ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর প্রয়াণ

0
445

একাত্তরের পর সামাজিক নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বে অসম সাহসিকতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে সামনের দিকে এগিয়ে গেছেন। তিনি আমাদের অফুরন্ত প্রেরণার উৎস। মহান এই মুক্তিযোদ্ধা এক সময় ভাস্কর্যের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির কথা তুলে ধরেছেন। তার আদর্শ ধারণ করে আমরা যদি সামনে এগিয়ে যেতে পারি, তবেই তার প্রতি আমাদের সম্মান জানানো হবে।

চলে গেলেন মুক্তিযোদ্ধা ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত মঙ্গলবার দুপুরে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের এই কিংবদন্তি সংগ্রামী ব্যক্তিত্বের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।

জানা গেছে, ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি তাকে ল্যাব এইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এর আগে গত নভেম্বরে নিজের বাসায় বাথরুমে পড়ে গোড়ালিতে চোট পান ৭১ বছর বয়সী এ মুক্তিযোদ্ধা-ভাস্কর। তখনো তাকে ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়-বিএসএমএমইউতে ভর্তি করা হয়। সেখানে গত ১১ ডিসেম্বর এক অস্ত্রোপচারের পর তার একটি হার্ট অ্যাটাক হয়, পরে দেখা দেয় ইউরিন ইনফেকশন। এরপর ভাস্কর প্রিয়ভাষিণীকে বিএসএমএমইউর সিসিইউ থেকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র-আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। পরে ২০ ডিসেম্বর চিকিৎসা শেষে অনেকটা সুস্থ হয়ে তিনি বাসায় ফিরেন। ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী ১৯৪৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি খুলনায় জন্মগ্রহণ করেন। তার নানা যুক্তফ্রন্টের শাসনকালের স্পিকার এডভোকেট আব্দুল হাকিমের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসেন তিনি। টিকাটুলির নারী শিক্ষা মন্দিরে (বর্তমানে শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়) তার শিক্ষাজীবন শুরু। পরবর্তী সময়ে তিনি খুলনার পাইওনিয়ার গার্লস স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও খুলনা গার্লস স্কুল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রি পাস করেন। ১৯৬৩ সালে প্রথম বিয়ে করেন প্রিয়ভাষিণী। ১৯৭১ সালে তার প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে। তখন স্বাধীনতা যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে তিনি সন্তানদের নিয়ে নতুন জীবন শুরু করেন। সেই অস্থির সময়ে তার ভাঙা সংসারের জীবনে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। পাক হানাদার বাহিনীর হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। এরপর তাকে পার করতে হয়েছে দুঃসহ জীবন। সংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের অসহযোগিতার মুখেও খুঁজে নিয়েছেন বাঁচার সাহস। ১৯৭২ সালে তার দ্বিতীয় বিয়ে হয়। প্রিয়ভাষিণী ৬ সন্তানের জননী। পেশাগত জীবনে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় তিনি চাকরি করেছেন। নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও শিল্পকর্ম সৃষ্টিতে। শিল্পকর্ম গড়তে গিয়ে অসংখ্যবার তিনি কঠিন কাঠামোকেও কোমলতার আদলে রূপান্তর করেছেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদানের জন্য ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকারের ‘মুক্তিযোদ্ধা’ সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। এর আগে ২০১০ সালে তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পদক’ পান। একাত্তরের পর সামাজিক নানা প্রতিকূলতা স অসম সাহসিকতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে সামনের দিকে এগিয়ে গেছেন। তিনি আমাদের অফুরন্ত প্রেরণার উৎস। মহান এই মুক্তিযোদ্ধা এক সময় ভাস্কর্যের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির কথা তুলে ধরেছেন। তার আদর্শ ধারণ করে আমরা যদি সামনে এগিয়ে যেতে পারি, তবেই তার প্রতি আমাদের সম্মান জানানো হবে।