ডায়রিয়া রোগী বাড়ছে, নেই টিটেনাস ভ্যাকসিন, মৃত্যু ৩ জন

0
849

কামরুল হোসেন মনি:
আজ ৯ চৈত্র। দিনকে দিন গরমের ভাবটা বাড়তে শুরু করেছে। পানির পিপাসা মেটাতে অনেকে ফুটপাতে শরবত পান করেন, কারও বা বাইরে ভাজাপোড়া খাওয়ার অভ্যাসটা বেশি। এতে বিপত্তি ঘটে। ফুড পয়জনিং ও পানির কারণে বেশিরভাগ মানুষই ডায়রিয়া আক্রান্ত হচ্ছে। নগরীর মীরেরডাঙ্গা সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গত কয়েক মাসের তুলনায় ডায়রিয়া আক্রান্ত সংখ্যা বেড়েছে। এছাড়া চলতি মাসে এ পর্যন্ত টিটেনাসে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল সূত্র মতে, গত ২২ মার্চ পর্যন্ত ৩শ’র ওপরে ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীর সেবা প্রদান করা হয়েছে। এর আগে জানুয়ারি মাসে ১৯০ জনকে এবং ফেব্রুয়ারি মাসে ৩২৩ জনকে সেবা প্রদান করা হয়। এই সময়ের মধ্যে টিটেনাস আক্রান্ত ১০ রোগীকে সেবা প্রদান করা হয়। এর মধ্যে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া জলবসন্ত, হাম ও জলাতঙ্ক রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হয়।
খুলনা সিভিল সার্জন ডাঃ এ এস এম আব্দুর রাজ্জাক বলেন, টিটানাস ভ্যাকসিন সরবরাহের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ-আলোচনা চলছে। ওই ভ্যাকসিনটার খুবই সঙ্কট রয়েছে। নিয়োগবিধি জটিলতার কারণেই শূন্য পদে জনবল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। জনবল সঙ্কটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
হাসপাতালের সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডাঃ মোঃ হাবিবুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পরিচ্ছন্ন কর্মী নেই। বাইরে থেকে লোক ম্যানেজ করেই কাজ চালাতে হচ্ছে। যার কারণে অনেক সময় নোংরা পরিবেশ থাকে। এই সময়ে আগের চেয়ে ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। বেড স্বল্পতা থাকায় রোগীদের মেঝেতে চিকিৎসা দিতে হয়। চাহিদা অনুযায়ী ডায়রিয়া স্যালাইন সরবরাহ কম। চলতি মাসে এ পর্যন্ত ৩শ’র কাছাকাছি ডায়রিয়া রোগীদের সেবা দেওয়া হয়েছে।
হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার শাকিলা কবির বলেন, টিটেনাস ভ্যাকসিন সরবরাহ নেই। এটার দামও বেশি। একজন টিটেনাস রোগীকে একবারে ১২টি (ইনজেকশন) টিটেনাস ভ্যাকসিনের প্রয়োজন হয়। যার দাম ১০-১১ হাজার টাকার মতো। এর সাথে ঘুমের ওষুধ ও কিছু এন্টিবায়টিকও রাখতে হয়। এ ব্যয় মেটানো একজন দরিদ্র পরিবারের পক্ষে অসম্ভব হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, মায়েদের গর্ভাবস্থায় ওই সব টিকা নেওয়া প্রয়োজন। জন্মের পর শিশুকে সব টিকা দেওয়া হলে এ রোগ এড়ানো সম্ভব বলে তিনি উল্লেখ করেন। পানিবাহিত কারণে ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এ সময় পানি ফুটিয়ে পান করার পরামর্শ তার। হাসপাতালে নেবুলাইজেশন মেশিন গত এক বছর ধরে নষ্ট হয়ে আছে, ছ্যাকার মেশিনও একই অবস্থা। শ্বাসকষ্ট রোগীরা আসলে ওই নেবুলাইজেশন মেশিন খুব জরুরি হয়ে পড়ে।
জানা গেছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলায় মানুষের ডায়রিয়া, টিটেনাস, নিওমেটাল টিটেনাস, জলবসন্ত, হাম, জলাতঙ্কসহ সংক্রামক রোগের চিকিৎসার জন্য ১৯৬৮ সালে খুলনার মীরেরডাঙ্গায় ভৈরব নদের পাশে হাসপাতালটি নির্মাণ করা হয়। ৪ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা হাসপাতালটি ২০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করে। আজ পর্যন্ত বাড়েনি হাসপাতালের বেড সংখ্যা। বদলায়নি হাসপাতালের চিত্র।
বর্তমানে হাসপাতালে সহকারী সেবিকার চারটি পদ থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। আর দুইজন বাবুর্চীর বিপরীতে একজন ও তিনজন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মীর স্থলে নেই কেউ। যা একজন ছিলো সেও স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দেন। এছাড়া গার্ড ও নৈশ প্রহরী না থাকার কারণে অরক্ষিত থাকে হাসপাতালটি। দিনের বেলায় গোচারণ ভূমি আর রাতে মাদকবসেবীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়।
মালা। বয়স ৮ বছর। দিঘলিয়া এলাকার বাসিন্দা। মেয়েটির মা সাবিনা বেগম জানান, বুধবার রাত থেকেই তার মেয়ে মালা কয়েকবার বমি করে। এরপর পাতলা পায়খানা। সারারাত একটু পর পর বমি। সকাল হলেই মেয়েকে এ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। স্যালাইন দেওয়ার পর, আগের চেয়ে একটু স্বাভাবিক এখন।
বৃদ্ধ আঃ রহমান (৬৫)। সকালে হঠাৎ বমি, পাশাপাশি পাতলা পায়খানা। পেটে ব্যথা। বয়স হওয়ার কারণে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, বললেন অসুস্থ বৃদ্ধের পুত্র মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, স্যালাইন দিয়েছে মাত্র একটি। এর বাইরে অন্যান্য ওষুধপত্র বাইরে থেকে কিনে আনা লাগছে। ওয়ার্ডটির পরিবেশও নোংরা। ওয়ার্ডের মধ্যে ছাগল এসে ঘুরঘুর করে। এতে রোগ-জীবাণু ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে বেশি, এমনিতে এটি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল। তারপরে পশু এসে ওয়ার্ডে ঢুকছে।
উল্লেখ্য, ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত গত ৫ বছরে ডায়রিয়া, টিটেনাস, নিওমেটাল টিটেনাস, জলবসন্ত, হাম ও জলাতঙ্ক রোগী নিয়ে ১৩ হাজার ৩২৪ জনকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে গত ৫ বছরে নিওমেটাল টিটেনাস (শিশু) টিটেনাস (বয়স্ক) বা ধনুষ্টংকার আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১০৩ জন। এর মধ্যে শিশু রয়েছে ২৫ জন।
সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে ডায়রিয়া, টিটেনাস, নিওমেটাল টিটেনাস ও জলবসন্ত আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৪৪ জন। এর মধ্যে টিটেনাসে ৬ শিশুসহ ২২ জন ও জলবসন্তে ২ জন মারা যায়। ২০১৩ সালে ২ হাজার ৫৯৬ জন আক্রান্তের মধ্যে টিটেনাসে ৪ শিশুসহ ১৬ জন ও জলবসন্তে ১ জন মারা যায়। ২০১৪ সালে আক্রান্ত ৩ হাজার ১৯০ জনের মধ্যে টিটেনাসে ৬ শিশুসহ ২৪ জন ও জলবসন্তে ২ জন মারা যায়। ২০১৫ সালে ৪১১৩ রোগীর মধ্যে টিটেনাসে ৫ শিশুসহ ২৬ জন, জলবসন্তে ২ জন ও ডায়রিয়ায় ১ জন মারা যায়। ২০১৬ সালে আক্রান্ত ৪২৯৯ জনের মধ্যে ডায়রিয়ায় ২ জন, টিটেনাসে ৪ শিশুসহ ১৫ জন ও জলবসন্তে ২ জন মারা যায়।