়। বিইআরসির শুনানিতে আমরা সেটি হিসেব কষে প্রমাণও করেছি। এরপরও দামবৃদ্ধি শুধু অযৌক্তিকই নয় বরং স্বেচ্ছাচারিতাও।, দাম বৃদ্ধির যুক্তি হিসেবে সরকার এবং বিইআরসি বরাবরের মত বলছে- সবকিছুরই দাম বাড়ে তেমনি বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়েছে। এটি যৌক্তিক নয়। তাহলে গণশুনানি কেন? এখন প্রমাণিত হলো- গণশুনানি অকার্যকর এবং অর্থহীন। এটি লোকদেখানো প্রহসন ছাড়া অন্য কিছু নয়।
তাই বলছিলাম, বিদ্যুতের ইউনিট প্রতি ৩৫ পয়সা বৃদ্ধি শুধু কী ৩৫ পয়সা! বাস্তব অবস্থা কিন্তু তা বলে না। এখন চাল কিনতে গেলে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির দোহাই শুনি। ছেলের বিস্কুট, চকলেট কিনতে গেলেও একই অজুহাত। আসলে অজুহাতের দাপটে আমাদের সকল হাতই অসহায়। আমারা চিৎকার করি কিন্তু শব্দ হয়না। এবার বিদ্যুতের দাম বাড়ার পর দেশের বামদলগুলো আধাবেলা হরতাল ডেকেছিল। আমরা সেদিন সকালেই হরতালের কথা ভুলে ছিলাম। ভুলে ছিলাম ভবিষ্যৎ অর্থ দন্ডের ভয়ও। তাই হরতাল বা প্রতিবাদে সাড়া দেইনি। সরকার বা ক্ষমতাসীনদেরও এ নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই। আমরা সব ভুলে যাই, ভুলে থাকা ভাল। বিদ্যুতের এই দাম বৃদ্ধিও ভুলে যাব। আবার দাম বাড়বে, আমরা অপেক্ষায় থাকবো।

লেখক : নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক কালের কণ্ঠ, খুলনা।