প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ ও ড্রপ আউট রোধকল্পে “মিড ডে মিল” এর গুরুত্ব

0
228

একটি জাতির উন্নয়নের কারিগর দক্ষ মানবসম্পদ। আর মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষা মূখ্য নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে। শিক্ষার সকল স্তরেই কার্যকরী পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিকল্পিত উন্নয়নসাধন সার্বিক শিক্ষার অগ্রগতির জন্য অত্যাবশ্যক। তবে এক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ সময়ের দাবি; কেননা প্রাথমিক পর্যায়েই শিশুর মানসিক, মানবিক, স্বাস্থ্যগত ও চারিত্রিক বিকাশের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। তাই একদিকে যেমন শিশুদের জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে; একই সাথে শিক্ষার যথাযথ পরিবেশ নিশ্চিতকল্পে শিশুদের শারিরীক, মানসিক ও স্বাস্থ্যগত বিকাশের দিকেও বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করতে হবে। আর এজন্যই “জাতীয় স্কুল মিল নীতি ২০১৯” এর আওতায় প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে “মিড ডে মিল” চালুকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদে এর যথাযথ ব্যবস্থাপনা অব্যাহত রাখতে হবে।
“মিড ডে মিল” চালুকরণের প্রেক্ষাপটঃ
বিশ্বব্যাপী টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতকল্পে বিশ্বের প্রায় সকল দেশের চুক্তির ভিত্তিতে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ঠ-২০৩০ (Sustainable Development Goals) এর অভীষ্ঠ-০৪ (Goal-04) এর আওতায় মানসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং একই সাথে অভীষ্ঠ-০৩ (Goal-03) এর আওতায় সব বয়সের জনগণের জন্য সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণকল্পে “মিড ডে মিল” উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। কেননা শিশুদের জন্য দুপুরবেলা মানসম্মত ও পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাবার সরবরাহ করা হলে সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র শিশুদের স্কুলে উপস্থিতির আগ্রহ ও হার যুগপৎ বেড়ে যাবে; একই সাথে দীর্ঘমেয়াদে শিশুদের ড্রপ আউট উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। পাশাপাশি এ কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুদের পুষ্টিস্তর বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় শক্তি চাহিদার যোগান দেয়াও সম্ভব হবে।
১৯৯৫ সালে প্রতিবেশি দেশ ভারতে “মিড ডে মিল” চালু হলেও বাংলাদেশে দীর্ঘদিন বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে এ ব্যাপারে ফলপ্রসূ পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। অবশেষে বর্তমান সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে এ কর্মসূচির ওপর ব্যাপক গুরুত্বারোপ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী ২০১৫ সালে সকল প্রাইমারি স্কুলকে এ প্রকল্পের আওতায় আনার এবং বিত্তশালীদের এ প্রকল্পের সহযোগিতায় এগিয়ে আসার আহবান জানান। গবেষণায় দেখা যায়, “মিড ডে মিল” কর্মসূচির মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ড্রপ আউট উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১ কোটি ৭৩ লক্ষ ৩৮ হাজার ১ শত শিশুর মধ্যে ঝরে পড়া শিশুর হার ১৮.৬% (উৎসঃ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়)। এই ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা হ্রাসকরণে সরকার শুরুতে ১০৭ উপজেলায় “মিড ডে মিল” পাইলটিং কার্যক্রম হিসেবে গ্রহণ করে এবং অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে। বরগুনার বামনা উপজেলা এ কার্যক্রমের ফলে ঝরে পড়া শিক্ষর্থীর হার ১.০২% তে নেমে আসে, যেখানে অন্যান্য উপজেলাতে এ হার ৭.৮%। এই ঝরে পড়া হ্রাসের পাশাপাশি পুষ্টি চাহিদা পূরণেও এ কর্মসূচির ভূমিকা অনস্বীকার্য। “মিড ডে মিল” ৩-১২ বছরের ছাত্রছাত্রীদের জন্য ৩০% ক্যালোরি এবং ৫০% পুষ্টি চাহিদা পূরণ করতে পারে। (উৎসঃ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এর প্রতিবেদন)।
এ সকল গবেষণার প্রেক্ষিতেই মন্ত্রিসভায় ২০২৩ সালের মধ্যে সকল প্রাইমারি স্কুলে এ ব্যবস্থা চালুকরণের লক্ষ্যে “জাতীয় স্কুল মিল নীতি ২০১৯” এ অনুমোদিত হয়েছে। যেহেতু আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ; তাই মেধাবী, দক্ষ ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিনির্মাণে “মিড ডে মিল” এর সুপরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদী বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।
শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ ও ড্রপ আউট রোধে “মিড ডে মিল” এর গুরুত্ব:
*প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা হ্রাস, দুপুরের পর শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের অমনোযোগিতা ও অসুস্থতার অজুহাত হ্রাসকরণের লক্ষ্যে “মিড ডে মিল” চালুর বিকল্প নেই।
*দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার ফলে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশসহ মেধার বিকাশে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ, যোগ্য ও মেধাবী মানবসম্পদ গড়ে উঠতে পারে না।
*শহরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে সুবিধাবঞ্চিত ও বাস্তুহারা শিশুরা পড়াশুনা করে সেগুলোতে “মিড ডে মিল” কর্মসূচির আওতায় পুষ্টিসম্পন্ন উন্নত খাবার পরিবেশন করা গেলে বিদ্যালয়গুলোতে উপস্থিতির হার বৃদ্ধি ও ড্রপ আউট হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে পারে।
*গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন দরিদ্র পরিবারের শিশুরা যাদের পেটের দায়ে কর্মে নিয়োজিত হওয়ার প্রবণতা বেশি, তাদেরকে উক্ত কর্মসূচির আওতায় পড়াশুনার প্রতি মনোযোগী এবং ড্রপ আউট হার হ্রাস পেতে পারে।
*খুলনার মতো উপকূলীয় জেলার দূরবর্তী উপজেলাগুলোতে শতভাগ স্কুলে “মিড ডে মিল” সরবরাহ করা গেলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্কুলে আসার প্রবণতা ও ঝড়ে পড়ার হার স্বভাবতই কমে যাবে। একই সাথে তাদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ ও সম্ভব হবে।
*প্রাথমিক শিক্ষার টেকসই মানোন্নয়নে শিশুদের পড়াশুনার প্রতি আগ্রহী করণের বিকল্প নেই। কেননা, রান্না করা পুষ্টি সম্মত গরম খাবার পরিবেশন করা গেলে শিশুদের স্কুলে আসার আগ্রহ বৃদ্ধি পবে এবং স্বাস্থ্যগত উন্নতিও সম্ভব হবে। সেক্ষেত্রে নি:সন্দেহে তাদের স্কুলমুখী হওয়ার প্রবণতা বাড়বে, ফলশ্রুতিতে ড্রপআউট হার হ্রাস পাবে।
“মিড ডে মিল” কর্মসূচির টেকসই বাস্তবায়নে প্রায়োগিক সুপারিশসমূহ:
*“জাতীয় স্কুল মিল নীতি ২০১৯” এ বিদ্যালয়গুলোতে মানসম্মত খাবার সরবরাহের বিস্তারিত নীতিমালা উল্লেখিত হয়েছে। এরই আওতায় “মিড ডে মিল” কর্মসুচির যথাযথ বাস্তবায়নে সকল অংশীজনের (Stakeholders) কার্যকরী ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসারে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার এ কর্মসূচির অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত মাসিক মনিটরিং ও সে সম্পর্কিত প্রতিবেদন উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে প্রেরণ করতে পারেন।
*শিশুদেরকে মিড ডে মিল হিসেবে মানসম্মত ও পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে কিনা এবং উপরোল্লিখিত নীতিমালার নির্দেশনা অনুসারে রান্না করা গরম খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে কিনা সে সম্পর্কে বিশেষ খাদ্য পরিদর্শক নিয়োগ করা যেতে পারে।
*“মিড ডে মিল” কর্মসূচিতে বিভিন্ন NGO এবং Development Partner দের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে এবং জাপান ও রাশিয়ায় সরবরাহকৃত উন্নত “মিড ডে মিল” এর আদলে আমাদের দেশেও সরবরাহকৃত খাদ্যের মান বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহন করা যেতে পারে।
*স্থানীয় জনপ্রতিনিধিগণ বিভিন্ন বিত্তশালী ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে এ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। এতে এ কর্মসূচির মান এবং দীর্ঘমেয়াদে এর কার্যকারিতা টেকসই হবে বলে ধারণা করা যায়।
বাংলাদেশ উন্নয়নের ক্ষেত্রে বর্তমান বিশ্বে রোল মডেল। এ উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রেখে ২০৪১ সালের মধ্যে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে আমাদের বর্তমান নবীন প্রজন্মকে যথাযথ পরিচর্যার মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতকল্পে উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে শিশুদেরকে বিশ্বনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আর এক্ষেত্রে শিশুদেরকে মানসম্মত শিক্ষা এবং উপযুক্ত শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সুযোগ দিতে হবে। “মিড ডে মিল” কর্মসূচি এ দুই অভিলক্ষ্যের যুগপৎ বাস্তবায়নে এক কার্যকর উদ্যোগ; যা কিনা প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ড্রপ আউট হ্রাস এবং শিশুদের বিদ্যালয়ে নিয়িমিত উপস্থিতি নিশ্চিতকরণে কার্যকর অবদান রাখতে পারে। তাই সকল অংশীজনের যথাযথ পদক্ষেপের মাধ্যমে “মিড ডে মিল” কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদী বাস্তবায়ন বর্তমান সময়ের অন্যতম চাহিদা। আর এ ধরনের কার্যকরী কর্মসূচির যথাযথ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই বিনির্মিত হবে আগামীদিনের স্বপ্নের “সোনার বাংলা”।