বিএনপির লবিস্ট নিয়োগ ও মির্জা ফখরুলের দেশ রক্ষার আষাঢ়ে গল্প

0
90
জাতির পিতার জন্মদিন আদর্শ বাস্তবায়নই হোক লক্ষ্য

মোঃ নজরুল ইসলাম:
বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি। সংসদে দলটির শক্তিশালী প্রতিনিধিত্ব না থাকলেও দেশের মানুষ বিএনপিকে মাঠের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বিবেচনা করে। দলটির জন্মপ্রক্রিয়া ও প্রথম রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন থাকলেও প্রায় ৪৩ বছরে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় দল হিসেবে রাজনীতির মাঠে টিকে আছে দলটি। দলটির প্রতিষ্ঠাতা বীর মুক্তিযোদ্ধা জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধানের পদে অধিষ্ঠিত থেকে সংবিধান লঙ্ঘনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। সেনাবিধি ভঙ্গ করে সেনাবাহিনীর চাকুরিতে বহাল থেকে তথাকথিত ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের মাধ্যমে গণতন্ত্রের কফিনে পেরেক ঠুঁকে দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা পাকাপোক্ত করেন। সেনাপ্রধানের পদে চাকুরিরত অবস্থায় ‘আর্মি এ্যাক্ট’ লঙ্ঘন করে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন করেন যা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন। রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন থেকে অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়ে বিএনপি নামক দলটির জন্ম। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে আজ অবধি দলটির বিরুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে পৃষ্ঠপোষকতা ও মদদ দেওয়ার সুস্পষ্ট অভিযোগ রয়েছে।

জেনারেল জিয়ার জীবদ্দশায় প্রথম প্রধানমন্ত্রী করা হয়েছিল স্বীকৃত স্বাধীনতাবিরোধী পাকিস্তানের দালাল শাহ আজিজুর রহমানকে। শাহ আজিজ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানের পক্ষে জাতিসংঘে গিয়ে ওকালতি করেছিলেন। ২৫ শে মার্চ ৭১ এ পাকহানাদার বাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞের পক্ষে জাতিসংঘে গিয়ে সাফাই গাওয়া শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী করে জেনারেল জিয়া বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে কলঙ্কিত করেছিলেন। মন্ত্রী করা হয়েছিল পাকিস্তানপন্থী ও স্বাধীনতাবিরোধী জয়পুরহাটের আব্দুল আলীমকে। ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার পর ৭০’র নির্বাচনে বিজয়ী এমএনএ ও এমপিএদের নিয়ে বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠিত হলে বাংলাদেশকে সমর্থন করার অভিযোগে ৭০’র নির্বাচনে বিজয়ী অনেকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে তাদের আসন শূন্য ঘোষণা করে উপনির্বাচন দেওয়া হয়। পাকিস্তান সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন আব্দুল আলীম এবং উপনির্বাচনে প্রার্থী হন। অথচ স্বাধীনতাবিরোধী আব্দুল আলীমকে মন্ত্রী করে বাংলাদেশের সংসদকে কলুষিত করেছিলেন জেনারেল জিয়া। স্বামী জিয়াউর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ৯৬’র ১৫ই ফেব্রæয়ারির ভোটারবিহীন একতরফা নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর খুনিকে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা বানিয়ে জাতীয় সংসদকে কলঙ্কিত করেছিলেন তারই সহধর্মিনী বেগম খালেদা জিয়া। ৭১’র মানবতাবিরোধী অপরাধী নিজামী, মুজাহিদের গাড়িতে ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর রক্তে ভেজা পতাকা তুলে দিয়েছিল বেগম জিয়া।
গঠনতন্ত্র মতে বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলটির অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হল- বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক ইস্পাতকঠিন গণঐক্যের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় অখন্ডতা ও গণতন্ত্র সুরক্ষিত ও সুসংহত করা। এছাড়া ঐক্যবদ্ধ এবং পুনরুজ্জীবিত জাতিকে অর্থনৈতিক স্বয়ম্ভরতার মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ, নয়া-উপনিবেশবাদ, আধিপত্যবাদ ও বহিরাক্রমণ থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করা! অথচ দলটির পক্ষ থেকে সরকার ও দেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করা হয়েছে। স্বয়ং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন সংসদকে জানিয়েছেন এই তথ্য। ৩০০ বিধিতে সংসদে দেওয়া বিবৃতিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান ২০১৪ সালে জামায়াত দেড় লাখ ডলার খরচ করে লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করেছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করার জন্য। যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে প্রভাবিত করার জন্য ‘পিস অ্যান্ড জাস্টিস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে এক লাখ ৩২ হাজার ডলার দিয়ে নিয়োগ করেছিল তারা। মন্ত্রীর সংসদে দেওয়া তথ্য অনুসারে বিএনপি ২০১৫ সালের ফেব্রæয়ারি থেকে ২০১৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ২৭ লাখ ডলার প্রতি বছর, আর প্রতি মাসে রিটেইনার ফি এক লাখ ২০ হাজার ডলার ব্যয় করেছে। একে মোমেন আরও বলেন, বিএনপি ২০১৭ সাল পর্যন্ত চারটি এবং ২০১৯ সালে একটি লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করেছিল দেশবিরোধী অপপ্রচার করার উদ্দেশ্যে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডক্টর খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রথমে দৃঢ়ভাবে বিএনপির লবিস্ট নিয়োগের খবর অস্বীকার করলেও পরবর্তীতে মির্জা ফখরুল লবিস্ট নিয়োগের কথা স্বীকার করেন। শুধু তাই নয়- তিনি দাবি করেন বিএনপি লবিস্ট নিয়োগ করেছে দেশকে রক্ষার জন্য! একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি লবিস্ট নিয়োগ করতেই পারে। কারন যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট নিয়োগ সে দেশের আইনে বৈধ প্রক্রিয়া। তবে বিএনপির লবিস্ট নিয়োগ নিয়ে লুকোচুরি তাদের লবিস্ট নিয়োগের উদ্দেশ্য নিয়ে মানুষের মনে সন্দেহের উদ্রেক ঘটিয়েছে। মির্জা ফখরুলের দাবি আসলে কতটুকু যৌক্তিক?
বিএনপি লবিস্ট নিয়োগ করেছে বাংলাদেশের উপর অবরোধ আরোপের জন্য। বাংলাদেশের র‌্যাব, পুলিশ, সেনাবাহিনীর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার জন্য। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদকে অবৈধ ঘোষণা করার জন্য! এর আগে দলটির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ওয়াশিংটন পোস্ট এ প্রবন্ধ লিখেছিলেন বাংলাদেশের জিএসপি সু্বধিা বাতিলের জন্য। সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা, আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বক্তব্য, বিবৃতি দিতেই পারে দলটি। অতীতে একাধিকবার দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন থাকা জনপ্রিয় একটি রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে সরকার ও আওয়ামীলীগের সমালোচনার নামে একের পর এক এসব দেশবিরোধী পদক্ষেপ কতটুকু প্রত্যাশিত?
লেখক: মোঃ নজরুল ইসলাম, কলামিস্ট ও তরুণ আওয়ামীলীগ নেতা।