তামাক নিয়ন্ত্রনে প্রধানমন্ত্রীর যুগান্তকারী ঘোষনার বাস্তবায়ন প্রয়োজন

0
675

তামাকজনিত রোগে মৃতৃুর সংখ্যা ম্যালেরিয়া,যক্ষা এবং এইচআইভি/এইডস এর সম্মিলিত মৃর্ত্যুর চাইতেও বেশী। গত শতকে তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ১০ কোটি মানুষ মারা যায় যা প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সম্মিলিত মৃর্তুর চাইতেও বেশী। বাংলাদেশে প্রতি বছর যত মানুষ মারা যায় তার ৬০% বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে মারা যায়। অসংক্রামক রোগের অন্যতম প্রধান কারন ধূমপান,পরোক্ষ ধূমপান ও তামাক ব্যবহার। তামাক উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সেবন Ñ সব প্রক্রিয়াতেই জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তামাক একটি বহুমাত্রিক ক্ষতিকর ও আগ্রাসী পণ্য। তামাক সেবন বিশ্বব্যাপী প্রতিরোধযোগ্য মুত্যর প্রধান কারণ। বছরে ৬০ লক্ষ মানুষ তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনেক বছর আগেই তামাকজনিত মৃত্যুকে মহামারী হিসাবে ঘোষণা দিয়েছে। কারণ, তামাকজনিত মৃত্যু ম্যালেরিয়া, যক্ষা, এইচআইডিভ/এইডস এর সম্মিলিত মৃত্যুর চাইতেও বেশি। প্রতি ১০টি মৃত্যুর মধ্যে ১ জনের মৃত্যুর জন্য সরাসরি দায়ী তামাক সেবন।রূপকল্প ২০২১ অনুযায়ী বাংলাদেশের সার্বিক উন্নতি সুনিশ্চিত করতে সুস্থ ও দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন। সে আলোকে সরকার ২০১৬-২০২০ মেয়াদী সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় অসংক্রামক রোগ ও তামাক নিয়ন্ত্রণকে অন্তর্ভূক্ত করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দক্ষিণ এশিয়ান স্পিকার সম্মেলনে ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে তামাকমুক্ত করার যুগান্তকারী ঘোষনা দিয়েছেন।

অর্থনীতিতে তামাকের প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচক। তামাক চাষ কৃষি জমির উর্বরতা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থের উপর নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে। ২০০৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, জিডিপির ৩% তামাকের কারণে অপচয় হয়। এছাড়া সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব আয় করে সবরকম তামাকজাত পণ্য থেকে, তার দ্বিগুণের বেশি অর্থ তামাকজনিত রোগের চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় করতে হয়। এছাড়া তামাক পাতা প্রক্রিয়াজাত করতে নির্বিচারে বৃক্ষনিধন হয়। ১৯৯৯ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ বৃক্ষ কেটে ফেলা হয়, তার ৩০% চুল্লীতে তামাক পাতা প্রক্রিয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া তামাক চাষ ও প্রক্রিয়াজাত করতে শিশু ও নারীদের নিয়োগ করা হয়। এ সময় শিশুরা লেখাপড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। চুল্লীতে দীর্ঘসময় প্রক্রিয়াজাত কাজে সম্পৃক্ত থাকার ফলে নারীদের মধ্যে নানাবিধ স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়।

আর এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ বছরের বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবসের (৩১ মে ২০১৮) প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ’তামাক করে হৃৎপিন্ডের ক্ষয়! স্বা¯্য’কে ভালবাসি,তামাককে নয়’। বৈশ্বিক তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে এ দিবসের গুরুত্ব অনেক। তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে জোরালো করতে ১৯৮৭ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে বছরের একটি দিন বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস হিসাবে উদযাপন করার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। প্রথম বছর ১৯৮৮ সালের ৭ এপ্রিল বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উদযাপিত হলেও একই বছরের বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে ৩১ মে তারিখ নির্ধারণ করা হয়। ১৯৮৯ সাল থেকে সমগ্র পৃথিবীতে দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে। তামাকজনিত মৃত্যুর মিছিল কমিয়ে আনতে উন্নত দেশগুলো শক্তিশালী আইন প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়ন, তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে বৃহৎ আকারের সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী ও প্লেইন প্যাকেজিং প্রবর্তন, তামাকের উপর করহার ও মূল্য বৃদ্ধিসহ বহুবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। যে কারণে উন্নত দেশগুলোতে তামাকের ব্যবহার ১.১ হারে কমছে। কিন্তু তামাক কোম্পানিগুলোর আগ্রাসী প্রচারণা, দুর্বল আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে তামাক কোম্পানির প্রভাব, স্বল্পমূল্য হওয়ায় বাংলাদেশের মত ঘনবসতি ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তামাকের ব্যবহার ২.১ হারে বাড়ছে।

 

এদিকে গেøাবাল এডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস) অনুযায়ী, ৪৩.৩% (প্রায় সোয়া ৪ কোটি) মানুষ বিভিন্নরকম তামাক ব্যবহার করে। দেশে বর্তমানে তামাক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ কোটি। এর মধ্যে ২৭.২% (২ কোটি ৫৯ লক্ষ) ধোঁয়াবিহীন তামাক এবং ২৩% (২ কোটি ১৯ লক্ষ) ধূমপানের মাধ্যমে তামাক ব্যবহার করেন। এছাড়া বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর ৪৫% অর্থাৎ প্রায় ৪ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ জনসমাগমস্থল ও গণ পরিবহনে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার। এর মধ্যে, ৩০% প্রাপ্তবয়স্ক নারী কর্মস্থলে এবং ২১% নারী জনসমাগমস্থলে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছেন। অর্থাৎ ধূমপান না করেও পরোক্ষ ধূমপানের শিকার বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি নারী।

তামাকের ব্যবহার যেহেতু বেশি, তাই মৃত্যুসংখ্যাও অনেক। সর্বশেষ টোব্যাকো এটলাস এর তথ্য মতে, বাংলাদেশে তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতি ঘন্টায় ১০.৫ জন, প্রতিদিন ২৫২ জন, মাসে ৭,৬৬৭ জন এবং বছরে ৯২,০০০ মানুষ মারা যায়। বাংলাদেশে অন্য কোন কারণে এত মানুষের মৃত্যু হয় না! সড়ক দূর্ঘটনা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক ও আলোচিত বিষয়। কিন্তু সড়ক দূর্ঘটনায় মৃত্যুহার এর চাইতে অনেক কম, বেসরকারি হিসাবে প্রায় এক-চতুর্থাংশ ও সরকারি হিসাবে প্রায় ৬ ভাগের ১ ভাগ।

ফুসফুস ও মুখ গহŸরের ক্যান্সার, ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদী রোগ, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়বেটিসের মতো অসংক্রামক রোগসমূহ ভয়াবহ, প্রাণঘাতী, দীর্ঘমেয়াদী ও ব্যয়বহুল। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও নেতিবাচক জীবনাচারের কারণে বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান। মূলত, এসব রোগ বাড়ছে। তবে ধূমপান ও তামাক সেবনকে এসব ভয়াবহ রোগের প্রধান কারণ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ক্রমবর্ধমান এসব রোগ পৃথিবীতে ৬৩ ভাগ এবং বাংলাদেশে ৬০ ভাগ মৃত্যুর জন্য দায়ী। ধূমপানসহ তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস (অতিরিক্ত চিনি-লবন-চর্বিযুক্ত ও তেলনির্ভর খাবার/পানীয়/ফাস্ট ফুড-জাঙ্ক ফুড সেবন এবং শাকসব্জি-ফলমূল কম খাওয়া), অপর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম, মাদক সেবন এসব রোগের কারণ। বাংলাদেশে তামাক ব্যবহার ও ধূমপানজনিত যে মৃত্যুর মিছিল চলমান, তা কমিয়ে আনতে কার্যকরভাবে তামাক নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। যারা ধূমপান ও তামাক সেবন করেন, তাদের প্রতি দু’জনের একজন তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তামাকের কারণে বিভিন্নরকম ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়বেটিস, এজমাসহ নানাবিধ প্রাণঘাতী রোগ সৃষ্টি হয়। তামাকজনিত অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদী এবং এসব রোগ একবার দেখা দিলে কখনও ভাল হয় না। ফলে যে পরিবার এসব রোগে আক্রান্ত হয়, সে পরিবার নানা সঙ্কটে পড়ে। এসব রোগের চিকিৎসা সেবা প্রদান করতে সরকারেরও স্বাস্থ্যখাতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। পাশাপাশি বিত্তবানদের অনেকে দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে গিয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রা চলে যাচ্ছে।

তাই তামাক নিয়ন্ত্রণে কঠোর হওয়ার সময় এসেছে। বাংলাদেশ যে নি¤œ মধ্য আয়ের দেশ হিসাবে পদার্পন করেছে এবং মধ্য আয়ের দেশ হওয়ার পথে রয়েছেÑ এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তামাক নিয়ন্ত্রণকে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। ২০২৫ সালের মধ্যে তামাকের ব্যবহার ৩০% কমানোর যে বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করার ঘোষণা এবং আগামী ১৫ বছরব্যাপী টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এর কার্যকর বাস্তবায়নে ধূমপান ও তামাক সেবনের হার কমিয়ে আনতে এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

(লেখক: এ্যাডভোকেট মোঃ মাছুম বিল্লাহ,সদস্য, তামাক নিয়ন্ত্রন জেলা টাস্কফোর্স কমিটি, খুলনা।)