দুটি পা নেই, তবুও স্বামলম্বী মন্টু ’অণুপ্রেরণা হতে চান অন্যদের’

0
738

সুমন আহমেদ:

প্রতিবন্ধী মন্টু চন্দ্র শীল। দেহের অর্ধেক হারিয়েছেন দূর্ঘটনায়। তবুও হার মানেনি। আত্মবিশ্বাস ও নিকটজনদের অনুপ্রেরণা ছিল। তাই শত বাধাঁ-বিপত্তী, ঝঁড়-ঝাপটা বাঁধা হতে পারেনি তার। জীবন সংগ্রামে এগিয়ে চলাটাই চ্যালেঞ্জ নেন। তাই সফলও হন। নিজের ভ্যাগ্যের দূর্দিন কাটিয়ে স্বমহিমায় ঘূরে দাড়ান। তাইতো পঙ্গু হয়েও জীবনসঙ্গী পেয়েছেন। হয়েছেন দু’সন্তানের জনকও। খুলনার ফুলতলা উপজেলার অলকা গ্রামে মন্টুর বসবাস। গোবিন্দ চন্দ্র শীলের কনিষ্ঠ পুত্র। সর্বদা ছিলেন মানবসেবায় নিয়োজিত। ছোট-বড় নির্বিশেষে এলাকার প্রিয়ভাজন। সবার প্রয়োজনে আগে ছুটতো সে। বিপদে পাশে দাড়াতো।

অথচ ২০১১’র একটি দূর্ঘটনাই সব কেড়ে নেয় তার। হারাতে হয় দুটি পা। কখনই সমাজের বোঝা হতে চাননি। চাননি মানুষের দান-দয়া। কারণ আত্মভিমানি মন্টু। কিছু একটা করার চিন্তা মাথায় নেন। পুরানো ব্যাটারি চালিত মোটরসাইকেল ক্রয় করেন। স্থানীয় মেকানিকের সহায়তায় সেটি পাল্টে ফেলেন তিন চাকার গাড়িতে। সেখানে পানের স্তূপ রাখার ব্যবস্থা করেন। তারপর ছুটে চলা শুরু। দোকানে দোকানে পান বিক্রি করেন। এজন্য ফুলতলা বাজার থেকে ইস্টার্ন গেট অবধি নিত্যদিনের গন্তব্য তার। সেই থেকে দোকানীরাও দিনে দিনেই পাওনা মিটিয়ে দেন।

১২ আগস্ট। দিনটি ছিল রবিবার । বেলা ততক্ষণে গড়িয়েছে। বৈরী আবহাওয়া বিরাজমান। চলছে অবিরাম বৃষ্টি। দেখা গেল, তিন চাকার গাড়ির ওপরে বসা মন্টুর দেহের পুরাটাই পলিথিনে মোড়ানো। চারপাশের পানের স্তুূপ পলিথিনে ঢাকা। অদম্য মন্টুর এই ছুটে চলা বিগত ছয় বছর থেকেই। রোদ ঝড় বৃষ্টিতে সে থেমে থাকে না। ক্লান্তি-অবসাদ তাকে ছোঁয় না। দু’টি পা হারালেও মন্টুর মনে কষ্ট নেই, আছে ইচ্ছা। এই ইচ্ছা শক্তি দিয়েই সমাজকে বদলে ফেলতে চান। সমাজের অনেকেই সুস্থ-সবল হওয়া স্বত্ত্ওে কর্মহীন আছে, আছে অনেক প্রতিবন্ধীরা। তাই তিনি চান, সমাজ তাকে অনুসরণ করুক। তবেই স্বার্থক হবেন তিনি। এভাবে নিজের কথা বলতে বলতে বারংবারং মুর্ছা যাচ্ছিলেন মন্টু।

পরিবার-পরিজন ও নিকট মানুষের ভালবাসা আর নিজের ইচ্ছা শক্তি আজ প্রতিবন্ধি মন্টুকে স্বাভাবিক জীবনে এনেছেন। তার গল্পে কোন বিষাদের ছাপ নেই। আছে অনুপ্রেরণা। ঘুরে দাড়ানোর অদম্য ইচ্ছা শক্তি। জীবন সংগ্রামে জয়ী মন্টু ছেলে-মেয়ে, সহধর্মীনীকে নিয়ে সুখেই আছেন বলে জানালেন। নিজের গল্প বলে সমাজ বদলাতে চান তিনি। তিনি আরও জানান, ১৯৮৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর জন্ম গ্রহণ করেন। ২০১১ সালের ৪ এপ্রিল হরতাল চলছিল। ভোর ৫টার দিকে একটি ভ্যানের চড়ে শিরোমনি রওয়ানা হন। ফুলতল উপজেলার কাছাকাছি আসতেই বিপরীত দিক থেকে আসা দ্রুত গতির একটি ট্রাক সজোরে আঘাত করে মন্টুর দু’পায়ে। এরপর কোমড় থেকেই দু’টি পা তাকে কেটে ফেলতে হয়। সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজে ৫৬ দিন চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরেন তিনি।

এরপর ছোট এক হুইল চেয়ারে এক বাসাতে সীমাবদ্ধ হয়ে যায় তার জীবন। ১৯৯৮ সালে তিনি এসএসসিতে ১ম শ্রেনীতে উত্তীর্ন হলেও বিএল কলেজে অর্থনীতিতে গ্রাজুয়েশন শেষ করতে পারেননি। লেখাপড়ার পাশাপাশি ভারতে বিভিন্ন প্রদেশে চিকিৎসা সেবার মান ও খরচ সম্পর্কে ধারনা, এমনকি গাইড হয়ে যেতেন। সেই মানুষটিই এখন অসহায়। তার একাকিত্ব ঘোচাতে পাড়া-প্রতিবেশিরা তাকে সময় দিত। কিন্তু মন্টু অন্য ভাইদের মতন পান বিক্রি করবে। ইচ্ছাতে গ্রামের নজু কাকার সহযোগীতায় সে তিন চাকার একটি ব্যাটারী চালিত গাড়ি বানায়। এরপর পান নিয়ে বিভিন্ন দোকানে পাইকারী বিক্রি শুরু করেন। আবারও শুরু হয় মন্টুর জীবন সংগ্রাম। মালা শীল সহধর্মিণী এবং উৎস ও উচ্চশি নামে দুই ছেল মেয়ে। মন্টুর শ্রমে দিব্যি চলছে তাদের সংসার। উল্লেখ্য, তিনি একজন টিআইএন সনদধারী ব্যবসায়ী।