প্রেশক্রিপশন ছাড়াই মিলছে ওষুধ : এন্ট্রিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার, ওটিসি ব্যতিত প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা

0
810

নিজস্ব প্রতিবেদক:
খুলনায় ফার্মেসীগুলোতে প্রেশক্রিপশন ছাড়াই মিলছে এন্ট্রিবায়োটিক ওষুধ। ডাক্তারি পরামর্শ ছাড়া এক রোগের ওষুধ খেতে গিয়ে অন্য আরেকটি রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এমন অবাধ ওষুধ বিক্রি অব্যাহত থাকলে খুব শীঘ্রই দেশের জনস্বাস্থ্য চরম হুমকির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন ওষুধ ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে প্রশক্রিপশন ছাড়া ওভার দ্য কাউন্টার ওষুধ (ওটিসি) ব্যতীত অন্যান্য প্রেশক্রিপশন ছাড়া বিক্রি না করার প্রসঙ্গে ২০১৯ সালের ১৬ মে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর এক প্রেজ্ঞাপন জারি করেছেন। ওই সব উল্লেখ করা হয়। এতে আরো বলা হয় ‘একই সঙ্গে এন্টিবায়োটিক এর ফুল কোর্স যাতে সেবন করে সে বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করার জন্য এবং ফুল কোর্স এন্টিবায়োটিক সরবরাহ করা হয়। এই নির্দেশ প্রতিপালনে ব্যর্থ হলে পরবর্তীতে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
গতকাল মঙ্গলবার নগরীর কয়েকটি ফার্মেসী দোকানে গিয়ে দেখা গেছে, প্রেসক্রিপশন ছাড়াই এন্ট্রিবায়োটিক ওষুধ বিক্রির দৃশ্য। সর্দি-কাশি জ্বরে আক্রান্ত নগরীর বাগমারার ফাতেমা বেগম (২৮)। প্রেসক্রিপশন ছাড়াই তিনি ময়লাপোতা থেকে ফার্মেসী থেকে ওষুধ কিনতে গেলেন। ফার্মেসীর ওষুধ বিক্রেতা দেরি করেননি, ফাতেমার হাতে তিনিও তুলে দিলেন এন্টিবেয়োটিক ওষুধ। শুধু তাই নয়, আরও প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ওষুধ ও কিছু ডাক্তারি পরামর্শ। এভাবে নগরীর বিভিন্ন ফার্মেসীগুলোতে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রি করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সতর্কবার্তাতেও কাজ হয়নি। কিন্তু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিংয়ার শিকার হচ্ছে অনেক রোগী। নগরীর বিভিন্ন স্থানে আনাছে-কানাছে গড়ে উঠেছে ওষুধের দোকান (ফার্মেসী)। ওই সব দোকানে ওষুধ বিক্রির কাজে জড়িত শতকরা ৯০ ভাগেরই ওষুধ সম্পর্কে ভাল ধারণা নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সম্পর্কে জানতে পারে না রোগীরা। ডাক্তারি প্রেসক্রিপশন চাওয়ার প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করেন না ওষুধ বিক্রেতারা। দোকানে সামনে দাড়িয়ে ওষুধের নাম উল্লেখ করলেই তা ক্রেতার হাতে তুলে দেয়া হয়। আবার অনেক দিনের মেয়াদোত্তীর্ণ পুরনো প্রেসক্রিপশন নিয়ে অনেক রোগী ফার্মেসীতে যায়। প্রেসক্রিপশনের তারিখ ও ওষুধ খাওয়ার সময়সীমা দেখার প্রয়োজনবোধও করেন না বিক্রেতারা।
সুমাইয়া বেগম (৩২)। তার শিশু পুত্রের জন্য জ্বরের জন্য এন্টিবায়োটিক সেফ-থ্রি চাইলে ফার্মেসী বিক্রেতা তাকে দিয়ে দিলেন। কোন ধরনের প্রেসক্রিপশন ছাড়াই শিশুদের এন্টিবায়োটিক ওষুধটি বিক্রি করলেন।
খুলনা ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ আব্দুর রশীদ এ প্রতিবেদককে বলেন, ওষুধ কোন খাদ্যদ্রব্য নয়, নিয়মমাফিক ব্যবহার না করলে যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাড়ায়। তিনি বলেন, ওটিসি ব্যতীত অন্যান্য প্রেসক্রিপশন ছাড়াই বিক্রি না করার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। কেই এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে ড্রাগ অ্যাক্ট এর ১৯৪০ ধারায় অপরাধ এ গণ্য হবে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে মোটা অংকের জরিমানা বিধানও রয়েছে। তবে নতুন আইনে সর্বনিম্ন ৪০ হাজার টাকা জরিমানা বিধান রেখে নুতন আইন পাশ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সূত্র মতে, ওটিসি ওষুধ মানে ওভার দ্য কাউন্টার ওষুধ, যেগুলো আমরা কোন প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ওষুধ দোকন বা ফার্মেসী থেকে কিনে থাকি। সাধারণভাবে বলতে গেলে এই ধরনের ওষুধ কিনতে গেলে রেজিস্ট্রার্ড চিকিৎসকের কোন প্রেসক্রিপশন লাগে না। সচারাচর স্থায়ীয় যে কোন দোকানে পাওয়া যেতে পারে। ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ৩৯টি ওষুধ বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর। অন্য ওষুধের অনুমোদন না দিলেও খুলনা নগরীর বিভিন্ন ফার্মেসিতে বিক্রি হচ্ছে অ্যান্টেবায়োটিকসহ সব ধরনের ওষুধ।
জাতীয় ওষুধ নীতি ২০১৬-এর ধারা ৩ (১৫)- তে ব্যবস্থাপত্র ছাড়া বিক্রিযোগ্য ওষুধের তালিকা প্রণয়নের বিষয়ে বলা হয়েছেÍ ‘উন্নত দেশগুলোর আদলে সাধারণভাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে’ এই তালিকা প্রণয়ন করা হবে। ধারা ৪ (১৮) -এ ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) বা ব্যবস্থাপত্র ছাড়া বিক্রিযোগ্য ওষুধ সম্পর্কে বলা হয়েছে নিবন্ধিত অ্যালোপেথিক, আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি চিকিৎসা পদ্ধতির ওষুধের মধ্য থেকে সাধারণভাবে ব্যবহৃত এবং কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ওষুধ তালিকাভুক্ত করা হলো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী, ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর সময় সময় এ তালিকা হালনাগাদ করবে বলে ওই নীতিমালায় বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, এই নীতিমালা অনুযায়ী ৩৯টি অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই দিতে পারেন ফার্মেসির বিক্রেতা। এগুলোর মধ্যে রয়েছেÍ কৃমির ট্যাবলেট (এলবেনডাজল চিউয়্যাবল ট্যাবলেট), গ্যাস্ট্রিকের ট্যাবলেট বা সিরাপ বা সাসপেনশন (এন্টাসিড চিউয়্যাবল ট্যাবলেট বা সাসপেনশন), ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট, বেনজিল বেনজোয়েট লোশন, চর্মরোগসহ বিভিন্ন ধরনের লোশন, চোখ ও কানের ড্রপ, ব্যথার জন্য জেল, কনডম ও জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল, গ্লিসারিন সাপোজিটরি, মেট্রোনিডাজল ট্যাবলেট (এন্টিবায়োটিক) বা সাসপেনশন, গ্যাস্ট্রিকের সিরাপ (মিল্ক অব ম্যাগনেশিয়া), মাউথ ওয়াশ, মাল্টিভিটামিন ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল বা ড্রপ, ওমিপ্রাজল ক্যাপসুল, ওরস্যালাইন, প্যারাসিটামল ট্যাবলেট/সিরাপ/সাসপেনশন/ সাপোজিটরি, পারমেথ্রিন ক্রিম, রেনিটিডিন ট্যাবলেট, পোভিডন আয়োডিন, ভিটামিন এ ক্যাপসুল, ভিটামিন বি কমপ্লেক্স (একক বা যৌথ) ট্যাবলেট/সিরাপ/ড্রপ, জাইলোমেটাজোলিন জিরো পয়েন্ট ওয়ান নাসাল ড্রপ)।