পুষ্টিহীনতায় প্রতি মাসে নিউমোনিয়ায় ১শ’ শিশু আক্রান্ত হচ্ছে

0
441

 

# শিশু হাসপাতালে নিউমোনিয়া আক্রান্ত মৃত্যর সংখ্যা ২৩
কামরুল হোসেন মনি:
নিউমোনিয়া ঠান্ডাজনিত রোগ। শীতকালে সাধারণত নিউমোনিয়ার প্রাদুর্ভাব বাড়ে। এছাড়া অন্যান্য জীবাণুও এ সময় বৃদ্ধি পায়। শিশুর পুষ্টিহীনতা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। নগরীর শিশু হাসপাতাল ও খুমেক হাসপাতাল মিলে ২০১৭ সালের ৯ নভেম্বর পর্যন্ত শিশুরা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ২১৪ জন চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়েছে। এছাড়া এ পর্যন্ত শিশু হাসপাতালে নিউমোনিয়ায় মারা গেছে ২৩ শিশু। এই হিসেবে প্রতি মাসে গড়ে ১শ’ ওপরে নিউমোনিয়া আক্রান্ত হচ্ছেন শিশুরা।
শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, নিউমোনিয়া রোধ করতে হলে শিশুর অপুষ্টি রোধ করা। এছাড়া প্রতিটি শিশুকে জন্মের প্রথম ঘন্টায় মায়ের সাল দুধ খেতে দিতে হবে। ৬ মাস বয়স পর্যন্ত কেবল মায়ের দুধ খাওয়াতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় নিউমোনিয়াসহ ঠান্ডাজনিত অনেক রোগ থেকে শিশুকে রক্ষা করা সম্ভব।
বৃহস্পতিবার (৯ নভেম্বর) খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ড ও নগরীর শিশু হাসপাতালের সূত্র মতে, চলতি বছরের ৯ নভেম্বর পর্যন্ত এই দুই হাসপাতালে ১ হাজার ২১৪ শিশুরা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা সেবা নিয়েছেন। এর মধ্যে শুধুমাত্র শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় ২৩ জনের মতো। ২৮ দিনের থেকে শুরু করে ২-৩ বছর শিশুরাই আক্রান্ত সংখ্যা বেশি।
শিশু ওয়ার্ডে প্রত্যেক জানালার কাচ ভাঙ্গার বিষয় হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ এটি এম মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, বিষয়টি খুবই গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে উল্লেখ করে বলেন, এই সব কাজ আমাদের নিয়ন্ত্রনে না থাকায় একটু বিলম্ব হচ্ছে। বিষয়টি পিডাব্লিউ এর কাছে মেরামতের জন্য চিঠিও দেয়া হয়। ২-১ দিনের মধ্যে তারা মেরামত করবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু বিভাগের সহকারি রেজিস্ট্রার শিশু বিশেষজ্ঞ ডাঃ মনোজ কুমার মালাকার শুক্রবার রাতে এ প্রতিবেদককে বলেন, বর্তমানে ৮-১০ দিনে নিউমোনিয়া শিশু রোগীর চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে বিশেষ করে সর্দি-কাশির পাশাপাশি নিউমোনিয়া ও ব্রোনকিউলাইটিস আক্রান্ত হচ্ছেন। ২-৫ বছরের শিশুদের আক্রান্ত সংখ্যা বেশি পাওয়া যাচ্ছে। ৬ মাসের নিচের শিশুদের বাজারের সরবরাহকৃত গুড়ো দুধ না খাওয়ার পরমার্শ দিয়ে বলেন, এতে ক্ষতিকারক উপদান রয়েছে যা শিশুদের জন্য বিপদজনক। সেক্ষেত্রে মায়ের বুকের দুধের বিকল্প নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এ ব্যাপারে হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে সহকারি রেজিস্ট্রার ডাঃ শৈলান্দ্রনাথ বিশ্বাস বলেন, শিশুরা জন্মের পর থেকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর পরামর্শ দেন। এতে মায়ের বুকের দুধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি রয়েছে। এছাড়া বর্তমানে নিউমোনিয়া টিকা কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে, শিশু জন্মের পরেই অভিভাবকদের তার বাচ্চাকে নিয়ম অনুসারে প্রত্যেকটি টিকা দিতে যেন ভুল না করেন। এছাড়া বাচ্চাকে স্যাত স্যাতে পরিবেশ থেকে মুক্ত রাখার পরামর্শ দেন।
শিশু হাসপাতালের সূত্র মতে, গত জানুয়ারি থেকে নভেম্বর ৮ তারিখ পর্যন্ত ১ হাজার ৬৬ শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। এ সময়ের মধ্যে ২৩ শিশু মারা যায়। এর মধ্যে জানুয়ারিতে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ৭৯ শিশুর মধ্যে ১ জন মারায় যায়, একই ভাবে ফেব্রুয়ারিতে ১১৫ শিশু, মারা যায় ৩ জন, মার্চে ১২৯ শিশুর মধ্যে মারা যায় ১ জন, এপ্রিলে ৭৮ শিশুর মধ্যে মারা যায় ৩ জন, মে’তে ৮৬ শিশুর মধ্যে মারা যায় ১ জন, জুনে ১১৮ শিশুর মধ্যে মারা যায় ৩ জন, জুলাইতে ৯১ শিশুর মধ্যে মারা যায় ৫ জন, আগষ্টে ১২০ শিশুর মধ্যে ২ জন, সেপ্টেম্বরে ৭১ শিশুর মধ্যে ২ জন, অক্টোবরে নিউমোনিয়ায় ১২৯ শিশু আক্রান্তদের মধ্যে মারা যায় ২ জন এবং নভেম্বর ৮ তারিখের মধ্যে ৫০ শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়েছে। এই সময়ে কোন শিশু মারা যায়নি। এছাড়া খুমেক হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডের সূত্র মতে, উল্লিখিত সময়ের মধ্যে নিউমোনিয়া শিশু আক্রান্ত সংখ্যা ছিল ১৪৮ জন। এর মধ্যে জানুয়ারীতে ৩১ শিশু, ফেব্রুয়ারিতে ১৫, মার্চে ১২, এপ্রিলে মে’তে ৮, জুনে ৩, জুলাই মাসে ১২, সেপ্টেম্বর মাসে ১৮, অক্টোবর মাসে ২১ ও নভেম্বর মাসে ৯ তারিখ পর্যন্ত ১২ শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন।
ওই ওয়ার্ডে ইনচার্জ সিনিয়র স্টাফ নার্স মঞ্জু ফলিয়া এ প্রতিবেদককে বলেন, এই সময়ে ঠান্ডাজনিত কারণে শিশুরা নিউমোনিয়া আক্রান্ত হয় বেশি। শিশু ওয়ার্ড ১৩-১৪ মিলে মোট বেড সংখ্যা রয়েছে ৪৮টি। এর মধ্যে ডায়ারিয়া বেড ৪টি, অপুষ্টি বাচার জন্য বেড ৪টি, নিউনেট(১-২৮ দিনের শিশু) বেড ৫টি রয়েছে। নিউনেট বেডের সংখ্যা বর্তমানে শিশুর রোগীদের তুলনায় খুবই কম রয়েছে। প্রায়ই এই ওয়ার্ডে ৩০ জনের মতো বাচ্চাকে (১-২৮ দিন) শিশুকে সেবা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া এই শিশু ওয়ার্ডে প্রত্যেকটি জানালারই কাচ ভাঙ্গা রয়েছে। যা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিপদজনক। রাতে ওই ভাঙ্গা জানালে থেকে বাতাস প্রবেশ করে রোগ সারাতে এসে যদি রোগ নিয়ে যাওয়ার অবস্থা দাড়িয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
খুমেক হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডে কর্মরত ইন্টার্ণী চিকিৎসক ও ইন্টার্ণী চিকিৎসকের পরিচালনা পরিষদের অন্যতম সদস্য সাফাত আলদ্বীন অমি বৃহস্পতিবার রাতে বলেন, হুট করে জলবায়ু পরিবর্তন কারণ যে পরিবেশগত সমস্যা হচ্ছে সেটি হলো ঠান্ডা ও গরমে কারণে নবজাতক শিশুরা তারা বিশেষ করে নিউমোনিয়া ও ব্রোনকিউলাটিস নামক শ্বাসকষ্টো রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন পাশাপাশি পুষ্টিহীনতাও অন্যতম কারন রয়েছে। এছাড়া দেশে নি¤œ শ্রেনীর মানুষের মধ্যে সচেতনতা যথেষ্ট অভাব থাকার কারণে শিশুরা নিউমোনিয়া আক্রান্ত হচ্ছেন। খুলনা বিভাগের বিভিন্ন স্থান থেকে নিউমোনিয়া আক্রান্ত শিশুরা আমাদের হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিচ্ছেন। বিগত বছরগুলোর মধ্যে এই হাসপাতালে নিউমোনিয়া ও ব্রোনকিউলাটিস নামক শ্বাসকষ্টো শিশুরা এখনো কেউ মারা যাননি। নিউমোনিয়া আক্রান্ত শিশুকে সালবিউটমল নামক একটি ওষুধ দিয়ে মেশিনের মাধ্যমে শিশুকে গ্যাস দেয়া হয়। যাকে বলে নেবুলাইজেশন। ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল চাইল্ড ইন্সটিটিউট (আইএমসিআই) গাইড লাইন অনুসারে নিউমোনিয়া বা ব্রোনকিউলাটিস প্রধানতম চিকিৎসা হচ্ছে অক্সিজেন সাপ্লাই ও এই নেবুলাইজেশন। তিনি বলেন, শিশুকে জন্মের প্রথম ঘন্টায় মায়ের সাল দুধ খেতে দিতে হবে। ৬ মাস বয়স পর্যন্ত কেবল মায়ের দুধ খাওয়াতে হবে, এর কোন বিকল্প নেই। এই প্রক্রিয়ায় নিউমোনিয়াসহ ঠান্ডাজনিত অনেক রোগ থেকে শিশুকে রক্ষা করা সম্ভব। বাজারের বিভিন্ন ধরনের শিশুদের জন্য গুড়ো দুধ পাওয়া যায় এটা অত্যন্ত ক্ষতিকর। শিশুরা মায়ের বুকে দুধ খেলে পুষ্টির মান সমান থাকে পাশাপাশি শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। মায়ের দুধের মধ্যে রোগ প্রতিরোধকারী বিভিন্ন ইন্টিবডি বা বিভিন্ন উপদান রয়েছে।
তার শিশু ওয়ার্ডে মধ্যে জানাল কাচ ভাঙ্গার বিষয় বলেন, শুধুমাত্র জানালার কাচ ভাঙ্গার বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে দোষারোপ করলে হবে এটা একটি জাতীয় সম্পদ সেক্ষেত্রে আগত রোগীদের অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। #