পাইকগাছার প্রশাসনে সরকারি রাজস্ব সুরক্ষায় অনিহা!

0
42

মনির বিড়ির আটককৃত চালানের সব প্যাকেটের ব্যান্ডরোলই নকল, জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি এক মাসেও


শেখ নাদীর শাহ্ :

দু’মাস পেরিয়ে গেলেও পাইকগাছা থেকে আটক নকল মনির বিড়ির চালানের সাথে জড়িত কোম্পানীর মালিক কিংবা সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোন প্রকার আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। এমনকি এ ঘটনায় উপজেলা স্যানিটারী ইন্সপেক্টর কর্তৃক থানায় এজাহার দাখিল করলেও তা এখন পর্যন্ত রেকর্ড হয়নি।

এদিকে জব্দকৃত ৮ বস্তা ৩ লক্ষ ৩৬ হাজার শলাকা বিড়ি জব্দ’র পর শর্ত সাপেক্ষে তা সংশ্লিষ্ট সাব-ডিলারের জিম্মায় রাখা হলেও সেখান থেকে চালানটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এ সংক্রান্তে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জব্দকৃত বিড়িগুলি ফেরৎ দেওয়ার জন্য তাগিদপত্র পাঠালেও ভ্রুক্ষেপ করছেননা সাব ডিলার রউফ বিশ্বাস। সব মিলিয়ে ঘটনাটিকে আড়াল করতে একটি সম্মিলিত চক্র মাঠে নেমেছে বলে দাবি করছে বিভিন্ন মহল।

প্রসঙ্গত, গত ২৫ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মৌখিক তথ্যের ভিত্তিতে স্যানিটারী ইন্সপেক্টর ও নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা উদয় কুমার মন্ডল পৌর সদরের ইজিবাইক স্ট্যান্ড এলাকা থেকে ৮ বস্তা ৩ লক্ষ ৩৬ হাজার পিচ নকল মনির বিড়ি জব্দ করেন। একই সময় যশোরের মনিরামপুর থানার চন্ডিপুর এলাকার মো: আলী হোসেন বিশ্বাসের ছেলে মো: রফিকুল ইসলাম নামে একজনকে আটক করা হয়।

এরপর ঐদিন বেলা সাড়ে ১১ টার দিকে বিড়িগুলো জব্দ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট নিলে বিড়ির সাব ডিলার পাইকগাছার সোলাদানার বয়ার ঝাপার মৃত আ: সামাদ বিশ্বাসের ছেলে আব্দুর রউফ বিশ্বাস হাজির হয়ে কোম্পনীর সাব ডিলার দাবি করে জব্দকৃত সমুদয় বিড়ি তার অনুকূলে আনা হয়েছে যার রশিদ নং-৩৬৪ বলে দাবি করে একটি রশিদ উপস্থাপন করা হয়। এসময় বিড়ি কোম্পানীর এসআর সাতক্ষীরার আশাশুণীর ছোবান ঢালীর ছেলে রেজোওয়ান ইসলাম রনি, পাইকগাছার সোলাদানার বয়ারঝাপা গ্রামের মো: আবুল কাশেম এর ছেলে মো: শরিফুল ইসলাম তাদের আমদানিকৃত সমুদয় বিড়ির প্যাকেটগুলোতে ব্যবহৃত ব্যান্ডরোলগুলি আসল বলে দাবি করে তাদের কোম্পানী সরকারকে যথাযথ রাজস্ব দেয় বলে দাবি করেন। এসময় ইউএনও’র নির্দেশে উপজেলা স্যানিটারী ও নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা উদয় কুমার মন্ডল মনির বিড়ির ৪টি নমুনা প্যাকেট পরীক্ষার জন্য দি সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসে প্রেরণ করেন। যার পত্র নং-উপঃস্বাঃকমঃ/স্যানি/পাইক/খুল/২০২১/৯০৮, তারিখ ২৬/১০/২১ইং। এরপর দি সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (বাংলাদেশ) লিঃ এর অরিজিনেশন, গবেষণা ও মান নিয়ন্ত্রণ বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো: খশরুজ্জামান স্বাক্ষরিত গত ৮ নভেম্বর পত্র নং ৫৩. ১৮. ৩৩০০. ০৩৮.১৬.১৩৪.২০২১-১৩৪ মাধ্যমে উপজেলা স্যানিটারী ইন্সপেক্টর উদয় কুমার মন্ডলকে জানানো হয় যে, তাদের কাছে পাঠানো মনির বিড়ির ৪ টি প্যাকেটে লাগানো ব্যান্ডরোলগুলো নকল।
এসময় জব্দকৃত বিড়িগুলি পরীক্ষিত ফলাফলের ভিত্তিতে আইনানুগ যেকোন ব্যবস্থা গ্রহনের শর্তে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা সহকারী কমিশনার(ভূমি) এর মৌখিক নির্দেশে সাবডিলার উপজেলার সোলাদানা ইউনিয়নের বয়ারঝাপা গ্রামের মৃত আব্দুস সামাদ বিশ্বাসের ছেলে আব্দুর রউফ বিশ্বাসের জিম্মায় রাখা হয়।

সর্বশেষ অরিজিনেশন, গবেষণা ও মান নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পাঠানো তথ্যর ভিত্তিতে পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মমতাজ বেগম গত ২৪ নভেম্বর ১৩৪৮ নং স্মারকে জব্দকৃত বিড়িগুলি দ্রুততম সময়ের মধ্যে তার অথবা উপজেলা স্যানিটারী ইন্সপেক্টরের দফতরে ফেরৎ দেওয়ার জন্য জিম্মাদার আব্দুর রউফ বিশ্বাসকে নির্দেশ দেন।

অথচ নির্দেশনার আজ এক মাস অতিবাহিত হলেও আব্দুর রউফ বিশ্বাস এরিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বিড়িগুলি ফেরৎ দেননি। কিংবা থানা পুলিশ স্যানিটারী ইন্সপেক্টরের দাখিলকৃত এজারটি রেকর্ড করেননি।

এব্যাপারে পাইকগাছা উপজেলা স্যানিটারী ইন্সপেক্টর ও নিরাপদ খাদ্যকর্মকর্তা উদয় কুমার মন্ডল জানান, তিনি ১৮৬০ এর ২৫৫ এবং ২৬০ ধারায় মনির বিড়ি কোম্পানীর মালিক যশোরের মনিরামপুর উপজেলার চন্ডিপুর ঘিবা গ্রামের মো: জামসেদ আলীর ছেলে মো: মনিরুল ইসলামকে প্রধান করে ৫ জনের বিরুদ্ধে পাইকগাছা থানায় একটি এজাহার দাখিল করেছেন।

এব্যাপারে পাইকগাছা থানার অফিসার ইনচার্জ জিয়াউর রহমান জানান, এজাহারে কিছু ত্রুটি থাকায় তিনি তা সংশোধন করে দেওয়ার জন্য বলেছিলেন। তবে ইন্সপেক্টর দূর্ঘটনায় পতিত হওয়ায় এখনো সংশোধনি না দেওয়ায় এজাহারটি রেকর্ড করা সম্ভব হয়নি। অথচ স্যানিটারী কর্মকর্তা বলছেন ভিন্ন কথা। থানা পুলিশ ও স্যানিটারী কর্মকর্তার পরষ্পর অসংলগ্ন কথোপকথনের বিষয়টিও নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

এব্যাপারে মনির বিড়ি কোম্পানীর স্বত্ত্বাধিকারী মনিরুল ইসলামের কাছে জানতে তার ব্যবহৃত মোবাইলে কল করে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

সূত্র জানায়, সর্বশেষ ট্যারিফ আইনে প্রতি প্যাকেট বিড়িতে ব্যবহৃত ব্যান্ডরোলের সরকার নির্দ্ধারিত মূল্য নির্দ্ধারণ করা হয়েছে, ৯ টাকা ০৯ পয়সা। সেক্ষেত্রে নামমাত্র বিড়িগুলো ব্যান্ডরোলের চেয়েও কমদামে বিড়ি বাজারজাত করছে। এরপরও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এক অজ্ঞাত কারণে কুম্ভকর্ণে ঘুমিয়ে রয়েছে।
এ বিষয়ে খুলনার গোপাল বিড়ি কোম্পানির ম্যানেজার গৌরপদ পাল বলেন, বাজারে যত্রতত্র বিভিন্ন স্বনামে বেনামে গজিয়ে ওঠা ভুঁইফোড় কোম্পানীর নামে নিম্নমানের বিভিন্ন বিড়ি সরকার নির্ধারিত মূল্য’র চেয়ে নাম মাত্র মূল্যে বাজারজাত করা হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত মূল্য প্রতি প্যাকেট ২৫ (শলাকা) বিড়ির দাম ১৮ টাকা নির্ধারণ করা হলেও নিন্ম মানের কম দামের বিড়ি ৮/১০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে নামমাত্র বিড়ির কথিত কোম্পানীগুলো প্যাকেটে ব্যবহৃত সরকারী ব্যান্ডরোলের স্থলে নকল বা ব্যবহৃত ব্যান্ডরোল ব্যবহার করায় সরকারকে রাজস্ব বঞ্চিত করে বিক্রি করছে।

এতে এক দিকে যেমন সরকার প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে অন্যদিকে ক্ষগ্রিস্থ হচ্ছে প্রকৃত মূল কোম্পানীগুলো। সর্বশেষ সরকারের রাজস্ব উসুলের পাশাপাশি বিড়ি শিল্পকে বাঁচাতে তিনি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সদয় ও যথাযথ আইনের প্রয়োগে জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

তথ্যানুসন্ধানে জানাযায়, বাংলাদেশ বিড়ি শ্রমিক ফেডারেশনের পক্ষে কোন প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়া দেয়া অবৈধ বিড়ি কোম্পানীর লাইসেন্স বাতিলের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর একটি আবেদন করেন।

কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, খুলনা থেকে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের ধরিয়ে দিতে সতর্কিকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করে।
এব্যাপারে কাস্টমসের পক্ষে সরকারি রাজস্ব সুরক্ষার স্বার্থে জরুরী ভিত্তিতে পোষ্ট মাস্টার জেনারেলদেরকে অবৈধ কোম্পানীর কাছে সরকারের ব্যান্ডরোল বিক্রি না করতে অবহিত করে।

এ প্রসঙ্গে গত ১৩ ডিসেম্বর হাইকোর্ট সারাদেশে অবৈধভাবে গড়ে তোলা বিড়ি কোম্পানীগুলো বন্ধ ও জিনিষপত্র জব্দ করতে এক নির্দেশনা জারী করেন।
এদিকে সরকারি রাজস্ব সুরক্ষা ও অবৈধ বিড়ি কোম্পানীগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেখানে এতটা স্বোচ্চার সেখানে পাইকগাছায় এত বড় বিড়ির চালান জব্দ ও পরীক্ষায় ব্যবহৃত ব্যান্ডরোল নকল প্রমানিত হলেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দায়সারা ভূমিকা এলাকাবাসীর পাশাপাশি প্রকৃত বিড়ি কোম্পানীগুলোকে নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।