দাকোপে ফেরীঘাটে টোল আদায়ে ব্যাপক অনিয়ম, অভিযোগে জরিমানা

0
864
All-focus

আজিজুর রহমান,দাকোপ :
খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী ও পোদ্দারগঞ্জ ফেরীঘাটের টোল আদায়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। খেয়া পারাপারে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে জরিমানা আদায় করেন ভ্রাম্যমান আদালত।

জানা গেছে, উপজেলার মাঠ জুড়ে সবুজ সোনার ফসল তরমুজ চাষ করা হয়। এসব খেতের তরমুজ বিক্রি যোগ্য হলে খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোরসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পরিবহন আসে এবং বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে তরমুজ বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু বহিরাগত পরিবহনের চালকের নিকট থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে থাকে খেয়াঘাট কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ করে গাড়িচালকেরা বলেন, পোদ্দারগঞ্জ ফেরীঘাট পারাপার হতে ফেরীতে লাগে ১ হাজার ৩ শত টাকা এবং খেয়াঘাটে দিতে হয় ৪ শত টাকা। একই নিয়মে পানখালী ফেরীঘাটেও অতিরিক্ত টাকা আদায় করে খেয়াঘাট কর্তৃপক্ষ।
আরও জানা যায়, পোদ্দারগঞ্জ খেয়াঘাটে পারাপারের জন ১টি খেয়ার ট্রলার ও ১টি জোলদির ট্রলার আছে। খেয়ার নৌকায় এক পার হতে অন্য পারে পার করতে, জনপ্রতি তিন টাকা, মোটর সাইকেলে ১৫ টাকা, ঔষধের কার্টুনে ১৫ টাকা, বাইসাইকেলে ১০ টাকা, ফ্রিজে ২০০ টাকা, পানির ট্যাংকিতে ২০০ টাকা, টেলিভিশনে ৫০ টাকা, ঢেই টিনে ২০০ টাকা (এক বাণ), এক বস্তা চাউলে ২০ টাকা নেয়।

গত শনিবার পোদ্দারগঞ্জ খেয়াঘাটে গিয়ে জানা যায় একে ট্রের্ডাস নামে ঘাটটি ইজারা নেয় ২০১৮ সালের মার্চে। ঘাটের আশপাশে টোল আদায়ের তালিকা টানানো দেখা যায়নি। ঘাটে নামা-ওঠার রাস্তাটি বেহাল দশা। রাস্তায় আটকে পড়তে দেখা যায় তরমুজ ভরতি ট্রাক। সেখানে কথা হয় তরমুজবাহি ট্রাক চালক কাঞ্চন শিকদারের সাথে। তিনি জানায়, বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে গাড়ি চালায়। ফেরী পারাপারে সর্বোচ্চ ২ শত থেকে ৩শত টাকা দিয়ে থাকি। কিন্তু এখানে অনেক বেশি টাকা দিতে হচ্ছে।
ট্রাক চালক মিজানুর রহমান, মোঃ হোসেন, কামরুল ইসলাম, উজ্জ্বল বৈদ্যসহ অন্তত ১২ জন চালক বলেন, ১ হাজার ৩ শত টাকা ফেরীতে ও ৩ শত টাকা দু’টি ঘাটে দিয়ে গাড়ি পার করতে হচ্ছে। ঘাট কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাইলে তারা বলে নির্ধারিত টাকা দিয়ে পার হতে হবে। তা না হলে পার হওয়ার দরকার নেই। তারা আরও বলেন, এতে আমাদের ক্ষতি হচ্ছে। আমরা আগামীতে তরমুজ নিতে আর আসবো না।

এদিকে স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ ফেরী এবং খেয়াঘাটে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের ফলে তরমুজ বিক্রি করতে পারছি না। কারণ বাহিরের গাড়ি আসতে চাচ্ছে না। গাড়ি ভাড়া ও শ্রমিকের মুজুরি বেশি হওয়ায় তরমুজের বেপারীরা হিমশিম খাচ্ছে।

জোলদি নৌকায় পার হয়ে আসেন লিটন মন্ডল। তিনি জানান, একটি মোটরসাইকেল পার করতে লেগেছে ২৫ টাকা। তিনি আরও জানান, খেয়ার ট্রলার এক পার হতে অন্য পারে গেলে অনেক সময় দেরী করে এবং ইচ্ছামত পারাপার করে। সেজন্য জোলদিতে বেশি টাকা দিয়ে পার হতে হয়েছে।

স্থানীয়দের সাথে কথা হলে তারা বলেন, ঘাট মালিকের কর্মচারীরা ইচ্ছামত টাকা নিয়ে থাকে। টোল আদায়ের তালিকা দেখতে চাইলে কর্তৃপক্ষ বলে যা চেয়েছি তাই দিতে হবে। না হলে খেয়ায় পারাপার হওয়া লাগবে না। ফলে আমাদের পারাপারে চরম দূর্ভোগ পোহাতে হয়। তারা আরও বলেন, খেয়ার ট্রলার দেরি করে এক পার হতে অন্য পারে আসে। এর মাঝে জোলদির ট্রলার ব্যবহার করে বেশি টাকা নেয়।
এ বিষয়ে খেয়াঘাটের টাকা আদায়কারী ওলিয়ার শেখ বলেন, আমরা যাত্রীদের কাছ থেকে নিয়মানুযায়ী টাকা নিয়ে থাকি। টোল আদায়ে তালিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেটি টানানো নেই। কেনো নেই বা দেখতে চাইলে ঘাট কর্তৃপক্ষ কোনো উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যায়।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিস সুত্রে, যে সকল যাত্রীরা খেয়ার ট্রলারে পারাপর হয় তারা শুধু খেয়ার ট্রলারে অথবা খেয়াঘাটে অর্থাৎ দু’টির যে কোনো একটি জায়গায় টাকা দেওয়া লাগবে। তবে যাত্রীর সাথে ২০ কেজি ওজনের বেশি কোনো পন্যদ্রব্য থাকলে টোল আদায়ের তালিকা অনুযায়ী টাকা দিতে হবে। সুত্রে আরও জানান, ফেরীতে গাড়ি বা অন্য কিছু পারাপার করা হলে, পারাপারের টাকা ফেরী কর্তৃপক্ষ গাড়ি প্রতি ১ শত ৬০ টাকা আদায় করতে পারে। এছাড়া ফেরীতে পারাপার হলে খেয়াঘাটে কোনো টাকা দেওয়া লাগেনা। ফেরী এবং খেয়ায় সম্পর্ক সস্পূর্ণ পৃথক।

অতিরিক্ত টাকা আদায়ের বিষয় ফেরী চালক আমজেদ সরদারের কাছে জানতে চাইলে। তিনি জানান, আমাকে অর্ডার করলে ফেরী চালু করি আবার অর্ডার করলে বন্ধ করি। টাকা আদায়ের বিষয় আমি কিছু জানি না।
পোদ্দারগঞ্জ ফেরীর ঠিকাদার ফারুখ হোসেনের কাছে মুঠোফোনে জানতে চাইলে। তিনি বলেন, সারা বছরে দুই একটি গাড়ি পারাপার হয়। অধিকাংশ সময় সরকারি গাড়ি পার হয়। যা সম্পূর্ণ ফ্রি, পারাপারের কোনো পয়সা দেয় না। এছাড়া স্থানীয় নেতাদের গাড়ি পার করতে হয় ফ্রি। সবমিলে বছর ধরে লোকসান নিয়ে থাকতে হয় ফেরীতে। এজন্য তরমুজের মৌসুমে বেশি টাকা আদায় করে ফেরী ডাকের টাকা তুলতে হয়।

পোদ্দারগঞ্জ ঘাটে অতিরিক্ত টোল আদায়ের অভিযোগে গত রোববার (৬ মে) সকাল বেলা ১২টায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মারুফুল আলম।
নির্বাহী কর্মকর্তার অফিস সুত্রে জানা যায়, ১৮৮৫ সালের ২৩, ২৪ ও ২৫ ধারায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ঘাটকর্তৃপক্ষের নিকট থেকে নগত ৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
আরও জানা যায়, নির্বাহী কর্মকর্তার উপস্থিতি টের পেয়ে ঘাটের টাকা আদায়কারী ওলিয়ার শেখ(৩৪) পালিয়ে যায় এবং মোঃ এমদাদুল হক(২৭) নামে এক যুবককে হাতেনাতে আটক করে থানা পুলিশ।

এদিকে পানখালী ফেরীঘাট ও পোদ্দারগঞ্জ ফেরীঘাট উপজেলার জনগনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দু’টি ঘাট। ঝঁপঝপিয়া নদীতে পানখালী ঘাট অবস্থিত। এ নদী পার হয়ে উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মানুষ জেলা শহরে চিকিৎসাসহ সকল ধরেণ সেবা নিতে যায়। পশুর নদীতে পোদ্দারগঞ্জ ঘাঠ অবস্থিত। এ নদী পার হয়ে উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের মানুষ উপজেলা সদরে চিকিৎসাসহ সকল ধরণের সেবা নিতে আসে। এছাড়া উপজেলাতে যা কিছু আনায়ন করা হয়, তার সব কিছু পারাপার করতে হয় এ দু’টি ঘাট দিয়ে। ঘাটে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের প্রতিবাদে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয়রা বলেন প্রশাসন সঠিক নজরদারী করে না।