দাকোপে গরমের হাওয়া না আসতেই সুপেয় পানির চরম সংকট!

0
636

আজিজুর রহমান,দাকোপ :
গরমের হাওয়া না আসতেই সুপেয় পানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে খুলনার দাকোপ উপজেলায়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়ছে পানির ব্যবহার, দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে পুকুরের পানি।
সরেজমিনে উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন এবং পৌরসভা ঘুরে দেখা যায়, উপজেলা জুড়ে সুপেয় পানির চরম সংকট চলছে। অনেকের বাড়ীতে দৈনিকের ধোয়া-মোছার পানি থাকলেও পান করার জন্য সুপেয় পানি সংগ্রহ করতে হয় অনেক দূর থেকে। ভূগর্ভস্থ্য পানিতে লবণ, আর্সেনিক এবং আয়রণ বেশী থাকায় গভীর ও অগভীর নলকুপের পানি পানের অনুপযোগী তাই জংগল কেটে আবাস স্থল বানানোর সময় থেকে আজ অবধি শতাধীক বছর ধরে এ এলাকার মানুষের সুপেয় পানি প্রাপ্তির প্রধান উৎস হল পুকুর। দিনবদলের সাথে সাথে পুকুরগুলোর আকৃতি প্রকৃতি যেমন বদলেছে তেমনি বহুদিন খনন না করায় অনেক পুকুরের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়েছে।
জানা গেছে, দিনে দিনে বাড়ছে জনসংখ্যা, বাড়ছে মানুষ ও অন্যান্য গৃহপালিত পশুর পানির ব্যবহার ফলে সুপেয় পানির সংকট এ এলাকার মানুষের জন্য দৈনন্দিন সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। সুপেয় পানির সংকট নিরসনে দীর্ঘদিন ধরে জিও এবং এনজিও পর্যায়ে কাজ চললেও এখনও পর্যন্ত এ অভাব দূর করা সম্ভব হয়নি। এর প্রধান কারণ হলো স্থানভেদে সঠিক পরিকল্পনার অভাব, প্রয়োজনের তুলনায় সম্পদের স্বল্পতা, জিও এনজিওদের কাজে সমন্বয়ের ও জবাবদিহিতার অভাব, মনিটরিং ও পরিচর্যার অভাব। এছাড়াও সিডর ও আইলার মত ঘূর্ণিঝড়ে অনেক পুকুর নষ্ট হয়ে গেছে।
সুত্রমতে, উপজেলায় সুপেয় পানির সরকারি পুকুর ৪০টি ব্যক্তিগত ২৮৪টি অর্থাৎ সুপেয় পানির পুকুর রয়েছে ৩২৪টি। এরমধ্যে ২৭টি পুকুরের পাড় উচু ও দূর্যোগ সহনশীল কিন্তু বাকি ২৯৭টি পুকুর দূর্যোগ সহনশীল নয়। মাত্র কয়েকদিন বৃষ্টি হলে অথবা ওয়াপদার রাস্তা দিয়ে পানি ওভার ফ্লো হলে পুকুরগুলো প্লাবিত হয়ে পানি দূষিত হয়ে পড়ে।
একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সুত্রে, সুপেয় পানির বর্তমান অবস্থা-মোট ৮৯টি খাবার পানির পুকুরের মধ্যে ৯টির ৩০ফুট সিমানার মধ্যে গরু-ছাগলের গোয়াল ঘর এবং ল্যাট্রিন রয়েছে। ৫১০ টি অগভীর নলকুপের মাত্র ৪৬ শতাংশ কার্যকর। ৫৯.৪ শতাংশ পরিবারের খাবার পানি সংগ্রহ করতে দুরত্বের কারনে ৩০ মিনিটের বেশী সময় ব্যয় হয়।
আরও জানা গেছে, কামারখোলা ও সুতারখালী ইউনিয়নের কিছু কিছু এলাকায় ৭ থেকে ৮ কিলোমিটার দূর থেকে ট্রলারে করে পানি নিয়ে আসতে হয় সেখানে সময় লেগে যায় প্রায় অর্ধদিবস। ৮৫ শতাংশ এর বেশী পরিবার শুকনো মৌসুমে বৃষ্টির পানির পরিবর্তে পুকুরের পানি পান করে থাকে। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বড় ট্যাংকির অভাবে অনেক পরিবার সারা বছর খাবার জন্য বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে পারে না।
উপজেলার সুতারখালী গ্রামের আব্দুল্লা গাজী বলেন, সুপেও পানির প্রয়োজন অনুযায়ী পুকুরের অভাব আবার পুকুর থেকে পিএসএফ এবং অন্যান্য যে সিস্টেম রয়েছে সেগুলি অধিকাংশই নষ্ট। রেইন হার্ভেষ্টিং- সিস্টেম যতগুলো দরকার ততগুলো নেই।
বাড়ি হতে ৭কিমি পাথ পায়ে হেটে খাওয়ার পানির নিয়ে আসে কালাবগী গ্রামের আছমা বেগম। তিনি জানায়, গভীর ও অগভীর নলকুপ এ এলাকাতে কার্যকর নয়। এর পানি দিয়ে ধোয়া-মোছার কাজ ছাড়া পান করা যায় না। ফলে পানির অভাব থেকেই যাচ্ছে।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সুত্রে, উপজেলাতে মোট নলকুপের সংখ্যা ২৬২১টি, তারমধ্যে সচল রয়েছে ২১৫৫টি, অকেজো অবস্থায় রয়েছে ৪৬৬টি। এরমধ্যে অগভীর সচল নলকুপ ২২৮টি, অকেজো ২৮২টি। গভীর সচল নলকুপ রয়েছে ২টি এবং অকেজো রয়েছে ২৩টি। রেইন ওয়াটার হার্ভেষ্টিং সিস্টেম চালু রয়েছে ৬৭৬টি। পিএসএফ চালু রয়েছে ৪০৮টি, অকেজো ১১৩টি। প্রকল্পের মাধ্যমে সম্প্রতি ১০টি পুকুর সংস্কারের (পূর্ণ খনন) কার্যক্রম চলছে।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকার অন্তত ৩০ জনের সাথে কথা বলে জানা যায়, এ অঞ্চলের পানির অভাব পূরন করতে হলে প্রতি ওয়ার্ডে জনসংখ্যা হিসাবে সুপেয় পানির পুকুর খনন করা এবং প্রয়োজন মত রেইন ওয়াটার হার্ভেষ্টিং-এর ব্যবস্থা করা। সর্বোপরি প্রতি ইউনিয়নের বিশেষ বিশেষ স্থানে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন করার দরকার।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশল মিলন ফকির বলেন, এ এলাকামূলত লবণাক্ত অঞ্চাল হওয়ায় সুপেয় পানির অভাব। পানযোগ্য পানির জন্য আমরা পুকুর খনন, ট্যাংকিতে বৃষ্টির পানি ধারণ ও ওয়াটার অসমোসের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানির প্ল্যান্ট তৈরী করে, জনগনকে বিশদ্ধ পানি পানের ব্যবস্থা করলে উপজেলাতে পানির অভাব দূর করা সম্ভব হবে।