বঙ্গবন্ধুর সহচর, মুক্তিসংগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠক শেখ শহীদুল হকের মৃত্যুবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা

0
53

                                                      মোঃ নজরুল ইসলাম,কলামিস্ট ও তরুণ আওয়ামীলীগ নেতা, খুলনা

শেখ শহীদুল হক- খুলনার সহস্র মানুষ যাকে এখনো স্মরণ করে, স্মৃতিচারণ করে তার সংগ্রামী জীবন আর বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি তার নিঃস্বার্থ আনুগত্যের। আওয়ামীলীগ এবং আওয়ামীলীগ অন্তঃপ্রাণ কর্মিদের প্রতি তার অকৃত্তিম দরদের বহিঃপ্রকাশ ঘটে দূর্দিনের অসংখ্য নেতাকর্মীর স্মৃতিচারণে। এমনই দু’একটি স্মৃতিচারণের অবতারণা করছি আমার লেখায়-

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, খুলনার পরিচালক প্রফেসর শেখ হারুনর রশীদ স্যারের সাথে একদিন কথা হচ্ছিল রাজনীতির বিভিন্ন বিষয়ে। বঙ্গবন্ধু, শহীদ শেখ আবু নাসের, শ্রমিকনেতা আব্দুল মান্নান এবং ৭৫ পূর্ব ও পরবর্তী বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে। বিনম্র শ্রদ্ধায় তিনি স্মৃতিচারণ করেন বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠক প্রয়াত শেখ শহীদুল হক সম্পর্কে। ১৯৯৮ সালের কথা। প্রফেসর হারুন  তখন বিএল কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের তরুণ প্রভাষক। শেখ শহীদুল হকের সাথে তার ছিল হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। বললেন, একদিন বিএল কলেজের গণিত বিভাগের তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান রমেশ স্যার শহীদ ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করতে চাইলে আমি ওনাকে নিয়ে শহীদ ভাইয়ের বাসায় গেলাম। বাসায় প্রবেশ করেই অনেক আগন্তুক দেখলাম। বিভিন্ন জন বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে এসেছেন। উনি সবার কথা ধৈর্যসহকারে শুনছেন, পরামর্শ দিচ্ছেন, সকলের সমস্যা সমাধান করে দিচ্ছেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত আন্তরিক। প্রত্যেকের সমস্যাগুলোকে যেন মনে হচ্ছিল ওনার নিজেরই সমস্যা। এক পর্যায়ে আমরা শহীদ সাহেবের সাথে কথা বললাম। কথা শেষে বের হয়ে আসার সময় রমেশ স্যার বললেন- ‘আওয়ামীলীগের অনেকের সাথে আমার চেনাজানা, সম্পর্ক আছে। কিন্তু এতটা আন্তরিকতা কারো মধ্যে দেখিনি। একজন নেতা এতটা পরোপকারী হতে পারেন, অন্যের সমস্যায়, বিপদে এতটা বিচলিত হতে পারেন তা উনাকে না দেখলে বুঝতাম না। উনি এমন একজন পরোপকারী মানুষ যে, মৃত্যুর পর তার লাশটা খাটিয়ায় করে দাফনের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়ার সময়ও কেউ সমস্যা নিয়ে আসলে হয়ত বলে উঠবেন -এই দাঁড়াও, খাটিয়াটা নামাও; ওনার সমস্যার কথা শুনে নেই!”

প্রফেসর হারুনর রশীদ বললেন- শহীদ ভাই ছিলেন একজন মহৎপ্রাণ মানবিক মানুষ। তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরোপকারী এবং সজ্জন মানুষ। তার ব্যবহার ছিল অমায়িক। তিনি মানুষকে সহজেই আপন করে নিতেন। একবার কেউ তার সান্নিধ্যে আসলে তার ভক্ত হয়ে যেতেন। শিক্ষকদের তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। বয়সে অনেক ছোট হলেও তিনি ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করতেন।
শেখ শহীদ সম্পর্কে অধ্যাপক রমেশ এবং অধ্যাপক হারুন এর মূল্যায়নই বলে দেয় উনি কতটা উঁচু মাপের মানুষ ছিলেন।

“শহীদ চাচা আমার দোকানের সামনে গাড়ি থামাতেন। নেমেই কুশলাদি জিজ্ঞাসা করতেন। অতপর আমার চাচাকে ডাকার জন্য বলতেন। চাচাকে শহীদ সাহেবের কথা বলা মাত্রই তিনি চলে আসতেন আমার দোকানে। আসা মাত্রই বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনা করতেন দু’জন। আলোচনার এক পর্যায়ে শহীদ চাচা আমাকে চা খাওয়াতে বলতেন। আমি চা আনতে দোকান থেকে বের হওয়ার পরই লক্ষ্য করতাম শেখ শহীদ সাহেব আমার চাচার হাতের মধ্যে একরকম জোর করেই কিছু টাকা গুঁজে দিতেন। এমন ঘটনা এক দু’দিনের নয়, বরং প্রায়ই ঘটত।” খুলনা অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, ৬০’র দশকের জনপ্রিয় ছাত্রনেতা, খুলনা আওয়ামীলীগের দূর্দিনের কান্ডারী প্রয়াত শেখ শহীদুল হক সম্পর্কে  কথা প্রসঙ্গে একদিন এভাবেই স্মৃতিচারণ করেন খুলনা মহানগরীর ১৬ নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের এক নেতা। তার চাচা ছিলেন বয়রা, মহম্মদ নগর অঞ্চলের আওয়ামীলীগের একজন অন্যতম সংগঠক। ১৯৫৭ সালে বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শহীদ শেখ আবু নাসেরের ১৬ নং ওয়ার্ডের অধীন নূরনগরস্থ বাসভবনে বঙ্গবন্ধুর সাথে প্রথম পরিচয়ের মধ্য দিয়ে যার আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে হাতেখড়ি। বঙ্গবন্ধুর সাথে তাকে পরিচয় করিয়ে দেন ৫০’র দশকে এই অঞ্চলের আওয়ামীলীগের প্রধান সংগঠক শেখ আব্দুল করিম।

বৈকালি বাজারে দাঁড়িয়ে একদিন প্রয়াত আওয়ামীলীগ নেতাদের সম্পর্কে কথা বলছিলাম ৯ নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের এক গুরুত্বপূর্ণ নেতার সাথে। মির্জা খয়বার হোসেন, এ্যাডভোকেট মঞ্জুরুল ইমাম, শেখ আব্দুল করিম, মির্জা আফজাল হোসেন, শেখ হিসাম উদ্দিন আহমদ, শেখ দবিরুল ইসলাম, শেখ আব্দুল গফফার, মোল্লা আবু জাফর জফা সহ অনেকের প্রসঙ্গে কথা বলছিলেন তিনি। আলাপচারিতার ফাঁকে শেখ শহিদুল হকের প্রসঙ্গ আসতেই  বললেন, “আওয়ামীলীগের চরম দুঃসময়ে ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের যে কোন প্রোগ্রাম, ১৫ ই আগস্ট শোক দিবস পালন এবং মিছিল, মিটিং এ সবসময় অর্থ দিয়ে সাহায্য করতেন শেখ শহীদ সাহেব। তার অবদান কোনদিন ভুলতে পারব না। তিনি ছিলেন এই অঞ্চলের আওয়ামীলীগের অন্যতম সংগঠক।”

১৬ নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের প্রথম সারির এক নেতা শেখ শহীদ সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বললেন, “শহীদ সাহেব অনেক বড় মনের মানুষ ছিলেন, একজন ভাল সংগঠক ছিলেন। আওয়ামীলীগের যে কোন কর্মসূচী সফল করতে সার্বিকভাবে সাহায্য করতেন। বাসায় ডেকে নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিতেন।”

আওয়ামীলীগের তৃণমূলের অসংখ্য নেতাকর্মী এভাবেই স্মৃতিচারণ করেন তার সম্পর্কে। চাইলে তিনি আওয়ামীলীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হতে পারতেন। কিন্তু ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়ার রাজনীতি করতেন না। আওয়ামীলীগের বড় কোন পদে আসীন না থাকলেও অন্তরালে থেকেই আওয়ামীলীগকে সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন একজন প্রচারবিমুখ মানুষ। শেখ শহীদ আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল আওয়ামীলীগের দূর্দিনের  নিবেদিতপ্রাণ অসংখ্য নেতাকর্মীকে গোপনে সহায়তা করতেন।

শেখ শহীদুল হকের জন্ম ১৯৪৭ সালে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিধন্য গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার গহরডাঙ্গা গ্রামে। তার পিতার নাম শেখ মতিয়ার রহমান এবং মাতার নাম রাবেয়া খাতুন ময়না। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চাচা খান সাহেব শেখ মোশাররফ হোসেন প্রতিষ্ঠিত তৎকালীন গিমাডাঙ্গা টুঙ্গিপাড়া মাইনর স্কুল (বর্তমান গিমাডাঙ্গা টুঙ্গিপাড়া জিটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়) এ লেখাপড়া করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শিক্ষা জীবনের শুরুতে জিটি স্কুলের ছাত্র ছিলেন। জিটি স্কুলে লেখাপড়া শেষে শেখ শহীদ তৎকালীন কায়েদে আজম মেমোরিয়াল কলেজ (বর্তমান বঙ্গবন্ধু কলেজ) এ ভর্তি হন। ৬০’র দশকের শেষ মধ্যভাগে তিনি উচ্চ শিক্ষার জন্য চলে আসেন খুলনা শহরে। ভর্তি হন সরকারি মজিদ মেমোরিয়াল সিটি কলেজে। সিটি কলেজে লেখাপড়া করার সময় থেকে বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শহীদ শেখ আবু নাসের এর নূরনগরস্থ বাসভবনে থাকতেন শেখ শহীদ। শেখ আবু নাসের এর সাথে তার ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।

৬৯’র গণঅভ্যুত্থানকালীন খুলনার অন্যতম ছাত্রনেতা ছিলেন শেখ শহীদ। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে গোপন সংগঠন  ‘নিউক্লিয়াস’  গঠন করা হয়। ছাত্রলীগের মধ্যে বিপ্লবী চিন্তাধারা পোষণ করা সাহসী ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গোপন সংগঠন নিউক্লিয়াসের সাথে যুক্ত ছিলেন শেখ শহীদ। তৎকালীন সময়ে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছাত্রনেতা ছিলেন। ১৯৬৮-‘৬৯ এর ছাত্রসংসদ নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে খুলনা সিটি কলেজ ছাত্রসংসদের প্রথম ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ৬ দফা প্রচারে খুলনার যেসব ছাত্রনেতৃবৃন্দ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন শেখ শহীদ ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। ৭০’র নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামীলীগের বিপুল বিজয়ের পর পূর্ব নির্ধারিত ৩রা মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ১লা মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খান কর্তৃক স্থগিত করা হলে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের দৃঢ় প্রত্যয়ে পহেলা মার্চ রাতে ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দকে “স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ” গঠনের নির্দেশ দেন। ২রা মার্চ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মোতাবেক ছাত্রলীগ ও ডাকসু নেতৃবৃন্দের উদ্যোগে ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। খুলনাতেও ছাত্রলীগ এবং বিভিন্ন কলেজ ছাত্র সংসদ নেতৃবৃন্দের উদ্যোগে  ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, খুলনা শাখা’  গঠিত হয়। শেখ শহীদকে এর অন্যতম সদস্য নির্বাচিত করা হয়।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে চলতে থাকে প্রতিরোধ সংগ্রামের প্রস্তুতি। লুট করা হয় বন্দুকের দোকান। বন্দুকের দোকান লুটে সরাসরি নেতৃত্ব দেন সিনিয়র ছাত্রনেতারা। তাদের একজন ছিলেন শেখ শহীদ। ২রা মার্চ থেকে ধারাবাহিক আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যে ১২ ই মার্চ স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত জনসভা থেকে ইয়াহিয়া খান এবং ভুট্টোর কুশপুত্তলিকা দাহ করার মাধ্যমে ছাত্রনেতারা তাদের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ করে। ২৩ শে মার্চ পাকিস্তান দিবসের পরিবর্তে “প্রতিরোধ দিবস” হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেন কেন্দ্রীয় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ঐদিন পাকিস্তানের পতাকার পরিবর্তে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বঙ্গবন্ধু সকালে তার নিজ বাসভবন ধানমন্ডি-৩২ এর বাড়িতে স্বাধীন বাংলার পতাকা ওড়ান।খুলনাতেও সেদিন শহীদ হাদীস পার্কে সকাল ৯ টায় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। পতাকা উত্তোলনের এই কর্মসূচীতে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রনেতা শেখ শহীদ। সেদিন খুলনার ঐতিহ্যবাহী বিএল কলেজেও উত্তোলিত হয় স্বাধীন বাংলার পতাকা। পতাকা উত্তোলন করেন তৎকালীন প্রভাবশালী সিনিয়র ছাত্রনেতা মুক্তিযুদ্ধকালীন খুলনা সদর থানা মুজিব বাহিনীর কমান্ডার ইউনুস আলী ইনু এবং ছাত্রনেতা শেখ শহীদুল হক সহ বেশ কয়েকজন ছাত্রনেতা।

অসহযোগ আন্দোলন সংগ্রামের এক পর্যায়ে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে শেখ শহীদ তার নববিবাহিতা অন্তস্বত্ত্বা স্ত্রীকে রেখে দেশমাতৃকার টানে মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিতে চলে যান ভারতে। সেখান থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন। দীর্ঘ প্রায় ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর অসহায় আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসে তিনি স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই তিস্তা বীমা কোম্পানির চাকরিতে যোগদান করেন। কথিত আছে- বঙ্গবন্ধু তাকে বীমা কোম্পানির চাকরি দেন। তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন রাজনৈতিক পরিবারের মেয়ে খুলনা সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রলীগ নেত্রী বেগম রিজিয়া শহীদ এর সাথে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৭১ সালের মে মাসে তাদের প্রথম সন্তান শেখ শাহাদাত হোসেন স্বাধীন এর জন্ম হয়।

বেগম রিজিয়া শহীদ এর বড় ভাইয়ের কন্যা হলেন দক্ষিণাঞ্চলের প্রখ্যাত শ্রমিক নেত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান এমপি। তিনি নবম, দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচিত জনপ্রিয় সাংসদ। বেগম মন্নুজান সুফিয়ান বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের ১৯৮৭ ও ১৯৯২’র সম্মেলনে দলটির কেন্দ্রীয় শ্রম বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৮৭-‘৯৭ পর্যন্ত টানা ১০ বছর তিনি বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের শ্রম সম্পাদকের দায়িত্ব সফলতার সাথে পালন করেন। তিনি ১৯৯৭, ২০০২, ২০০৯, ২০১২ এবং ২০১৬ সালের সম্মেলনে আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। অর্থাৎ তিনি টানা ৭ বার আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটিতে ছিলেন। একাধারে তিনি ৩২ বছর আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা হিসেবে দলকে সংগঠিত করতে ভূমিকা রেখেছেন। এমন নজীর খুব কম নেতারই রয়েছে।

শেখ শহীদুল হক স্বাধীন বাংলাদেশে খুলনা মহানগর শ্রমিকলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নির্বাচিত হন। ৭৫’র ১৫ ই আগস্ট স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকান্ডের পর যখন গণতন্ত্র ভূলুন্ঠিত, আইনের শাসন নির্বাসনে এমনই এক দুঃসময়ে খুলনার শ্রমিকদেরকে সংগঠিত করেন তিনি। শুধু খুলনা নয়, যশোর জেলা আওয়ামীলীগকে সংগঠিত করতে ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই। ২০০৪ সালের আজকের দিনে (২১ শে জানুয়ারি) অসংখ্য ভক্ত আর গুনগ্রাহীকে শোক সাগরে ভাসিয়ে অন্তিম শয়ানে শায়িত হন তিনি। তার জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ শাহাদাত হোসেন স্বাধীন ছিলেন অতি স্বল্প জীবনের অধিকারী। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন জন্ম নেওয়া শেখ  স্বাধীন ২০০৯ সালে এই নশ্বর ধরা থেকে বিদায় নিয়েছেন শারীরিকভাবে। চিরপ্রস্থান করা স্বাধীন এখনো বিচরণ করেন খুলনার হাজারো যুবকের অবচেতন মনে! চায়ের আড্ডায়, রাজনীতির মঞ্চে, রাজপথের মিছিলে কিংবা অলস সময় কাটানো গল্পের আসরে কোথায় নেই তার উপস্থিতি? এখনও হাজারো মানুষ চোখ ছলছল আবেগে তার শূন্যতা উপলব্ধি শুধু নয়, প্রকাশ করে অকপটে তার দৈন্যতায়, প্রয়োজনে আর বিপদে একজন স্বাধীন এর অভিভাবকত্বের ছায়া থেকে বঞ্চিত হয়ে! তার দানশীলতার শত গল্প, উদারতা আর মানবিকতার অযুত স্মৃতিচারণে এখনো দেখি সহস্র জনকে কাতর হতে।

কনিষ্ঠ পুত্র শেখ শাহাজালাল হোসেন সুজন খুলনার মানুষের কাছে এক পরিচিত নাম। অত্যন্ত অমায়িক, ভদ্র ও সজ্জন প্রকৃতির সুজন ২০১০ সাল থেকে দীর্ঘ প্রায় এক যুগ খুলনা মহানগর ছাত্রলীগকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন সুনামের সাথে। বর্তমানে নগর ছাত্রলীগের পাশাপাশি নগর যুবলীগের ও অন্যতম কর্ণধর হিসেবে সফলতার সাথে নেতৃত্ব দিচ্ছেন কর্মিবান্ধব সুজন। কর্মিদের মধ্যে তার রয়েছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা। একজন কর্মিবান্ধব মানবিক ছাত্র ও যুবনেতা হিসেবে ইতিমধ্যেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন অনন্য উচ্চতায়। বাবা এবং ভাই হারিয়ে অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়া সুজনকে অভিভাবকত্বের ছায়া দিয়ে আগলে রেখেছেন দক্ষিনাঞ্চলের আওয়ামী রাজনীতির অভিভাবক  ‘শেখ পরিবার’ এর অন্যতম সদস্য শেখ জালালউদ্দীন রুবেল।

৬০’র দশকের শুরু থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি পদক্ষেপে এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধ ও ৭৫’র ১৫ ই আগস্ট পরবর্তী আওয়ামীলীগের চরম দুঃসময়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা শেখ শহীদকে বর্তমান নেতৃত্ব কতটুকু মনে রেখেছে? তার অবিনাশী সংগ্রামের ইতিহাস ও বর্ণাঢ্য জীবন সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্মকে কি আমরা জানাতে পেরেছি? আজকের নতুন নেতৃত্ব কি জানে তার সম্পর্কে? অথচ আমাদের অহংকারের লাল সবুজের পতাকা আর অস্তিত্ব ও পরিচয়ের স্বাধীন মানচিত্র উপহার দিতে কত সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগ রয়েছে জাতির এই সূর্য সন্তানের! তার এই আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরুপ খুলনায় তার নামে কোনো একটি স্থাপনা নির্মাণ অথবা কোনো একটি সড়কের নামকরণ করা হোক!! খুলনা-২ ও ৩ আসনের মাননীয় সাংসদ এবং খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মাননীয় মেয়র মহোদয়ের কাছে এই দাবি জানাচ্ছি। ১৮ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ শহীদুল হকের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।