থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে

0
414

কামরুল হোসেন মনি:
শিশুকন্যা জান্নাতিন বয়স এক বছর। ৪ মাস বয়সে এর রক্তে ধরা পড়ে থ্যালাসেমিয়া রোগ। সেই থেকে তাকে প্রতিমাসে এক ব্যাগ রক্ত দেওয়া হচ্ছে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রক্ত সঞ্চালন না করলে তার পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব হয়ে না। শিশুটির মা লিমা বেগম জানান, তারা স্বামী-স্ত্রী দুইজনই এই জীবাণু বহন করায় তার শিশুকন্যা এ রোগে আক্রান্ত। কিন্তু তাদের এ রোগ নেই। শিশুকন্যাকে সদর হাসপাতালে রক্ত সঞ্চালন দিতে আসলে এই প্রতিবেদকের সাথে কথা হয়।
নগরীর সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সূত্র মতে, এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। চলতি মাসে ২১ মে পর্যন্ত ৫০ জন থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত ব্যক্তি রক্ত সঞ্চালন করতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ হিসেবে গড়ে ২ জনের বেশি থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তের হিসাব পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগে ওই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কোনো পরিসংখ্যান নেই।
খুলনা সদর হাসপাতালে নবজাতক ও শিশু বিশেষজ্ঞ ডাঃ মোঃ শরাফাত হোসাইন বলেন, মামাতো-খালাতো ভাই-বোনদের সাথে বিয়ে হলে এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। শিশু বা কোনো ব্যক্তিদের শরীর ফ্যাকাসে হয়ে গা সাদা হয়ে যায়, শারীরিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়া, জন্ডিস হলে আর সারতে চায় না ইত্যাদি থ্যালাসেমিয়া রোগের লক্ষণ। থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা বলতে রক্ত পরিসঞ্চালন। আর মাঝে মাঝে অতিরিক্ত পরিসঞ্চালনজনিত আয়রন উদ্ধৃতি ঠেকাতে আয়রন চিলেশন থেরাপী, সাধারণত ডেসফেরিঅক্সামিন দেওয়া হয়। ওষুধের চিকিৎসা বলতে এটুকুই। প্লীহা বড় হয়ে গেলে অপারেশন করে সেটা ছোট করে দেওয়া হয়। এতে রক্তগ্রহণের হারটা কমে আসে কিছুটা। মূলত বোন ম্যারো প্রতিস্থাপন হলো এর স্থায়ী চিকিৎসা। এটা খুবই ব্যয়বহুল। দেশের বাইরে বোন ম্যারো প্রতিস্থাপনে খরচ পড়ে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা। এছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তিকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রক্ত দেওয়া লাগবে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে ৩ থেকে ৫ সপ্তাহ এর মধ্যে রক্ত দেওয়া লাগে।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ইনচার্জ সিনিয়র স্টাফ নার্স নিলুফা ইয়াসমিন জানান, বিগত বছরের তুলনায় থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। প্রতিদিন কোনো না কোনো জায়গা থেকে ওই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা রক্ত সঞ্চালন করার জন্য আসছেন।
খুলনা সদর হাসপাতালে জরুরি বিভাগের রেজিস্ট্রি খাতায় অন্তর্ভুক্ত চলতি বছরের ১ মে থেকে ২১ মে পর্যন্ত মে পর্যন্ত থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়ে রক্ত সঞ্চালন করেছেন এমন রোগীর সংখ্যা ৫০ জন। এর মধ্যে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রক্ত সঞ্চালন করার জন্য ভর্তি হয়ে চিকিৎসা সেবা নিয়েছেন। এর মধ্যে ১ মে ১ জন, ৩ মে ৪ জন, ৬ মে ৩ জন, ৭ মে ১ জন, ৮ মে ৮ জন, ৯ মে ৪ জন, ১০ মে ২ জন, ১২ মে ৪ জন, ১৩ মে ১১ জন, ১৪ মে ৪ জন, ১৬ মে ৩ জন, ১৭ মে ২ জন, ১৯ মে ও ২০ মে ১ জন করে এবং ২১ মে ৩ জন ভর্তি হয়ে রক্ত সঞ্চালন করানো হয়। আক্রান্ত ব্যক্তিদের বয়স ২ মাস থেকে বয়স্করা পর্যন্ত রক্ত সঞ্চালন করেছেন।
থ্যালাসেমিয়ায় কি হয় :
রক্তের লোহিত কণিকার আয়ুষ্কাল তিন মাস। লোহিত কণিকা অস্থিমজ্জায় অনবরত তৈরি হচ্ছে এবং তিন মাস শেষ হলেই প্লীহা এ লোহিত কণিকাকে রক্ত থেকে সরিয়ে নিচ্ছে। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীর লোহিত কণিকার আয়ুষ্কাল অনেক কমে যায়। তাদের হিমোগ্লোবিন ঠিকমতো তৈরি না হওয়ায় লোহিত কণিকাগুলো সহজেই ভেঙে যায় এবং অস্থিমজ্জার পক্ষে একই হারে লোহিত কণিকা তৈরি সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফলে একদিকে যেমন রক্তশূন্যতা সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে প্লীহা আয়তনে বড় হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত আয়রন জমা হয়ে হৃদপি-, প্যানক্রিয়াস, যকৃত, অ-কোষ ইত্যাদি অঙ্গের কার্যক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়।