দাকোপে মাদক নির্মূলের আহ্বান সর্বস্তরের মানুষের, অভিযান অব্যাহত

0
889

আজিজুর রহমান,দাকোপ :
খুলনার দাকোপ উপজেলায় মাদক নির্মূলের আহ্বান জানিয়েছে সর্বস্তরের মানুষ। এ দিকে মাদক বিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিন আটক হচ্ছে একাধিক মাদক ব্যবসায়ী।
স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, উপজেলার ৩০টির বেশি স্পটে মাদক কেনাবেচা হয় হরহামেশয়। এরমধ্যে উপজেলার চালনা বাজারের বৌমার গাছতলা, আঁছাভূয়া বাজার, আবুল হোসেন বালিকা বিদ্যালয়ের মাঠে, আশা সমিতির অফিস সংলগ্ন, কাজী পাড়া, নলোপাড়ার কলোনি, পুরাতন চালনা বাজার কলোনি, তুলসির ঘাট, চালনা নদীর পাড়, পৌরসভা গরুহাটখোলা, গফুরের স’মিল, সরকারি গ্যালস স্কুল সংলগ্ন, চুনকুড়ি খেয়াঘাট, লঞ্চঘাট কলোনি, মোহাম্মাদ আলী মাধ্যমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন, পানখালী ফেরিঘাট সংলগ্ন, খলিশা ব্রাক অফিস সংলগ্ন, মমতাজ বেগম স্কুল সংলগ্ন, বটবুনিয়া বাজার, জালিয়াখালী খেয়াঘাট সংলগ্ন, তিলডাঙ্গা, লক্ষ্মীখোলা, মোল্লে বাড়ি খেয়াঘাট, বুনারাবাদ, সুতারখালীর তেলিখালী বাজার, কেওড়াতলা বাজার, নলিয়ান বাজার, কালাবগী, ধৌপাদি বাজার, দাকোপ বাজার, পোদ্দারগঞ্জ ফেরিঘাট সংলগ্ন, বাজুয়া বাজার, খুটাখালী বাজার, বানিশান্তা বাজার, বানিশান্তা পতিতালয়, লাউডোব খেয়াঘাট এলাকায় চলে রমরমা মাদক বিক্রয়।
থানা সুত্রে, মাদক বিরোধী অভিযান চালিয়ে ১৪ দিনে উপজেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে চিহ্নিত ১৩ জন মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীকে আটক করা হয়েছে। ১০ টি মামলায় উদ্ধার করা হয়েছে ২১ পিচ ইয়াবা ও ৩ শত ২৫ গ্রাম গাজাঁ। মোট মাদক মামলার আসামী ১৫ জন। এরমধ্যে ২ জন পলাতক।
মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি ও চিরুনি অভিযান চালিয়ে মাদক নির্মূল করার কথা বলেন কালাবগী গ্রামের সারাফাত হোসেন সবুজ। তিনি বলেন, সরকার ও প্রশাসন যদি দেশপ্রেমিক ও মানবপ্রেমিক হন। মাদকের ভয়াবহ সর্বনাশা ছোবল থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে হলে, সর্বশক্তি দিয়ে সম্মিলিত বাহিনীর মাধ্যমে মাদক বিরোধী অভিযান চালিয়ে মাদক নির্মূল করা সম্ভব।
চালনা বাজারের বাসিন্দা অনুপ বাঁকচি খুলনা টাইমসকে বলেন, মাদক বিরোধী অভিযানে থানা পুলিশের ভূমিকা বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁরা প্রতিদিন যে পরিমান মাদক বিক্রেতা ও সেনবকারী আটক করছে তাতে পরিবর্তন হচ্ছে দাকোপ। র‌্যাবের পাশাপাশি পুলিশের অভিযানকে স্বাগত জানিয়ে তিনি আরও বলেন, চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে মাদক নির্মূল করুন।
প্রশাসনকে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানোর আহবান জানান জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি কানাই মন্ডল। তিনি বলেন, দেশে যে পরিমাণ মাদক ব্যবসায়ী বৃদ্ধি পেয়েছে তাতে ধ্বংস হচ্ছে আমাদের ছাত্রসমাজ। সল্প পঁয়সায় হাতের নাগালে মাদকদ্রব্য পায় যুবসমাজ। এর ফলে সেবন করে ধর্ষণের মত অনৈতিক কাজে লিপ্ত হচ্ছে নেশাগ্রস্থ যুবক-যুবতীরা। তিনি আরও বলেন, তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে অবশ্যই মাদক নির্মূল করতে হবে।
চালনা বাজার চিলড্রেন পার্ক প্রিক্যাডেট স্কুলের অধ্যক্ষ সাগর সেন বলেন, সরকার মাদকের বিরুদ্ধে যে পরিকল্পনা করেছেন তা সত্যি একটা অসাধারণ কাজ। র‌্যাব ও সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের মাদক বিরোধী অভিযানকে সাধুবাদ জানাই। তিনি আরও বলেন, জাতিকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলতে হলে মাকদকে না বলতে হবে। মাদকের সর্বনাশায় মেধাশূন্য হচ্ছে আজকের শিক্ষিত ছাত্রসমাজ।
নেশার আঁধারে দেশ ও জাতিকে ঠেলে দিলেই কার লাভ কার ক্ষতি জানি না। তবে এ আঁধারে সব তলিয়ে যাবে। কেউ কাউকে রক্ষা করতে পারবে না। গত এক বছরে সন্তানের হাতে মা-বাবা খুনের ঘটনা অনেক ঘটেছে। আরো বাড়বে বলে সমাজ ও মনোবিজ্ঞানীদের আঙ্কা। আর কতো ঐশী সৃষ্টি হবে ইয়াবা নেশার আঁধারে?
সরকারের মাদক বিরোধী অভিযানকে অভিনন্দন জানিয়ে সামাজিক সংগঠনের নেতা প্রসেনজিৎ রায় বলেন, মাদকমুক্ত সমাজের জন্য প্রয়োজন মাদক মুক্ত সচেতনতা ও পরিবেশ। সে কাংক্ষিত পরিবেশ সর্বপর্যায়ে সৃষ্টি করতে হবে। দেশ ও জাতিকে মাদক মুক্ত করার দায়িত্ব সরকারের। এটা অবশ্যই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার। উচ্চবিত্তরা মাদক ব্যবসা করে ধনকুবের হবে, আর মধ্যবিত্ত, নিন্মমধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণির মাদকসেবী ও মাদক ক্রেতা হয়ে আঁধারে হারিয়ে যাবে। এ ভয়াবহ খেলা অপরিণামদর্শিতার। সামনে জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচনে জেতার জন্যে ভোট বাড়াতে মাদকের মতো জাতীয় সমস্যা সমাধানে কর্মসূচি ঘোষণা করুন। দলীয় নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে মাদক নির্মূলের সর্বাত্মক প্রচেষ্টার অঙ্গীকার করুন। তিনি আরও বলেন, রাজনীতিবীদদের সিদ্ধান্ত ব্যতিরেখে মাদক নির্মূল অসম্ভব। এটা যদি সর্বাংশে সত্যি হয়, তবে বলবো রাজনীতিকে আগে মাদকমুক্ত করুন। তারপর দেশ ও জাতিকে।
থানা পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মনজুরুল হাসান মাসুদ খুলনা টাইমসকে বলেন, সরকারের নির্দেশে সারা দেশের ন্যায় দাকোপ থানায়ও চলছে মাদক বিরোধী অভিযান। থানা পুলিশ প্রতিদিন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের আটক করে মামলা দায়ের করছে। যতদিন পর্যন্ত মাদক নির্মূল সম্ভব হবে না, ততদিন চলবে এ অভিযান। মাদকের সাথে জড়িত যতবড় রাঘববোলারা আছে তাদের সকল শিকড় ধ্বংস না করা পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলহাজ্ব শেখ আবুল হোসেন খুলনা টাইমসকে বলেন, মাদক নির্মূলে আমাদের ফর্মুলা আছে। সরকার মাদক নিয়ন্ত্রণে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহন করেছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ নয়, নির্মূলে সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে। সরকারের সদিচ্ছা আছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে নৈতিকতার পাঠ-নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। মাদককে না বলার পাঠ থাকছে। আর মাদক নির্মূলে প্রয়োজন ‘শ্যুট অন সাইট’ (দেখামাত্র গুলি করা)। তিনি বলেন, কে আ’লীগ, কে এমপি’র ছেলে, জজ না ব্যারিস্টারের ছেলে- এসব দেখার সুযোগ নেই। এককথায়, মাদক নির্মূলে সঠিক ব্যবস্থা গ্রহন করা। এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে কোনো দিনও মাদক নির্মূল সম্ভব হবে না।
তিনি আরও বলেন, চোখের সামনে একটি দেশ গড়া হলো। সেটি কিছু লোকের কারণে ধ্বংস হয়ে যাবে, এটি সচেতন নাগরিক হিসেবে মেনে নেয়া কঠিন। স্বাধীনতার পর থেকেই আমরা অঙ্গীকার করছি- মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়বো। এখন সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের সঙ্গে মাদককেও হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুদ্ধ করলে, চেষ্টা করলে দেশ ও বিশ্ব থেকে একদিন না একদিন জঙ্গিবাদ দমন হয়ে যাবে। কিন্তু মাদক? মাদকের ক্ষেত্রে সমূলে নির্মূল না করা গেলে সম্ভব নয়। শুধু অঙ্গীকার করলেই মাদক নির্মূল হয় না। নিরাময় কেন্দ্র গড়েনও মাদক নির্মূল সম্ভব হবে না। যদি আ’লীগ সরকার জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কঠোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করত। চালনা বাজার দেশী মদের আফগারীর বিষয়ে চেয়ারম্যান বলেন, আফগারীটি স্থানান্তর করার কথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সভায় উত্থান করি। কিন্তু কোনোভাবে স্থানান্তর করছে না। মালিকের খুটির জোর অনেকদূরে, এর সাথে অনেক রাঘববোয়ালরা জড়িত আছে। যে জন্য এ অবৈধ আফগারীটি কোনমতে বন্ধ হচ্ছে না।