বঙ্গবন্ধুর একান্ত সহচর শহীদ এমএ গফুরের মৃত্যুবার্ষিকী পালিত

0
56

শেখ নাদীর শাহ্:


৬ জুন। ১৯৭২ সালের এদিনে আততায়ীর গুলিতে শহীদ হন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত সহচর, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, ভাষা সৈনিক ও সাবেক এমএনএ এমএ গফুর। এদিন একই সাথে তার অপর দু’বীর সহযোদ্ধা শহীদ কামাল হোসেন ও শহীদ রিয়াজ উদ্দীন ঢালী তাকে বাঁচাতে আততায়ীর গুলিতে নির্মমভাবে নিহত হন। দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষে বিভিন্ন মসজিদ ও ধমীয় প্রতিষ্ঠানে দো ও প্রার্থনা সভার আয়োজন করা হয়।

এ উপলক্ষে পাইকগাছায় তার প্রতিকৃতিতে মাল্যদান, আলোচনা সভা, দোয়া অনুষ্ঠান ও এতিমদের মাঝে উন্নত মানের খাবার পরিবেশন করা হয়। সোমবার সকালে শহীদ গফুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মিলনায়তনে শহীদ এমএ গফুর এর প্রতিকৃতিতে মাল্যদান, আলোচনা সভা ও দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি জগদীশ চন্দ্র রায়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন, শহীদ এমএ গফুরের জৈষ্ঠ্য পুত্র ও উপজেলা চেয়ারম্যান আনোয়ার ইকবাল মন্টু। বিশেষ অতিথি ছিলেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার মমতাজ বেগম, উপজেলা শিক্ষা অফিসার বিদ্যুৎ রঞ্জন সাহা, ইউআরসি ইন্সট্রক্টর ঈমান উদ্দীন, সহকারী শিক্ষা অফিসার ফারুক হোসেন, কাউন্সিলর এসএম তৈয়েবুর রহমান, কবিতা দাশ, প্রধান শিক্ষক নারায়ণ চন্দ্র শিকারী, সেলিনা পারভীন, সহকারী অধ্যাপক ময়নুল ইসলাম।

বক্তব্য রাখেন, প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি মোঃ আব্দুল আজিজ, সাংবাদিক প্রকাশ ঘোষ বিধান, শিক্ষক শিল্পী পারভীন, সুরাইয়া ইয়াসমিন, পাপিয়া সুলতানা, শিবপদ সরকার, প্রিয়ংকা মিস্ত্রী ও ইউপি সদস্য শেখ হারুনুর রশীদ হিরু।

দোয়া অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন, মাওলানক রইসুল ইসলাম। পরে রাড়ূলী আলহেরা এতিমখানা ও মাদ্রাসার এতিমদের মাঝে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন এবং লোনাপানি কেন্দ্র জামে মসজিদে দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।

মহান ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং নেতৃত্বদানকারী এমএ গফুর বাংলা ১৩৩২ বঙ্গাব্দে ২৬ বৈশাখ খুলনার (বর্তমান হড্ডা) কয়রা উপজেলার হরিনগর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতার নাম মৃত জনাব আলী সানা এবং মাতা সোনাবান বিবি। কর্মময় জীবনে তিনি যেমন ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছের মানুষ, তেমনি সাধারণ মানুষের কাছেও ছিলেন আলোকিত ব্যক্তিত্ব।

শহীদ এম এ গফুর ৪ ভাই ও দু’বোনের মধ্যে ছিলেন পঞ্চম। তিনি কপিলমুনি স্কুল থেকে প্রাইমারী শেষ করে পাশ্ববর্তী আশাশুনির বুধহাটা হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে ভর্তি হন খুলনার ঐতিহ্যবাহি বিএল কলেজে। ছাত্র জীবনে তিনি ছাত্র ইউনিয়ন (ন্যাপ) রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। এইচএসসি পাশ করার পর বিএ পড়াকালীন শুরু হয় ৫২’র ভাষা আন্দোলন। ২১ ফেব্রুয়ারী ঢাকার রাজপথে রক্তঝরার খবরটি পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারী খুলনায় পৌছানো মাত্রই রাজপথে নেমে আসে খুলনার ছাত্রসমাজ। এদিন সমীর আহম্মেদের নেতৃত্বে নগরীর আহসান আহম্মেদ রোডের এ কে শামসুদ্দিন আহমেদ শুনুর আজাদ গ্রহন্থাগারে প্রথম বৈঠক করেন, খুলনার ছাত্রসমাজ। বৈঠকে এমএ গফুরসহ উপস্থিত ছিলেন, আবু মোহাম্মদ ফেরদৌস, এমএ বারী, নূরুল ইসলাম দাদু, এসএম জলিল, জাহিদুল হক ও তোফাজ্জেল হোসেনসহ অন্যান্যরা। বৈঠকে কঠোর আন্দোলনের সিদ্ধান্তে ঐক্যিমত হন সকলেই। পরবর্তী আন্দোলনে নেতৃত্বদেন এমএ গফুর। তখনকার মুসলিমলীগের গুন্ডা ও পুলিশের বাঁধা উপেক্ষা করে গফুরসহ তার সহকর্মীরা পায়ে হেঁটে নগরির স্কুল, কলেজগুলোতে গিয়ে শিক্ষার্থীদেরকে ভাষা আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেন। তখন আন্দোলনকারীদের অনেকেই পুলিশের হয়রাণীর শিকার ও মিথ্যা মামলায় জেলও খাটেন।

এম এ গফুর বিএল কলেজ থেকে বিএ পাশ করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামীলীগে যোগদান করার মাধ্যমে ১৯৬৯ সালে ঝাঁপিয়ে পড়েন গণ অভ্যূত্থান আন্দোলনে। এক পর্যায়ে আস্থা এবং বিশ্বাস অর্জনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর কাছের মানুষ হয়ে ওঠেন তিনি।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি পাইকগাছা-কয়রা ও আশাশুনি এলাকা থেকে এমএনএ নির্বাচিত হন। এরপর তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধকালীন তিনি ৯নং সেক্টরে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ ৯ মাসের স্বসস্ত্র সংগ্রামে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে আসার পর এমএ গফুরের অনুরোধে ২২ ফেব্রুয়ারী ভেঁড়ি বাঁধ নির্মানে ২২ ফেব্রুয়ারী পাইকগাছা উপজেলার আলমতলা এলাকায় সফরে আসেন। ভেঁড়িবাঁধ নির্মানসহ বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন ও সহজ সরল জীবন যাপনের জন্য এমএ গফুর সাধারণ মানুষের কাছে হয়ে ওঠেন একজন আলোকিত ও আস্থার মানুষ হিসেবে। মূলত তার জনপ্রিয়তায় একটি মহল ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে ১৯৭২ সালের ৬ জুন আততায়ীর গুলিতে নিহত হন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও ভাষা সৈনিক এমএ গফুর। ১৯৯০ সালে মৃত্যুবরন করেন সহধর্মীনি লায়লা বেগম। বরেন্য এ ব্যক্তির নামে জন্মস্থান হরিনগর ও পাইকগাছা সরলএ লাকায় দু’টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উপজেলা সদরে একটি মিলনায়তন ও সরল এলাকার প্রাইমারী স্কুলের সাথেই একটি স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তোলা হলেও প্রতিষ্ঠানগুলো পড়ে রয়েছে অবহেলায়। বর্তমানে শহীদ এম এ গফুরের ৭ ছেলে মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে হোসনেয়ারা আমেরিকায়, পুত্র আনোয়ার ইকবাল মন্টু এবং আনোয়ার জাহিদ, পাইকগাছার সরল গ্রামে বর্তমানে পাইকগাছা উপজেলা চেয়ারম্যান কন্যা নিশাত বানু ও তামারা বানু খুলনায় বসবাস করছেন। ৫২’র ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্ব দরবারে স্থান করে নিলেও এ আন্দোলনে যাদের অবদান ছিল তাদের অনেকেরই স্থান হয়নি ইতিহাসের পাতায়। যাদের অন্যতম শহীদ এমএ গফুর।

ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য এম এ গফুরকে এলাকাবাসী স্মরণ করলেও আজও বিশেষ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি। যদিও সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার জুলিয়া সুকায়না পাইকগাছায় যোগদান করার পর তিনি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহীদ এমএ গফুরকে দু’বার স্বাধীনতা ও ভাষা সৈনিকের মরোনত্তর সম্মাননা প্রদান করেন।

এ ব্যাপারে শহীদ এমএ গফুরের জৈষ্ঠ্য পুত্র আনোয়ার ইকবাল মন্টু জানান, ভাষা আন্দোলনে খুলনার অবদানের বিষয়টি ইতিহাসে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। ফলে ইতিহাসের পাতায় অনেকের ঠাঁই হয়নি। ওই সময় যারা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কিংবা সক্রিয় অংশগ্রহন করেছিলেন তাদেরকে ভাষা সৈনিকের স্বীকৃতি দিয়ে ভাষা আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ করা উচিত এবং একইসাথে আমার পিতা হিসেবে নয়, শহীদ এমএ গফুর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত আস্থাভাজন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হওয়ায় বিষয়টির যথাযথ মূল্যায়ন হবে এমনটাই প্রত্যাশা।