জীবন যেখানে স্থবির শুধুই দীর্ঘশ্বাস চোখের পানিতে স্মৃতিচারণ

0
684

# রোটারী কেনায়েত আলী-আনোয়ারা খাতুন ওল্ডহোম

সাইমুম মোর্শেদ, নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলা নতুন বছরকে ঘিরে সবাই যখন পান্তা-ইলিশ, শাড়ি-পাঞ্জাবি পড়ে বাঙ্গালীয়ানায় ব্যাস্ত। ঠিক তখনি সম্পূর্ণ এক ভিন্ন চিত্র দেখা গেলো যশোরের এক বৃদ্ধাশ্রমে। সেখানে নেই কোন কোলাহল, কারো মাঝে নেই বৈশাখকে ঘিরে বাড়তি কোন উদ্দীপনা। জীবনটা সেখানে শুধুই একটা স্থবির দীর্ঘশ্বাস।
বৃদ্ধাশ্রমের নিচতলায় নিজ রুমে মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে হফ হাতা চেকশার্ট ও লুঙ্গী পরিহিত এক বৃদ্ধা বসে ছিলেন টিভির সামনে। দেখছিলেন স্যাটেলাইট টেলিভিশনে এবারের বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রার দৃশ্য। বারংবার মুঠোফোনের দিকে চোখ দেওয়ায় মনে হচ্ছিল, যেনো কারো ফোনের অপেক্ষা করছেন তিনি।
মোবাইল ফোন হাতে কেনো বসে আছেন জিজ্ঞেস করতেই শ্বেতশুভ্র ওই বৃদ্ধা যেন সম্বিৎ ফিরে পেলেন। কথা বলে জানা গেলো, গণ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী মোঃ আজিজুর রহমান, বাড়ি যশোরের নিউমার্কেট এলাকায়। ব্যক্তিজীবন ও কর্মজীবন ছিল তার বর্ণিল। তিন সন্তানের জনক তিনি। স্ত্রী মারা যাবার কিছুদিন পরই সন্তান পাড়ি জমান বিদেশে। তখন থেকেই এই বৃদ্ধাশ্রমই তার ঠিকানা।

ওই বৃদ্ধা জানান, একমাত্র সন্তান যদি তাকে ফোন করে। ফোন করে যদি না পায়। এজন্যই তার এ অপেক্ষা। মাসে দু’বার ফোন করেন তার মেয়ে। সেই দু’ বার ছেলে-মেয়ের কণ্ঠ শোনার জন্যই বাবার এই অপেক্ষা। বৈশাখের দুপুর গড়িয়ে গেলেও, হাতের নাগালেই রাখা মুঠোফোনটি বেজে ওঠেনি এখনো।
বৈশাখে কী খাবেন প্রশ্ন করতেই বাচ্চাদের মতো হেসে ফেললেন এই বৃদ্ধা। করুণ হাসি হেসে জানালেন, আমাদের আবার বৈশাখ। একসময় কত নতুন বছরকে ঘিরে আনন্দ করতাম। কত মানুষ আসতো বাসায়। ছেলে-মেয়ের চাহিদা মতো সবকিছু কিনতাম, বাজারের বড় ইলিশটা কিনে বাড়ি ফিরতাম। ছেলে-মেয়েদের আমার বায়নার শেষ ছিল না, আর এখন ছেলেমেয়েও নাই বউও নাই। বায়না করার লোকও নাই।’
বৃদ্ধাশ্রমের সবার গল্পই প্রায় একই রকম। একদিন তাদের সব ছিলো। স্বামী-সন্তান, শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়ে ছিলো জমজমাট সংসার। প্রচন্ড ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে পার করেছেন জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত। কিন্তু এখন তাদের কিছুই নেই । নেই কোন ব্যস্ততা। স্বজন থেকে দুরে থাকা এই বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের বুকের মাঝে শুধুই হাহাকার।
বৈশাখ, ঈদ, রোজা কোন কিছু নিয়েই নেই তাদের বাড়তি কোন উৎসাহ উদ্দীপনা। এখানে বসবাসরত প্রবীণরা নিজ নিজ কক্ষে বসে, হেটে চলেই তাদের সময় পার করে দেন। সবাই একাকী হয়ে গেছেন। তাই তাদের এই একাকীত্বের ভাগিদার হতে চায়না কেউই।
আরেক বৃদ্ধের দেখা মিললো নামাজরত অবস্থায়। নামাজ শেষে করে বৃদ্ধাশ্রমের বারান্দায় চেয়ারে বসে বসে কাগজ কলম নিয়ে কিছু একটা লেখার চেষ্টা করছিলেন তিনি। গলায় ঝুলিয়ে রেখেছেন একটি মোবাইল ফোন আর টাকার ব্যাগ। কথা বলে জানা গেলো, ছেলে মেয়েদের কাছে চিঠি লিখছেন তিনি। তবে এই চিঠি ডাক-বিভাগ পর্যন্ত পৌছায় না। নিজের বিছানার বালিশের পাশেই থেকে যায়।
পরিচয় প্রকাশ করলেও, ছবি না তোলার শর্তে শেখ হায়দার আলী নামের এই বৃদ্ধ জানান, ভাইস-প্রিন্সিপাল হিসেবে নিজের কর্মজীবন কাটিয়েছেন মাগুরা ডিগ্রী কলেজে। ১ ছেলে ও ১ মেয়ের সবাই যে যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত। বড় মেয়ে স্কলার ইউনিভার্সিটির লেকচারার। ছেলে এখনো পড়াশুনা করেন। বাবার খোঁজ নেয়ার কোন সময় তাদের নেই।
বৈশাখের কথা বলতেই বিষন্ন হয়ে পড়েন ওই বৃদ্ধ। নিজের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি দেখিয়ে বলেন, ‘আমি আমার ছেলে-মেয়েদের খবর নেই সবসময়। শুধু আমার খবর নেয়ার সময় নেই কারও। আগে স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে বৈশাখ করতাম। এখন নিবাসের মেস থেকে সব বুড়ো বুড়িদের নিয়ে বৈশাখ করি।
এখন আর কেউ বৈশাখের আগে অফিস থেকে ফেরার সময় ফোন করে বলে না বাবা, ইলিশ মাছ কিনে আনবা। কেউ আর বলেনা বাবা তাড়াতাড়ি বাসায় এসো।’
এখানে বসবাসরতদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফেলে আসা তাদের জীবনের স্বর্ণালি দিনের কথা। পুরাতন দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে যেয়ে চোখের পানি ফেলেছেন অনেকে। বৈশাখের দিনের উৎসবমুখর পরিবেশ স্ত্রী-স্বামী-সন্তান নিয়ে কথা বলতে গিয়ে হয়েছেন আবেগাপ্লুত। তবুও থেমে থাকেনা কিছুই। এভাবে পার হয়ে যায় তাদের এক একটি দিন। শুধু বৈশাখ, জৈষ্ঠ নয় সারাবছরই বৃদ্ধাশ্রমের দেয়ালে ঘুরে ফেরে কোন এক দীর্ঘশ্বাস।

বৃদ্ধাশ্রমটি ঘুরে জানা যায়, খুলনা বিভাগসহ পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একমাত্র বৃদ্ধাশ্রম হচ্ছে এই ‘রোটারী কেনায়েত আলী-আনোয়ারা খাতুন ওল্ডহোম’। যশোর শহরের মুজিব সড়কে রোটারী হাসপাতাল সংলগ্ন ২৫ শতক জমিতে নির্মিত হয়েছে এই ওল্ডহোমটি।
প্রথম পর্যায়ে এখানে ঠিকানা হয়েছিলো ২৪ জন বৃদ্ধের। তবে, এর ধারাবাহিতায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধের সংখ্যা বাড়ে-কমে। তবে দেখাযায়, নিজ পরিবারের সদস্য হিসাবে একজন মানুষের যে ধরণের সুযোগ-সুবিধার প্রয়োজন তার সবকিছুই রয়েছে এই বৃদ্ধাশ্রমে।
বৃদ্ধাশ্রমটির ব্যাবস্থাপক মোঃ শাহিন জানান, প্রবীণদের কল্যাণের কথা বিবেচনা করেই তারা বৃদ্ধাশ্রম নির্মাণের উদ্যোগ নেন। প্রথম পর্যায়ে এখানে ২৪ জনের ঠাঁই মিললেও ভবিষ্যতে তাদের বৃদ্ধাশ্রমটির পরিসর আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।#