ডুমুরিয়ায় প্রতীমা তৈরীতে ব্যস্ত পালপাড়ার মৃৎ শিল্পীরা

0
527

এস রফিক, ডুমুরিয়া :
হিদু সম্প্রদায়ের বিদ্যার দেবী স্বরস্বতী পূজাকে সামনে রেখে খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহি শোলগাতিয়া গ্রামের পালপাড়ার মৃৎশিল্পীরা এখন প্রতিমা তৈরীতে ব্যস্ততম সময় পার করছেন। শিল্পীদের নিপুন আঁচড়ে তৈরী হচ্ছে এক একটি প্রতিমা। তারা নিজের সন্তানের মতো অতি ভালাবাসায় তৈরী করছেন এসব মূর্তী। প্রতি বছর মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পূজার আয়োজন করে ভক্তরা।
সরজমিন গিয়ে শিল্পীদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, উপজেলার একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল শোলগাতিয়া গ্রামের ঐতিহ্যবাহী পালপাড়ার অধিকাংশ মৃৎশিল্পীরা এখন একমাত্র পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে প্রতীমা নির্মানের কাজ। মাটির হাড়ি, কলসী, মালসাসহ বিভিন্ন উপকরণ তৈরি থেকে শটকে পড়ছে তারা। বহুমুখি সমস্যা আর পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে আজ সংকটের মুখ এ শিল্পটি। একসময় এ অঞ্চল মৃৎশিল্পের জন্য বিখ্যাত থাকলেও বিজ্ঞানের জয়যাত্রা, প্রযুক্তির উন্নয়ন ও নতুন নতুন শিল্প সামগ্রীর প্রসারের কারণে এবং প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও অনুকুল বাজারের অভাবে এশিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। শোলগাতিয়ার পালপাড়ায় দেখা গেছে ৬/৭টি পরিবার শুধুমাত্র প্রতীমা নির্মাণ করে জীবন যাপন করছে। তারা দূর্গা প্রতীমা, কালী প্রতীমা ও সরস্বতী দেবীর প্রতীমা তৈরি করেন। সামনে মাঘ মাসের ৮ তারিখ (সোমবার) সরস্বতী পূজাকে ঘিরে পালপাড়ার কারিগররা খুবই ব্যস্ততম সময় পার করছেন। তবে পুরুষের পাশাপাশি এখানে নারীরাও প্রতীমা নির্মাণ কাজে বেশ অগ্রসর হয়েছে। দিনরাত পরিশ্রম করে মনের মাধুরী মিশিয়ে সরস্বতী প্রতীমা তৈরি করছেন তারা। পুজার দু’মাস আগ থেকেই শোলগাতিয়া পালপাড়ার কারিগররা প্রতীমা তৈরির কাজ শুরু করেছে। পূজার পূর্বমহুর্ত পর্যন্ত চলবে একাজ। প্রতিবছর কারিগররা সরস্বতী এবং দুর্গাপুজায় খুবই ব্যস্ত সময় পার করে থাকন। এই দু’টি মৌসুমের উপার্জিত অর্থ দিয়েই তাদের পুরো বছর পার করত হয়। কারিগর অনিমা রাণী পাল জানান, ‘পুরুষদের সহযোগিতা করতেই প্রতীমা তৈরির কাজ করেছি। আমি বিয়ের পর থেকে শ্বশুর বাড়িতে স্বামী সমীর পালের সাথে প্রায় ১৮ বছর যাবত প্রতীমা’র কাজ করে আসছি। এখন মাটি ক্রয় থেকে শুরু করে বাঁশ, খড়, সুতাসহ বিভিন উপকরণের দাম বৃদ্ধি পেলেও বাড়েনি প্রতীমার মুল্য। প্রতীমা নির্মানে যে শ্রম ব্যয় হয় তার মুজুরী পাইনে। ছোট সাইজের এক একটি সরস্বতী প্রতীমা তৈরি করতে দেড়/দু’দিন লাগে, যা পাইকারী বিক্রি করা হয় প্রতিটি প্রতীমা দুই থেকে পাঁচশত টাকা দামে। যেকারণে অভাব অনটন থেকে বাঁচতে তাদের পরবর্তী প্রজন্ম এ পেশার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।’ শিল্পী আয়না রাণী পাল জানান, ‘প্রতীমা তৈরি করেই আমাদের সংসার চালাতে হয়। আগে আমরা মাটির হাড়ি, কলসীসহ বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করতাম। এখন জায়গা জমির অভাব, এছাড়া অন্য সম্প্রদায়ের লোকেরাও এখন মৃৎশিল্পকে পেশা হিসেবে নিয়েছে এবং বাজারে মাটির জিনিসপত্রের চাহিদা না থাকার কারণে আমরা শুধুমাত্র প্রতীমা নির্মানের কাজ করছি। এক কর্মের উপর আমাদের সংসার চালানো কঠিন  হয়ে পড়ছে। সরকার যদি আমাদের সহায়তা করতো তাহলে সংসার ঠিকভাবে চলতো এবং মৃৎ শিল্পেরও উন্নতি হতো।’ পালপাড়ার তৈরি এসব সরস্বতী প্রতীমা শাহপুর, চুকনগর, মান্দারতলা, খর্ণিয়া, কপিলমুনি, পাইকগাছা, কেশবপুরসহ আশপাশ এলাকার বিভিন্ন হাট বাজারে বিক্রি করা হবে বলে করিগররা জানান।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা পূজা উউদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক প্রভাষক গোবিন্দ ঘোষ বলেন, কালের আবর্তে ক্রমেই বিলুপ্ত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী মৃৎ শিল্প। মৃৎ শিল্প আমাদের ঐতিহ্য। দেশের ঐতিহ্যবাহি এ শিল্প বেচে থাকুক সরকার তা চায়। যে কারণে মৃৎপাত্রের ব্যবহার বৃদ্ধির জন্য সরকারি উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শনী করা হচ্ছে। তবে মৃৎশিল্পের প্রদর্শনী দেশের গন্ডি পেরিয় বাহিরেও এই শিল্পের সৌন্দর্য্য, এই শিল্পর সাথে সম্পৃক্ত মানুষের দক্ষতা, তাদের জীবন যাপনের ধরণসহ তাদের নৈপূণ্য সম্পর্কে প্রচার করতে হবে। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে, এ শিল্পের সাথে আমাদের ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং সংস্কৃতির সম্পর্ক রয়েছে। সুতরাং ভবিষ্যতে এই শিল্প যেন আর ধ্বংসের দিকে ধাবিত না হয় সে দিকে নজর দিতে হবে আমাদের সবাইকে।