পাইকগাছার উলুবুনিয়া নদীর দু’তীরে শুরু হয়েছে জমি দখলের মহোৎসব

0
45

শেখ নাদীর শাহ্:
খুলনার পাইকগাছা উপজেলার লুার উলুবুনিয়া নদী খনন করে নির্মাণ করা হচ্ছে সরু খাল। জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের আওতায় মৎস্য অধিদপ্তরের বাস্তবায়নাধীন নদীটি খননে স্কেভেটর দিয়ে মাটি কেটে ফেলা হচ্ছে নদীর মধ্যেই। ফলে সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে নদীর দু’তীরে বসবাসরত অবৈধ দখলদারদের স্থায়ী দখলের। অন্যদিকে জোয়ার ও আসন্ন বর্ষা মৌসুমের পানিতে নদী বক্ষের মাটি ধুয়ে ফের ভরাট হবে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের পানি নিষ্কাশন ও জীবিকা নির্বাহের অন্যতম মাধ্যম ঐতিহ্যের উলুবুনিয়া নদী। এমনটাই আশংকা করছেন স্থানীয়রা।
টেকসই মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সরকারের দারিদ্র্য বিমোচন প্রচেষ্টাকে ত্বরান্বিত করা, পতিত জলাশয় সংষ্কারের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি করে পুষ্টির চাহিদা পরন, মাছ চাষের উন্নত প্রশিক্ষণ, সম্প্রসারণ সেবা এবং মৎস্য চাষের প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহের মাধ্যমে গ্রামীণ দরিদ্র মৎস্য চাষী,মৎস্যজীবি বেকার যুবক ও দুস্থ মহিলাদেও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আয় বৃদ্ধি ও আর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন,সমাজ ভিত্তিক মৎস্য চাষ ব্যবস্থার স‚চনা করা, উন্নয়নকৃত জলাশয়ে স‚পলভোগীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পতিত জলাশয় সংষ্কারের মাধ্যমে আবাসস্থল পুনরুদ্ধার করে পরিবেশ বান্ধব মাছ চাষ এবং জীব বৈচিত্র সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে সরকার দেশের ৬১ টি জেলার ৩৪৯ টি উপজেলায় এ প্রকল্প হাতে নিয়েছে।
পাইকগাছা উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা পবিত্র কুমার দাস বলছিলেন, প্রকল্পের আওতায় পাইকগাছা উপজেলার ১টি নদী (বদ্ধ) ও ৩ টি খালের মধ্যে দু’টি লুা ইউনিয়ন এবং দু’টি দেলুটী ইউনিয়নে অবস্থিত। লুার দু’টির মধ্যে একটি উলুবুনিয়া মরা নদী। যার আয়তন ১.৫৯৭ হেক্টর। শামুকপোতা আবাসন হতে পুটিমারী মন্দির পর্যন্ত খালটি খননের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৯ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। অপরটি হচ্ছে গয়েশার খাল। জনৈক শিব বাবু’র বাড়ী হতে শামছুর আলীর বাড়ী পর্যন্ত ১.৬২৫ হেক্টর খালটি খননে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৯ লাখ ৮২ হাজার টাকা। অন্যদিকে দেলুটীর দু’টি খালের মধ্যে একটি হচ্ছে গেওয়াবুনিয়া (বরোপিট), যার আয়তন ১.৬১ হেক্টর। ব্রজেন মন্ডলের বাড়ী হতে ক্ষীতিশ মন্ডলের বাড়ী পর্যন্ত খালটি খননের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৯ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। অপর পারমধুখালী খালটির ১.৬০ হেক্টর গৌরাঙ্গ ঢালীর বাড়ী হতে রাধানগরের সীমানা পর্যন্ত খননে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৯ লাখ ৮১ হাজার টাকা।
তিনি আরো বলছিলেন, এধরণের প্রকল্প এলাকায় এটিই প্রথম। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে জীব-বৈচিত্র ও পরিবেশ সংক্ষণের পাশাপাশি প্রদর্শণী খামার কাজে ব্যবহার, মৎস্যজীবিদের জীবিকা নির্বাহের পথ উন্মুক্ত,দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদন ও সংরক্ষণ, কৃষিতে সেচের ব্যবহার ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারসহ বিভিন্নভাবে নর্দ ও খালগুলি জনমানুষের উপকারে আসবে।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পে উপজেলার ৪টি খালের মধ্যে লুার উলুবুনিয়া নদী (বদ্ধ) ও দেলুটীর গেওয়াবুনিয়া খালের প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। কিছু দিনের মধ্যে লুার গয়েশার খাল ও দেলুটীর পারমধুখালী খালের খনন কাজও শুরু হবে। চলতি মাসের মধ্যে এর খননকাজ শেষ হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এদিকে নদীর ম‚ল প্রস্থের প্রায় অর্ধেক অর্থাৎ মাঝ বরাবর দিয়ে ৩ থেকে সাড়ে ৩ ফুট গভীরতায় খনন কাজ হচ্ছে। এতে নদীর দু’পাশের অবৈধ দখলদারদের স্থায়ী দখলের পথ প্রশস্ত হচ্ছে কিনা সে প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রকল্পে নক্সা অনুযায়ী তাদের কাজ করতে হচ্ছে। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের বিষয়টি তাদের নয়। সেটা দেখবে নদীর মালিক পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে বাস্তব অবস্থার আলোকে নদী খননে ঠিকাদারদের ৫ ফুটের বেশী গভীরতা ও প্রস্থ ৮০ ফুটের বেশী খননের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে ম‚ল নক্সার থেকে খননের দৈর্ঘতা কমে আসবে।
এব্যাপারে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দু’টি শর্ট বুমের ছোট স্কেভেটর দিয়ে খনন কাজ চলছে উলুবুনিয়া নদীর। এতে নদীর মাঝ বরাবর দিয়ে কোথাও ৭০ কোথাও ৭৫ ফুট প্রস্থে ৩ থেকে সাড়ে ৩ ফুট গভীরতায় এগিয়ে চলেছে প্রকল্পের খনন কাজ। এতে দু’পারের বিশেষ করে পশ্চিম পাশের দীর্ঘ দিনের অবৈধ দখলদারদের স্থায়ী ও টেকসই দখলে পরোক্ষভাবে সহায়তা করা হচ্ছে। এছাড়া নদীর মাটি কেটে নদীতেই ফেলা হচ্ছে।
এব্যাপারে স্থানীয় বিদ্যুৎ মল্লিক বলছিলেন, নদীর মাটি কেটে নদীতে ফেলার কারণে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে উপরের অতিরিক্ত পানি ও জোয়ারের পানিতে নদীর খননকৃত মাটি ফের নদীতে পড়ে ফিরে যাবে প‚র্বের অবস্থায়। এলাকাবাসী মনে করেন, নদী খননে অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সুষ্ঠু পরিকল্পনার যথেষ্ঠ অভাব রয়েছে। এভাবে নদী খননে সফলুা বহুলাংশে বাঁধাগ্রস্থ হবে বলেও আশংকা তাদের।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবিএম খালিদ হোসেন সিদ্দিকী বলেন, খনন কাজ সার্বিক তদারকি করা হচ্ছে। নদী ও খালগুলোতে সুষ্ঠু খনন কাজ শেষ হলে তা বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সর্বশেষ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধিনস্থ উলুবুনিয়া নদীসহ পাইকগাছার ৪টি খাল সংষ্কারে মৎস্য অধিদপ্তরের অপরিকল্পিত খনন কাজ সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে ঠিক কি ধরনের প্রভাব পড়বে সেটাই এখন দেখার বিষয়।