জাহাজের বর্জ্য থেকে সুন্দরবন রক্ষায় চার শত কোটি টাকার প্রকল্প

0
305

শেখ নাদীর শাহ্: মোংলা বন্দরে চলাচলকারী জাহাজের বর্জ্য থেকে সুন্দরবনকে রক্ষা করতে সরকার ৪ শ’ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি ইতোমধ্যে অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশের দ্বিতীয় সমূদ্রবন্দর মোংলায় বছরে দু’শতাধিক দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে। এসব জাহাজ থেকে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকা ও পশুর নদীতে অবাধে বর্জ্য ও দূষিত তেল ফেলা হচ্ছে। এর ফলে পশুর নদীসহ সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকার ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, জাহাজের বর্জ্যদূষণের ফলে জীববৈচিত্রও ধ্বংস হচ্ছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানায়, মোংলা বন্দরে চলাচলকারী জাহাজের পশুর চ্যানেল ও মোংলা বন্দরের আশপাশের নদ-নদীগুলোকে জাহাজের তেল থেকে দূষণমূক্ত রাখতে তৈলাক্ত পদার্থ অপসারণ করার জন্য ১টি অয়েল রিকোভারি ফ্লিট গঠনের উদ্দেশ্যে ‘মোংলা বন্দরের আধুনিক বর্জ্য ও নিঃসৃত তেল অপসারণ ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। প্রকল্পটি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বরাদ্দবিহীন অনুমোদনবিহীন নতুন প্রকল্প তালিকায় অন্তর্ভুক্ত আছে। ৪০১ কোটি ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন ২০২০ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয়ে ২০২২ সালের ৩০ জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্দরে তালিকাভুক্ত ২৪টি গার্বেজ ক্লিনার (লাইসেন্স হোল্ডার) কোম্পানি রয়েছে কিন্তু বন্দরে কোনও গার্বেজ সেন্টার না থাকায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলো বন্দরে অবস্থান ও খালাস শেষে বন্দর ত্যাগ করার পথে সুন্দরবনের পশুর নদী ও উপকূলীয় জলসীমায় জাহাজের আবর্জনা ও দূষিত জ্বালানি তেলের বর্জ্য ফেলে রেখে যায়।
অবাধে যত্র তত্র এভাবে বর্জ্য ও দূষিত তেল ফেলে যাওয়ায় একদিকে যেমন নদীর নাব্যতা হ্রাস পাচ্ছে অন্যদিকে, নদীর পানিও মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। পানিতে ফেলা বর্জ্য ও দূষিত তেলে সুন্দরবনের গাছপালাসহ উপকূলীয় নদ-নদীর মৎস্য সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে।
একনেক সূত্র জানায়, মোংলা বন্দরকে রপ্তানি উপযোগী একটি আন্তর্জাতিক বন্দরে রূপান্তর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মোংলা বন্দরে প্রয়োজনীয় সুবিধা তৈরিতে ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জোর দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বন্দরের আধুনিক বর্জ্য ও নিঃসৃত তেল অপসারণ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি উচ্চ-অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে, যা সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ।
এ ব্যাপারে আরাফাত নেভিগেশন কোম্পানির জাহাজ এমভি আরাফাত-(১)-এর ব্যবস্থাপক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘আমরা সব সময়ই সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া একাধিক নদী ব্যবহার করে মোংলা বন্দরে আসা-যাওয়া করি। বন্দরে মাল খালাসের পর জাহাজের বর্জ্য নদীতে ফেলতে ফেলতেই আসি। আসলে সেই বর্জ্য নদীর জলজ প্রাণী ও আশপাশের পরিবেশের ক্ষতি সাধন করে থাকে। বর্জ্য ফেলার কোন নির্ধারিত স্থান বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় মূলত বাধ্য হয়েই তারা এমনটি করেন বলেও জানান তিনি।
পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এপ্রসঙ্গে বলেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দরের আধুনিক বর্জ্য ও নিঃসৃত তেল অপসারণ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশও সুরক্ষা হবে। এছাড়া, মোংলা বন্দরে চলাচলকারী সমূদ্রগামী জাহাজের বর্জ্যদূষণ থেকে সুন্দরবনকে রক্ষাসহ পশুর চ্যানেল ও মোংলা বন্দরের আশপাশের নদ-নদীগুলোয় নিঃসৃত তেল থেকে দূষণমূক্ত রাখতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক নৌ-কনভেনশনের বাধ্যবাধকতা পালন করা হবে বলেও জানিয়েছেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুস সামাদ। তিনি বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র রক্ষা ও একই সঙ্গে আশপাশের নদীর পানি রক্ষা পাবে বলেও মনে করেন তিনি।