‘পট কোম্পানী’র বিপদজনক ‘ফুড সাপ্লিমেন্ট’ : অবাধে বিক্রি হচ্ছে ফার্মেসিতেও

0
917

কামরুল হোসেন মনি:
চিকিৎসকরা শুধু ওষুধ প্রেসক্রাইব করবেন। তাদের প্রেসক্রিপশনে ফুড সাপ্লিমেন্ট প্রেসক্রাইব করার নিয়ম নেই। ফার্মেসীতেও এসব ফুড সাপ্লিমেন্ট বিক্রির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। কিন্তু কার্যকর কোন তদারিকর ব্যবস্থা না থাকায় খুলনাসহ বিভিন্ন এসব ভেজাল ও নিম্নমানের ভিটামিন ও ফুড সাপ্লিমেন্টের রমরমা ব্যবসা চলছেই।
এ ব্যাপারে খুলনা সিভিল সার্জন ডাঃ এ এস এম আব্দুর রাজ্জাক বিষয়টি ড্রাগ এ্যাডমিনিস্টেশনের ব্যাপার। তাছাড়া আমার হাসপাতালে কোন চিকিৎসক লিখে থাকে তাহলে দায়দায়িত্ব তাদের। আর এ বিষয়ে আমাকে কেউ অভিযোগ করেনি, বলেও নিও। যদি কেউ অভিযোগ করে থাকে তাহলে আমি আমার চিকিৎসকদের সাথে এ বিষয়ে কথা বলবো।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মেডিসিন বিভাগেন সহকারি রেজিস্ট্রার ডাঃ শৈলান্দ্র নাথ বিশ্বাস বলেন,  কিছু কিছু প্রোভাইডিকস আছে, যেগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করার জন্য অনেক সময় চিকিৎসকরা গ্রহনের উপদেশ দিয়ে থাকেন। কিন্তু বাজারে যে ধরনের ফুড সাপ্লিমেন্ট বিক্রি হচ্ছে বেশির ভাগই এগুলো রোগ প্রতিরোধে বা রোগ উপশমে কোন ভূমিকা রাখে না। এমনকি এগুলো গ্রহনের ফলে শরীরে কিডনী ও লিভারে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখন হতে পারে।
২০১৫ সালের দিকে তৎকালীন খুলনার ড্রাগ সুপার মাহমুদ হোসেন বলেছিলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য, তৎকালীন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সুপার ও ব্যবসায়ীদের সাথে বৈঠকে ক্ষতিকর এসব ‘ফুড সাপ্লিমেন্ট’ বিক্রি বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়। ওই বৈঠকে হাসপাতালের  কোন চিকিৎসক এগুলি প্রেসক্রিপশনে লিখবেন না বলে হাসপাতালের সুপার নিশ্চিত করেছিলেন। ওই ড্রাগ সুপার বলেছিলেন, কোন ফার্মেসীগুলো ফুড সাপ্লিমেন্ট বিক্রি বন্ধের নিদের্শ রয়েছে। যদি কেউ করে তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ওই সময় বাংলাদেশ কেমিস্ট এন্ড ড্রাগিস্ট সমিতির খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল গেট শাখার আহবায়ক এস এম জাকির হোসেন এই সব অবৈধ ফুড সাপ্লিমেন্টের প্রায় ৬০টি নামের তালিকা খুলনা ড্রাগ সুপারের কাছে জমা দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে ছিলেন।
ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ১৯৮২-এর ১৪ (এ) (১) উপ-ধারায় বলা আছে, রেজিস্ট্রিবিহীন ওষুধ রোগীর ব্যবস্থাপত্রে কোনো চিকিৎসক লিখতে পারবেন না। তা সত্ত্বেও ফুড সাপ্লিমেন্ট লেখা হচ্ছে। বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন ফামের্সীগুলোতে বিক্রি নিষিদ্ধ ফুড সাপ্লিমেন্ট বিক্রি হচ্ছে।
সূত্র মতে, বিদেশ থেকে বিভিন্ন ধরনের ভেজাল ও নিম্নমানের ফুড সাপ্লিমেন্ট আমদানি করা হচ্ছে। অথচ সেগুলোই চকচকে মোড়কে ওষুধ হিসেবে নানা নামে বিক্রি করা হয় দেশের বাজারে। এগুলোর বেশিরভাগেরই গুণগতমান নিয়ে রয়েছে অভিযোগ। ওষুধ সেবনের পর রোগীর সমস্যা দেখা দেয়ার ঘটনাও ঘটছে। যদিও এতো ফুড সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজনীয়তা আসলেই আছে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে খোদ চিকিৎসকদেরই।
জানা গেছে, প্রতিনিয়ত শত শত রোগী কথিত ‘পট কোম্পানী’র এইসব ওষূধ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন চিকিৎসকের দেওয়া প্রেসক্রিপশনের কারনে। কোম্পানীর সাথে চুক্তিবদ্ধ থাকার কারণে একশ্রেনীর চিকিৎসক অর্থের বিনিময়ে ‘ফুড সাপ্লিমেন্ট’ নামে প্রেসক্রিপশনে এসব লিখে থাকেন। আর অতিরিক্ত লাভের আশায় ওষুধের দোকানগুলোতেও এসব বিপদজনক উপাদান অহরহ বিক্রি হচ্ছে।
জানা গেছে, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা ছাড়াও মহানগর ও উপজেলার অন্তত: ৩শ’ ওষুধের দোকানে ‘পট কোম্পানী’র (কৌটা বা পটে বিক্রি হয় বলে পট কোম্পানীর ওষুধ নামে পরিচিত) ‘ফুড সাপ্লিমেন্ট’ বিক্রি হচ্ছে। ওবায়দুল ইসলাম জসিম, মেহদেী, গোপাল মাসিদ, হাসানুল হক বান্না, বুলবুল, আনিস, সুমন রায়, আল-আমিন, শাহিনসহ বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী স্বাস্থ্য ভালো হওয়ার এইসব কথিত ‘ফুড সাপ্লিমেন্ট’ ব্যবসার সাথে জড়িত বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, জয়েন্টেড আর, এমভি জেড, জয়েন্টরাইট, ট্যাকলোজেড, ওয়েল জয়েন্ট, নিউট্রেটজি, বনমিল, সিভাকল-ডি, রিভোন, রিমক্যাল-ডি, সিভা-গোল্ড, সীবন, অভা কেয়ার, অলিগো কেয়ার, কেলসিম্যাগ, ওলিগো, ওভাকেয়ার, রিভন, লিবেরিল, প্রেগনাকেয়ার, প্রিসজেল, হাইলন, এব্যানা, বিয়ন, ক্যাসপো, ভিএম ক্যাল, ভিএম-৩২, স্ট্রুলিন, ডেভিড-৩, এসপি গোল্ড, প্রিমা-১০০০, মেগা-৩, গিংগুবা-১০০, বনক্যাল-ডি, ভিটা এক্সএল, অ্যামাইনো এনার্জি, অ্যামাইনো প্লাস, সি-জয়েন্টিন, বোন মিল, ইপো, এস্টাভিট, সি-ক্যাল প্লাস,প্রোবায়েটিক-৪, এনডি ক্যাল, অর্থপ্লাস, বনগার্ড, ওনিক্স, রক্সেন, বিলোবা প্লাস,বোন ডি এস,সিনো-ই, জয়েন্ট বিল্যাক্স,ওমাল, জেলপ্লাস, ইভোনিয়া, মাল্টিজেন, এসডি প্লাস,স্টেনিন ই, বি-গোল্ড,ওলিগো, থ্রি-ম্যাক্স, থি-এমক্যাল, বিক্স, ফিলেট, একলেস, ভ্যানভাক্স, এ্যালটো-৪০০, মেগা-৩, টু ডেক্স, মাল্টিক্যাল, ম্যাক্স ভি, গ্রিন-ই, এস-ক্যালসহ প্রায় তিন শ’র মত আইটেম পাওয়া যাচ্ছে। এই সব কথিত ‘ফুড সাপ্লিমেন্ট’এর প্রতি পটের দাম ৪৫০ থেকে ৬৫০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।
আবুল কালাম সম্প্রতি সদর হাসপাতালের বহির্বিভাগে চর্ম রোগের চিকিৎসা নিতে যান। তিনি নগরীর দোলখোলা এলাকার বাসিন্দা। চিকিৎসক তার ব্যবস্থাপত্রে চারটি ওষুধের নাম লিখে দেন। যদিও এর মধ্যে দুটিই ছিল ফুড সাপ্লিমেন্ট। শুধু কালামই নন, আরো অনেক রোগীর ব্যবস্থাপত্রে ওষুধের পাশাপাশি ফুড সাপ্লিমেন্টের নাম লিখে দেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক। ##