পাট নিয়ে দুই মন্ত্রণালয়ের দ্বন্দ্ব কেন?

0
640

দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে এই ধরনের দ্বন্দ্ব বিরাজ করলে সরকার পাটের সম্ভাবনাগুলো বিকশিত করে অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারের যে উদ্যোগ নিয়েছে তা ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বন্ধ পাটকল চালু করা, কাঁচাপাট ও পাটজাতপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, পাট শ্রমিকদের মজুরি সময়োপযোগী করা, উন্নতমানের পাটজাত পণ্য উৎপাদন এবং দেশীয় পাটপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে সরকার ও সংশ্লিষ্টরা সচেষ্ট থাকলে পাটের সুদিন ফিরবে এমন প্রত্যাশা করাই যায়।

দেশের পাট খাতের লোকসান নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে অর্থ ও পাট মন্ত্রণালয়। অর্থমন্ত্রী লোকসানি প্রতিষ্ঠান বিজেএমসিকে বন্ধ করে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে পাট প্রতিমন্ত্রী পাটশিল্পের দুর্দশার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অবহেলা আর পক্ষপাতমূলক আচরণই দায়ী করছেন। গত ৬ মার্চ জাতীয় পাট দিবসকে কেন্দ্র করে দুই মন্ত্রীর মুখোমুখি বক্তব্যে আমরা আশাহত। যেখানে সরকার পাটের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারে নানামুখী পরিকল্পনার কথা বলছে, সেখানে দুই মন্ত্রণালয়ের দ্বন্দ্ব অনভিপ্রেত।

এক সময় পাটকে বলা হতো সোনালি আঁশ। তদানীন্তন পাকিস্তানের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস ছিল পাট রপ্তানি। দেশ স্বাধীনের পরও প্রধান অর্থকরী ফসল ছিল সোনালি আঁশ পাট। তখন দেশে ৮৭টি পাটকল ছিল দেশে। কিন্তু আশির দশক থেকেই দাতা সংস্থাগুলোর পরামর্শে তৎকালীন সরকারগুলোর নেয়া বৈরী সিদ্ধান্তে একের পর এক বন্ধ হতে থাকে পাটকল, নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দেয়া হয় বৃহৎ পাটকলগুলো। এর ফলে বাংলাদেশ হারায় তার বিশ্ব পাটের বাজার। দেশেও পাটজাত পণ্যের ব্যবহার উঠে যায়। সেই জায়গা দখল করে নেয় আমদানি করা কৃত্রিম তন্তু। তবে স্বস্তির ব্যাপার হলো রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে পরিস্থিতি উল্টো বাঁক নেয়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার পাট শিল্পের সুদিন পুনরুদ্ধারে মনোযোগী হয়েছে। পাটকলগুলো চালু করা হচ্ছে। পাটকে কৃষিপণ্য হিসেবে ঘোষণাও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পাট কৃষিজাতপণ্য হলেও এতদিন কৃষিপণ্য হিসেবে সরকারিভাবে এটি কৃষিপণ্য বিবেচিত না হওয়ায় অন্য কৃষিপণ্যে যে ধরনের সরকারি ভর্তুকির সুযোগ রয়েছে পাটে তা ছিল না। ফলে বঞ্চিত হয়ে আসছিলেন পাট উৎপাদকরা। পাটকে কৃষিপণ্য স্বীকৃতির ঘোষণায় নতুন আশাবাদ তৈরি হয়েছে দেশের এক সময়ের সোনালি আঁশ পাট নিয়ে। তবে না বললেই নয় যে, সরকারি এসব ইতিবাচক সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপগুলোর বাস্তবায়নের চিত্র কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই হতাশাব্যঞ্জক।

আমরা দেখছি, পাটের বহুমুখীকরণের ফলে এ খাতে উদ্যোক্তা বাড়ছে। নিয়ম অনুযায়ী পণ্যে ৫০ ভাগ পাটের ব্যবহার থাকলেই তা কৃষিজাত পণ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে। এতে উদ্যোক্তারা পণ্য রপ্তানিতে ২০ শতাংশ অর্থ সহায়তা পাবে। তবে পাটকে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যে অন্তর্ভুক্ত করার ফাইল আটকে আছে অর্থ মন্ত্রণালয়ে। এ বিষয়ে তাই প্রকাশ্যেই অর্থমন্ত্রীকে দায়ী করছেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহ থাকলেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অসহযোগিতার কারণে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের তালিকায় পাট পণ্যের অন্তর্ভুক্তি দুই বছর ধরে ঝুলে আছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে পাটের উন্নয়ন সম্ভব দাবি করে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলছেন, প্রতি বছর ৪শ থেকে ৫শ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েও বিজেএমসি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা মনে করি, দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে এই ধরনের দ্বন্দ্ব বিরাজ করলে সরকার পাটের সম্ভাবনাগুলো বিকশিত করে অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারের যে উদ্যোগ নিয়েছে তা ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাটের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে দেশের জুটমিলগুলোকে প্রযুক্তিনির্ভর করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, কৃষক যেন পাটের ন্যায্যমূল্য পায়, পাট চাষে উৎসাহী হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে। বন্ধ পাটকল চালু করা, কাঁচাপাট ও পাটজাতপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, পাট শ্রমিকদের মজুরি সময়োপযোগী করা, উন্নতমানের পাটজাত পণ্য উৎপাদন এবং দেশীয় পাটপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে সরকার ও সংশ্লিষ্টরা সচেষ্ট থাকলে পাটের সুদিন ফিরবে এমন প্রত্যাশা করাই যায়।