দস্যু সমর্পণের মধ্যস্থতায় সাংবাদিক সোহাগ দেওয়ান : র‌্যাবের সন্মাননা

0
689

নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনাটাইমস:
একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে সবসময় সংবাদের পেছনে ছুটে সোহাগ দেওয়ান। খুলনার এই সংবাদকর্মীর সঙ্গেই যোগাযোগ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করলেন ৫৭ জন দস্যু।

তবে এই প্রক্রিয়াটি সহজ ছিল না। এ নিয়ে শুরু থেকেই সন্দেহ অবিশ্বাসের দোলাচালে থাকতে হয় এই সংবাদ কর্মীকে। কেউ তাকে ফাঁদে ফেলছে কি না, এটাও নিশ্চিত হতে হয়েছে।

একজন অচেনা মানুষের কাছ থেকে ফোন পেয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সুন্দরবনে যেতে হয়েছে সোহাগকে। এরপর সেখান থেকে ফিরে র‌্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আর দস্যুদের চাওয়া অনুযায়ী একটি বেসরকারি টেলিভিশনকেও যুক্ত করেন এই প্রক্রিয়ায়।

 

 

সব মিলিয়ে দুই মাসের বেশি সময় লেগেছে গোটা প্রক্রিয়ায়। অবশেষে গত ২৩ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে স্বাভাবিক জীবনের ফেরার প্রক্রিয়া শুরু করলেন ওই ৫৭ দস্যু।

কীভাবে এটি সম্ভব হলো? সোহাগ বলেন, ‘কখনও ভাবিনি গহীন সুন্দরবনের অভ্যন্তরে দুর্র্ধষ বনদস্যুদের কাছাকাছি গিয়ে তাদের সঙ্গে সন্ধি করতে পারব। তবুও কৌতুহল পিছু ছাড়েনি আমার।’

‘দিনটি ছিল চলতি বছরের মার্চ মাসের মাঝামাঝি। একজন ব্যক্তি আমাকে ফোন করে বললেন সুন্দরবনের বনদস্যু দাদাভাই ওরফে রাজন বাহিনী আত্মসমর্পণ করবে, আপনার সহযোগিতা চায় তারা।’

‘আমি প্রথমে অবাক হয়ে লোকটির কথা শুনছিলাম। কিছুক্ষণ চুপ থেকে তাকে বললাম, ভাই ফোনে সব কিছু ভালোভাবে বুঝতে পারছি না, আপনি সরাসরি আমার সাথে দেখা করেন’-বলছিলেন সোহাগ দেওয়ান।

 

‘কথা মতো দুই দিন পর তিনি এলেন আমার সাথে দেখা করতে। কথা হলো তার সঙ্গে। তখন বুঝতে পারছিলাম আমার সামনে বড় ধরনের একটি চ্যালেঞ্জ এসেছে। লোকটি আমাকে বললেন, বনদস্যুরা সাংবাদিকের উপস্থিতি ছাড়া আত্মসমর্পণে সাহস পাচ্ছে না। তাদের মধ্যে ভয়, যদি তাদেরকে মেরে ফেলে প্রশাসন। তার কথা শুনে বিদায় নিলাম, বললাম হ্যাঁ আমি পারব, তবে দুই/ তিন দিন সময় চাইলাম।’

কীভাবে এই সমঝোতা হলো, সেটিও জানান সোহাগ। বলেন, ‘আমি বিষয়টি নিয়ে প্রথমে পরিচিত র‌্যাব-৬ এর স্পেশাল কোম্পানির ডিএডি জিয়াউল করিমের সাথে। তিনি প্রথমবারেই আমার আরও সাহস বাড়িয়ে দিলেন। তিনি এবিষয়টি নিয়ে সিনিয়র ডিএডি কামরুল ইসলামও আমাকে সাথে নিয়ে স্পেশাল কোম্পানি কমান্ডার এনায়েত হোসেন মান্নানের সাথে আলোচনা করেন। এরপর বিষয়টি নিয়ে পর্যায়ক্রমে র‌্যাব-৬ এর অধিনায়ক খোন্দকার রফিকুল ইসলামের সাথে আলোচনা হয়।’

‘সকলেই এই উদ্যোগের জন্য সাহস যুগিয়েছেন এবং সামনে এগিয়ে যেতে পরামর্শ দেন। এরপর যোগাযোগ শুরু করি সুন্দরবনের বনদস্যু দাদাভাই ওরফে রাজন বাহিনীর প্রধান জয়নাল আবেদীন ওরফে রাজনের সাথে। প্রতিদিন একবার তার সাথে মোবাইল ফোনে কথা হতো।’

সোহাগ জানান, ২ এপ্রিল সুন্দরবনের গহীনে দাদাভাই বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি দেখা করতে রওয়ানা হন তিনি। একটি ট্রলারে করে সুন্দরবনের আড়পাঙ্গাসিয়া নদীতে পৌঁছেন ১৩ ঘণ্টা পর। সঙ্গে ছিলেন সেই মানুষটি যিনি তাকে এ কাজে আসার জন্য ফোন করেছিলেন।

‘অবশেষে সুন্দরবনের একটি সরু খালের ভেতরে ট্রলারটি প্রবেশ করানো হয়। তখন থেকে আমার মধ্যে ভয় ও নানা ধরণের আজে-বাজে চিন্তা ভর করে।’

 

 

আধঘণ্টা পর খালের ভেতরে একটি ছোট ডিঙ্গি নৌকা নজরে আসে সোহাগের। মনে হচ্ছিল মাছ ধরা জেলে। সামনে আসতেই দুই জন হাফপ্যান্ট পরিহিত লোক হাতে বন্দুকসহ দেখতে চান। কোমরে ছিল বেল্টওয়ালা ছোট ব্যাগ।

সোহাগ আঁচ করলেন, এরা বনদস্যু। তারাই সালাম দিলেন তাকে। কুশল বিনিময় শেষে ট্রলার ও ডিঙ্গি নৌকা আরও ১০ মিনিট সামনে এগোনোর পর আরও একটি ট্রলার আসে। তাতেও বেশ কয়েকজন মানুষ ছিল।

এরপর বেরিয়ে আসেন বাহিনী প্রধান জয়নাল আবেদীন ওরফে রাজন ওরফে দাদাভাই, বাহিনীর দ্বিতীয় প্রধান জাকির হোসেনসহ ১০/১২ জন অস্ত্রধারী।

সেখানে আপেল, আঙ্গুর ও বোতলজাত পানি দিয়ে আপ্যায়ন করে দস্যুরা। গহীন বনে কীভাবে এসব পাওয়া সম্ভব জানতে চান সোহাগ।

বাহিনী প্রধান রাজন বলেন, ‘আমরা টাকা দিলে শহর থেকে সব কিছু চলে আসে। আমাদের এক লাখ টাকায় ৪০ হাজার টাকার মালামাল পাই। ৬০ হাজার টাকা বহনকারীসহ অন্যান্যরা খায়, তাতেও আমার খুশি।’

এরপর শুরু হয় আলোচনা। দস্যুরা জানান, তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান। সেখানে ছয় ঘণ্টা কাটিয়ে ফিরে আসেন খুলনা। এরপর সোহাগ আবার যান র‌্যাব-৬ এর স্পেশাল কমান্ডার এনায়েত হোসেন মান্নানের কাছে।

 

 

সোহাগ অনলাইন নিউজপোর্টাল ঢাকাটাইমসের পাশাপাশি স্থানীয় একটি দৈনিকেও কাজ করেন। একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সহযোগিতাও চান তিনি। যোগাযোগ করেন নিউজ টোয়েন্টিফোরের খুলনা অফিসের প্রধান সামছুজ্জামান শাহীনের কাছে। শাহীন তাদের ঢাকা অফিসে কথা বলেন। চ্যানেলটির প্রধান ও বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার সম্পাদক নঈম নিজাম জানান, তাদের চ্যানেল এ উদ্যোগের সঙ্গে থাকবে। এ

চ্যানেলটি তার অনুসন্ধানী দল ‘টিম আন্ডারকাভার’ এর উপস্থাপক আশিকুর রহমান শ্রাবণের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেয় সোহাগ দেওয়ানের সঙ্গে। ৬ দার দলের চার সদস্যসহ যান খুলনায়।

এরপর ৮ এপ্রিল আবার সুন্দরবন যাত্রা করেন সোহাগ দেওয়ান। সঙ্গে নিউজ টোয়েন্টিফোরের দল। বনে গিয়ে আমীর আলী ও হান্নান বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে লক্ষ্যে পৌঁছান।

এরপর সেখান থেকে ফিরে আবার র‌্যাবের সঙ্গে কথা বলেন সোহাগ। জানান, সবাই আত্মসমর্পণের জন্য প্রস্তুত। স্থানীয় র‌্যাব কর্মকর্তারা এরপর যোগাযোগ করেন সদরদপ্তরে। আর সেখান থেকে তারিখ দেয়া হয় ২৩ মে।

সোহাগ বলেন, ‘আগের দিন সকাল ১১টায় রওয়ানা করে দুপুরে আবার সুন্দরবনে পৌঁছাই। তারাও কিছুটা এগিয়ে আসে। চাঁদপাই রেঞ্জের হারবাড়িয়া এলাকায় তাদের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হয়।’

এরপর র‌্যাযাব-৬ এর একটি নৌযানে করে ৫৭ দস্যুকে অস্ত্রসহ নিয়ে আসা হয় খুলনা শহরে। রাতে এরা র‌্যাব হেফাজতেই ছিলেন।

বুধবার সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে অস্ত্র সমর্পণ করেন জনদস্যুরা।

সোহাগ বলেন, ‘প্রথমে ভয় লাগছিল। আসলে ওদের সঙ্গে কথা বলার পর বুঝলাম, ভয় আসলে তাদের। নানা কারণে তারা সুন্দরবনে যান। এর পেছনেও নানা নির্যাতন-নিপীড়নের কাহিনি আছে। তাই চিন্তা করলাম, এদেরকে সহযোগিতা করব।’

সাংবাদিক সোহাগ দেওয়ানকে র‌্যাবের সম্মাননা:
সুন্দরবনে বনদস্যুদের আত্মসমর্পণ করতে মধ্যস্থতা ও সহায়তা করায় সাংবাদিক সোহাগ দেওয়ানকে সম্মাননা স্মারক দিয়েছে র‌্যাব। গত ২৪ মে দুপুর সাড়ে ১২টায় র‌্যাব-৬ সদর দপ্তরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিক সোহাগ দেওয়ানকে এ সম্মাননা দেয়া হয়। অনুষ্ঠানে নিউজ টোয়েন্টি ফোর টেলিভিশনের টিম আন্ডার কাভারের আশিকুর রহমান শ্রাবনকেও সম্মাননা দেয়া হয়।

 

 

এসময় উপস্থিত ছিলেন, র‌্যাব-৬ এর অধিনায়ক খোন্দকার রফিকুল ইসলাম, উপ অধিনায়ক মেজর মো. মনির আহমেদ, স্পেশাল কোম্পানী কমান্ডার এনায়েত হোসেন মান্নান, এডজুডেন্ট সিনিয়র এএসপি মো. নূরুজ্জামান, সিনিয়র ডিএডি কামরুল ইসলাম, ডিএডি জিয়াউল করিমসহ অন্যান্য কর্মকর্তাবৃন্দ।