নগরীর হেরাজ মার্কেটে র‌্যাবের অভিযান  : গোডাউন সিলগালা

0
687

 

কামরুল হোসেন মনি:
খুলনাঞ্চলে ফুড সাপ্লিমেন্ট (খাদ্যসম্পূরক), মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ ও ভেজাল ওষুধ ছেয়ে গেছে। ওই সব ভেজাল ওষুধের একটি অংশ শহর থেকে গ্রামঞ্চলের হাট-বাজারে অসাধু ওষুধ ব্যবসায়ীরা বিক্রি করছেন। জীবন রক্ষাকারী ওষুধ সম্পর্কে শহর থেকে গ্রামাঞ্চলের মানুষের ধারণা কম। ওই সব জায়গায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান থাকে না। এর ফলে অসাধু ব্যবসায়ীদের ভেজাল ওষুধ বিক্রির মূল টার্গেট ওইসব অঞ্চল। আর সাধারণ মানুষ ওই সব ভেজাল বা নকল ওষুধকে প্রকৃত ওষুধ ভেবে কিনে খাচ্ছেন বিষ।
মঙ্গলবার র‌্যাব-৬ এর একটি টিম নগরীর পাইকারি ওষুধ বিক্রি হিসিবে পরিচিত হেরাজ মার্কেটে অভিযান চালান। অভিযানে ওই মার্কেটের ৩য় ও ৪র্থ তলায় অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু কোন মালিককে না পাওয়ায় ওই দুটি তলায় যে কয়টি গোডাউন আছে সব এক সাথে সিলগালা করে দেন। এর আগে ২০১৬ সালে অক্টোবর মাসে র‌্যাব-১ ও র‌্যাব-৬ যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে খুলনার রূপসা থানাধীন জাবুসা চর রূপসায় অবস্থিত মেসার্স শাহনেওয়াজ সী ফুড প্রাইভেট লিঃ-এর ভেতরে নকল ওষুধ তৈরির কারখানার সন্ধান পায়। একই সাথে বিভিন্ন নামী দামি কোম্পানীর ওষুধও নকল পায়।
জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ জাকির হোসেন বলেন, ওই সব ঘরে মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকালে ওই সব গোডাউনের কোন ওষুধের মালিকদের পাওয়া যায়নি। আমরা সকল প্রকার ট্রেকনিক্যাল সাপোর্ট নিয়ে আজ বুধবার সরেজমিনে অভিযান পরিচালনা করবো। তার আগে ওই সব গোডাউনে যাতে কেউ প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য সিলগালা (তালা) করে দিয়ে আসছি।


মঙ্গলবার নগরীর হেরাজ মার্কেটে র‌্যাব-৬ ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিতিতেই একটি অভিযান পরিচালনা করা হয়। ওই মার্কেটে ৩য় ও ৪র্থ তলায় গেলে সব কয়টি গোডাউনগুলো তালা ঝুলানো রয়েছে। এর আগে র‌্যাব-৬ এর টিম মার্কেটে মধ্যে ঢুকার পরপরই অনেকেই গোডাউন তালা মেরে আত্মগোপনে চলে যান। ওই সব গোডাউনে সামনে প্যাকাট অবস্থায় রয়েছে বিভিন্ন সিরাপ রয়েছে। পুষ্টি প্যালাস নামক একটি ওষুধের সিরাপ দেখতে পাওয়া যায়। অনেক সিরাপের বোতলে লেভেল ছাড়া ওষুধ দেখা যায়। আনরেজিস্টার্ড ওষুধও চোখে পড়ে। ওই সময় র‌্যাব-৬ ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মার্কেটের কর্তৃপক্ষকে তলব করেন। তারাও ওই গোডাউনের মালিকদের ডেকে আনতে পারেননি। পরবর্তীতে গোডাউনের মালিক খুজে না পাওয়ায় ওই মার্কেটের সাধারন সম্পাদক তাপস কুমার সরকার শিব ও বিসিডিএস খুলনা জেলা শাখার সাধারন সম্পাদক  কবির উদ্দিন বাবলুর স্বাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর নিয়ে রাখেন।


অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিশ্রণ যন্ত্র, সিদ্ধ করার যন্ত্র, মোড়কজাত করার যন্ত্র, ক্যাপসুল জোড়ার যন্ত্র  দেশেই তৈরি হচ্ছে। দেড় থেকে দুই লাখ টাকায় এসব যন্ত্র কিনে অনেকেই খাদ্যসম্পূরকের কারখানা খুলে বসেছেন। এছাড়া ইনজেকশন এনটিডি। এটি মহিলাদের সিজারের পর লাগে যাদের রক্ত ‘ও’ নেগিটিভ বা যে কোন নেগিটিভ ব্যক্তির অপারেশন পর লাগে। ওটি আসল ইনজেকশন হলে বাজারে দাম ৩ হাজার ৪শ’ টাকা এবং নকলটার দাম নিচ্ছেন ৮শ’ থেকে এক হাজার টাকা। ইনজেকশন ডায়ামিক্যাপরোল। এটি সাধারণ তুতে খাওয়া ব্যক্তিকে দেয়া হয়। এটি আসল ইনজেকশন হলে দাম পড়ে এক হাজার থেকে এক হাজান ২শ’ টাকা এবং নকল করে দাম নিচ্ছে ৬শ’ থেকে ৮শ’ টাকা। এছাড়া নামি-দামি অনেক কোম্পানীর ইনজেকশন ও এন্টিবায়টিক ক্যাপসুল ও ট্যাবলটে বাজারে ভেজাল পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বিক্রি নিষিদ্ধ ফিজিসিয়ান স্যাম্পুল ও প্যাথেডিন বিক্রি। বাজারে ছাড়ার আগে রোগীদের ওপর কার্যকারিতা পরীক্ষার উদ্দেশ্যে চিকিৎসকদের যে সব ওষুধের নমুনা পাঠানো হয় তা ফিজিশিয়ান স্যাম্পল নামে পরিচিত। ওষুধের দোকানে এই ওষুধ বিক্রি নিষিদ্ধ। এছাড়া খুলনায় নকল ও ভেজালসহ আনরেজিস্টার্ড ওষুধের বিকিকিনিও বেড়েছে। এছাড়া ফুড সাপ্লিমেন্ট হিসেবে ফ্যাটালিটি, এমাউনো প্লাস, জয়েন্ট কমপ্লেক্স, জয়েন্ট রিলাক্স, সিডি জয়েন্ট, সিডি প্লাস, সি-বোন, সিগোল্ড, ওরিকেয়ার, বায়োকেয়ার, স্ট্রিম, রেডিকোল্ড, টোরাকল, এ্যাবানা, হাইলোন, প্রেম-১০০০, ভি-৪০০, এনডিকল, কলরেক্সডি বিভিন্ন ফার্মেসীগুলোতে বিক্রি হচ্ছে। এসব ফুডসাপ্লিমেন্ট ইকবাল মাহমুদ, সবুজ, জিসি ঘোষ, নিলয় বাবু, মোঃ হানিফ, মোঃ কাজল, মোঃ তানভির, মোঃ আরিফ, অঞ্জনসহ আরও ২০-২৫ জন বিক্রেতারা রয়েছেন। সূত্র মতে, ওই সব ফুডসাপ্লিমেন্টের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
হেরাজ মার্কেট ওষুধ ব্যবাসয়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক তাপস কুমার সরকার শিব এ প্রতিবেদককে বলেন, র‌্যাব-৬ এর একটি টিম ও সাথে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিতিতে মার্কেটের ৩য় ও ৪র্থ তলার অভিযান পরিচালনা করেন। ওই সময় ওই সব গোডাউনের মালিকরা ছিল না। তিনি বলেন, আমরা প্রশাসনের পক্ষে কোন গোডাউনে ভেজলা বা নিম্মমানের ওষুধ পান তাহলে আইনের আওতায় আনা হোক আমরাও চাই। গোডাউনের কোন মালিক না পাওয়ায় তারা সিলগালা করে দেন এবং পরবর্তী কোন নির্দেশনা না পাওয়ার পর্যন্ত কোন মালামাল সরাতে পারবেন না। ওই দুই তলায় ১৬-১৮টি মতো ওষুধের গোডাউন রয়েছে বলে তিনি জানান।
বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (বিসিডিএস) খুলনা জেলা শাখার সভাপতি আলহাজ্ব মো. মোজাম্মেল হক বলেন, আমরা ভেজাল ও নি¤œমানের ওষুধ ব্যবসায়ীদের বিপক্ষে। এছাড়া যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদেরকে আইনের আওতায় আনার জন্য আমরা সহযোগিতা করবো। তিনি বলেন, ফ্রি স্যাম্পুল ওষুধ বিভিন্ন কোম্পানীর রিপ্রেজেন্টিভ ডাক্তারদেরকে দিয়ে থাকেন। তারা কেন ওই সব ফ্রি স্যাম্মুল বিক্রি করছেন এমন প্রশ্ন রাখেন তিনি। সরকারি ওষুধ ও ফ্রি স্যাম্পুল বিক্রির মুলহোতা তাদেরকে আগে আইন শৃঙ্খলাবাহিনী তাদেরকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
বিসিডিএস সাধারন সম্পাদক কবির উদ্দিন বাবলু বলেন, অভিযানের সময় অনেকে দোকানপাট বন্ধ করে চলে গেছেন। তিনি বলেন, যারাই অসাধু ব্যবসায়ীদের সাথে জড়িত তাদেরকে আইনের আওতায় আসুক আমরাও চাই। সেক্ষেত্রে প্রশাসনের যত ধরনের সহযোগিতা আমরা করবো।
সাবেক খুলনা নির্বাহি ম্যাজেস্ট্রট আতিকুল ইসলাম এ প্রতিবেদককে বলেছিলেন, ওষুধ ভেজাল প্রতিরোধ করতে হলে বড় বড় ওষুধ মার্কেটে অভিযান অব্যাহত থাকতে হবে। এর মধ্যে হেরাজ মার্কেট, শিশু হাসপাতালের আশপাশ এলাকায় কয়েকটি ফার্মেসী রয়েছে। কিছু কিছু ওষুধ কোম্পানি রয়েছে অসাধু চিকিৎসকদের সুবিধার মাধ্যমে ওষুধ রিপ্রেজেন্টেটিভদের এমআর ও এসআর এদের মাধ্যমে নিম্নমানের ওষুধ পাবলিকের কাছে দেয়। এছাড়া ফিজিসিয়ান স্যাম্পলগুলো বিক্রি করে। ওইসব ওষুধ ভাল মানের না। এসবগুলো প্রতিরোধ করতে হবে। তিনি বলেন, অসাধু ওষুধ ব্যবসায়ীরা অতি মুনাফার আশায় ভাল ওষুধের অন্তরালে ভেজাল ওষুধ দিয়ে দিচ্ছেন। তিনি ওই সময় কয়েকটি ওষুধদোকানীগুলোতে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে খুলনায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ভেজাল ওষুধ কারবারীদের অভিযান পরিচালনা করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যগুলো হচ্ছে ১০ অক্টোবর র‌্যাব-১ ও র‌্যাব-৬ যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে খুলনার রূপসা থানাধীন জাবুসা চর রূপসায় অবস্থিত মেসার্স শাহনেওয়াজ সী ফুড প্রাইভেট লিঃ-এর ভেতরে নকল ওষুধ তৈরির কারখানার সন্ধান পায়। কারখানাটি থেকে এসিআই, অপসোনিন, এসকেএফসহ নামীদামী কোম্পানির ওষুধ, ক্যাপসুলের খালি খোসা ও বিভিন্ন ওষুধ তৈরির সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। ওই সময় প্রতিষ্ঠানটির মালিক কাজী শাহনেওয়াজকে গ্রেফতার করা হয়। পরদিন ১১ অক্টোবর সিপিসি সদর র‌্যাব-৬’র ডিএডি মোঃ নাজমুল হুদা বাদী হয়ে রূপসা থানায় কাজী শাহনেওয়াজসহ চারজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ১২/১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। এজাহারভুক্ত অপর আসামিরা হলেন মোঃ জাকির হোসেন (৪৮), মোঃ হাবিবুর রহমান শেখ (৪৫), সজিব (৩৫)। এ মামলার প্রধান আসামি শিল্পপতি কাজী শাহনেওয়াজ (৬৮) ইতোমধ্যে গত ৬ নভেম্বর খুলনার জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়েছেন। মামলাটি তদন্তে রূপসা থানা পুলিশের কাছ থেকে সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়। সর্বশেষ গত নভেম্বর মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে মামলাটি সিআইডি থেকে র‌্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা হচ্ছেন র‌্যাব-৬’র স্পট কমান্ডার এএসপি বজলুর রশিদ। এই মামলার অপর আসামিরা এখনো গ্রেফতার হয়নি। ১০ নভেম্বর নগরীর হেরাজ মার্কেটের ২য় তলার মেসার্স আল আমিন ড্রাগ হাউজ নামের ফার্মেসী থেকে আড়াই লাখ টাকা মূল্যের বিক্রয় নিষিদ্ধ সরকারি ও ভারতীয় ওষুধ জব্দ করা হয়। খুলনার ড্রাগ সুপার মাহমুদ হোসেন এ ওষুধ জব্দ করেন। গত ১২ অক্টোবর সোনাডাঙ্গা ডেল্টা মেডিকেল হলে অভিযান চালিয়ে রেজিস্ট্রেশনবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ জব্দ করা হয়। ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক মোঃ মোল্লা নাসির উদ্দিনকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। গত ১৭ অক্টোবর সকালে নগরীর হেরাজ মার্কেটে ‘এসকেএফ কোম্পানির প্রটিনেক্স আলট্রা ৫/১০’ স্যালাইন উদ্বার করা হয়। সেই স্যালাইনের প্যাকেটের গায়ে ব্যাচ নম্বর, উৎপাদন ও মেয়াদের তারিখ ছিল না। গত ১৩ অক্টোবর দুপুরের দিকে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত দৌলতপুরের বলাকা ফার্মেসীতে অভিযান চালিয়ে মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ ও বিক্রয় নিষিদ্ধ ফিজিসিয়ান স্যাম্পল জব্দ করার পর মালিককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে। এ ঘটনার জন্য ৫ ঘন্টা খুলনার সকল ওষুধের দোকান বন্ধ রেখেছিল ব্যবসায়ীরা। ##