দেবহাটায় নির্বাচন পরবর্তী মারপিট ও হামলার ঘটনায় থানায় আরোও দুই মামলা : গ্রেপ্তার-৮

0
55

নিজস্ব প্রতিবেদক : সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার কুলিয়া ও সখিপুর ইউনিয়নে নির্বাচন পরবর্তী বিজয়ী ও পরাজিত প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে থেমে থেমে চলছে হামলা, মারপিটসহ একের পর এক সহিংস ঘটনা। ২৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের পর থেকে এপর্যন্ত এ দুটি ইউনিয়নে একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। যাতে কুলিয়া ইউনিয়নের বিজয়ী চেয়ারম্যান ও আ.লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আছাদুল হক এবং পরাজিত আ.লীগের দলীয় প্রার্থী আসাদুল ইসলামের কর্মী-সমর্থকরা আহত হয়েছেন। আর সখিপুর ইউনিয়নে এক গ্রাম পুলিশসহ পৃথক কয়েকটি ঘটনায় পরাজিত আ.লীগের মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী ফারুক হোসেন রতনের কয়েকজন সমর্থকও আহত হয়েছেন।
এসব ঘটনায় এপর্যন্ত কুলিয়া ও সখিপুর ইউনিয়নের বিজয়ী ও পরাজিত প্রার্থীদের ৫৫ জন কর্মী সমর্থকের নাম উল্লেখসহ শতাধিক ব্যাক্তিকে অজ্ঞাতনামা আসামী করে দেবহাটা থানায় পৃথক তিনটি মামলা রেকর্ড হয়েছে। সর্বশেষ দায়েরকৃত কুলিয়ার দেউকুল গ্রামে আছাদুল হকের সমর্থকদের ওপর পরাজিত প্রার্থী আসাদুল ইসলামের সমর্থকদের হামলা, মারপিট এবং সখিপুরের গ্রামপুলিশ ফারুক হোসেনকে মারপিটের ঘটনায় পৃথক দুটি মামলায় বুধবার রাতে কুলিয়া ও সখিপুর ইউনিয়নের ৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন সখিপুরের কামটা গ্রামের কানাই লাল মন্ডলের ছেলে গোপাল মন্ডল (৫২), ধোপাডাঙ্গা গ্রামের মৃত শাহাজুদ্দীনের ছেলে আব্দুর রহিম (৫০), মাঝ সখিপুরের নূর আলী মোল্যার ছেলে বিল্লাল (২৮), কুলিয়ার দেউকুল গ্রামের নজরুলের ছেলে দেলোয়ার, একই গ্রামের মৃত নূর আলী বিশ্বাসের ছেলে রকিব বিশ্বাস (৫০), তার দুই ছেলে আব্দুর রহমান (২২), ইমরান বিশ্বাস (২১) ও মৃত শফিকুল গাজীর ছেলে আল আমিন গাজী। বৃহষ্পতিবার গ্রেপ্তারকৃতদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করে পুলিশ।
কুলিয়া ও সখিপুর ইউনিয়নে এপর্যন্ত যেসব হামলা, মারপিট সহ সহিংস ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে নির্বাচনের পরদিন সখিপুর বাজার এলাকায় শহিদুল ইসলাম ওরফে লাফনা শহীদুল নামে রতনের একজন সমর্থক নিজের অপকর্মের দায়ে হামলার শিকার হন। বছরের পর বছর এলাকার নীরিহ মানুষকে জিম্মি করে চাঁদাবাজি, সরকারি সুবিধাভোগীদের থেকে অর্থ বানিজ্য, জমি দখল, নামাজরত মহিলাদের জামায়াত কর্মী বানিয়ে জেলে ঢুকানোসহ বহু অপকর্ম চালানোর জেরে তার ওপর এ হামলার ঘটনা ঘটে।
সম্প্রতি কুলিয়ার পুষ্পকাটিতে বিজয়ী মেম্বর রব্বানী ও পরাজিত মেম্বর প্রার্থী রিপনের সমর্থকদের মধ্যে হামলা, মারপিট ও কয়েকটি বাড়ি ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। তাতে দুপক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়। যেঘটনার দায় শেষমেষ বিজয়ী চেয়ারম্যান বর্ষিয়ান আওয়ামী লীগ নেতা আছাদুল হকের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে তার ৩৫জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে থানায় মামলাসহ ১৩জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এমনকি আছাদুল হককেও মধ্যরাতে থানায় তুলে নিয়ে দুঘন্টা জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। পরে অসুস্থ অবস্থায় পরিবারের সদস্যদের জিম্মায় আছাদুল হককে ছেড়ে দিলেও, হামলার ঘটনার নেপথ্যে থাকা পরাজিত মেম্বর প্রার্থী শাহীনুজ্জামান রিপনের দায়েরকৃত মামলায় গ্রেপ্তারকৃত আছাদুল হকের নেতাকর্মীদের কারাগারে প্রেরণ করে পুলিশ। যদিও গ্রেপ্তারের একদিন পরই জামিনে মুক্ত হয়েছেন আছাদুল হকের ১৩জন কর্মী-সমর্থক। এঘটনায় থানায় মামলা করতে না পেরে পুষ্পকাটির হামলা ও ভাংচুরের ঘটনার নেপথ্যে থাকা শাহীনুজ্জামান রিপনকে প্রধান আসামী করে বৃহষ্পতিবার সাতক্ষীরার ৭নং আমলী আদালতে পৃথক দুটি মামলার আবেদন করেন পুষ্পকাটি গ্রামের রজব আলীর ছেলে ফারুক হোসেন এবং উত্তর কুলিয়া গ্রামের আইফুল রহমানের ছেলে পারভেজ হোসেন বাবু। বাদীর আবেদন শোনাবোঝার পর দেবহাটা থানায় মামলা দুটি এফআইআর করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ওই দুটি মামলার আবেদনে শাহীনুজ্জামান রিপনকে প্রধান আসামী সহ আরোও ৯জনকে এজাহার নামীয় আসামী করা হয়েছে। যাদের প্রত্যেকেই কুলিয়ার পরাজিত আ.লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী আসাদুল ইসলাম এবং পুষ্পকাটির পরাজিত মেম্বর শাহীনুজ্জামান রিপনের অনূসারী।
সহিংস ঘটনার মধ্যে সর্বশেষ মঙ্গলবার দুপুরে দক্ষিন সখিপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে জনরোশে পড়ে হামলা ও বেদম মারপিটের শিকার হন সখিপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৬নং ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ ফারুক হোসেন। সেসময় গ্রাম পুলিশ ফারুক ওই ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান ও পরাজিত আ.লীগের প্রার্থী রতনের প্রয়োজনীয় কিছু কাগজপত্র ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নিয়ে রতনের বাড়ীতে যাচ্ছিলেন। পরিষদ থেকে গোপন নথি সরানো হচ্ছে বলে ধারনা করে তার ওপর হামলা চালানো হয়। বর্তমানে সে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এঘটনায় ইউপি সদস্য নির্মল মন্ডলকে প্রধান আসামীসহ সেখানকার পরাজিত চেয়ারম্যান প্রার্থী আব্দুল আজিজ ও বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল ইসলামের ৯জন নেতাকর্মীর নাম উল্লেখসহ ৩০/৩৫জনকে অজ্ঞাতনামা আসামী করে হামলার শিকার গ্রাম পুলিশ ফারুকের মা ফতেমা বেগম বাদী হয়ে দেবহাটা থানায় একটি মামলা (নং- ১/১১৯) দায়ের করে। এছাড়া বুধবার নির্বাচন পূর্ব হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কুলিয়ার দেউকুল গ্রামে বিজয়ী চেয়ারম্যান আছাদুল হকের সমর্থকদের ওপর হামলা চালায় পরাজিত আসাদুল ইসলামের সমর্থকরা। এতে আছাদুল হকের দুই সমর্থক শফিকুল ইসলাম ও তার স্ত্রী আলেয়া খাতুন গুরুতর আহত হয়। তারা বর্তমানে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ওই ঘটনায় দেউকুল গ্রামের মৃত কাশেম বিশ্বাসের ছেলে আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে ৯ জনের নাম উল্লেখসহ আরোও ২০/২৫জনকে অজ্ঞাতনামা আসামী করে দেবহাটা থানায় পৃথক আরেকটি মামলা (২/১২০) দায়ের করেন। এ দুটি মামলায় বুধবার ভোররাত পর্যন্ত ৮জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ।
গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে দেবহাটা থানার ওসি শেখ ওবায়দুল্লাহ বলেন, নির্বাচনের পর থেকে এপর্যন্ত কুলিয়া ও সখিপুর ইউনিয়নে বেশ কয়েকটি সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এপর্যন্ত দেবহাটা থানায় কুলিয়ার দুটি ও সখিপুরে একটি ঘটনায় মামলা রেকর্ড হয়েছে। এদুটি ইউনিয়ন ছাড়া অপর তিনটি ইউনিয়নের সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। নির্বাচনে জয় পরাজয় থাকবে, কিন্তু তা নিয়ে কোন প্রকার সহিংস ঘটনায় না জড়াতে পুলিশের পক্ষ থেকে বারবার প্রার্থীদের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে। যারা এসব সহিংস ঘটনায় সম্পৃক্ত হবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান ওসি।