জঙ্গিদের টার্গেট লেখক-ব্লগার নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে

0
517

জঙ্গিদের হিটলিস্টে থাকা লেখক-ব্লগার ও বুদ্ধিজীবী-রাজনীতিকদের নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের ভাবিত করছে। জঙ্গিদের হিটলিস্টে থাকা ব্লগার এবং হুমকিপ্রাপ্ত লেখক-বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিকদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা দরকার জরুরিভিত্তিতে। একই সঙ্গে উগ্রবাদী চক্র দমনে সরকারকে আরো সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

প্রথিতযশা লেখক অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালকে প্রাণনাশের ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক বিরাজ করছে উদারমনা লেখকদের মধ্যে। একের পর এক লেখক, ব্লগার খুনের তদন্তে অগ্রগতি না হওয়া এবং হিটলিস্টে থাকা লেখক, ব্লগারদের মনে স্বাভাবিক কারণেই উদ্বেগ বাড়াবে।

গত শনিবার সন্ধ্যায় সিলেটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ ক্যাম্পাসে পুলিশ বেষ্টনীর মাঝেই আক্রান্ত হয়েছেন। সা¤প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার জাফর ইকবাল বিভিন্ন সময়ে জঙ্গিদের হুমকি পেয়েছিলেন। হামলার নেপথ্যে আনসার আল ইসলাম রয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ। এই ঘটনার পর থেকে জঙ্গিদের তৈরি হিটলিস্টে থাকা লেখক-ব্লগারদের নাম নতুন করে আলোচিত হচ্ছে। শাহবাগে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে আন্দোলন চলার সময় ‘নাস্তিক ব্লগারদের’ তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দিয়েছিল হেফাজত ইসলাম। এ ছাড়া জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) হিটলিস্টেও ৮৪ জন ব্লগারের নাম রয়েছে। তালিকাভুক্তদের বিরুদ্ধে ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগ আনা হয়েছে। যদিও তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের বেশির ভাগ কোনোভাবেই ধর্ম অবমাননার সঙ্গে জড়িত নন। তারা মুক্ত ও প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনায় বিশ্বাসী। কিন্তু উগ্রপন্থী মৌলবাদীরা নাস্তিক ও ইসলাম ধর্মের অবমাননাকারী হিসেবে তাদের চিহ্নিত করে হিটলিস্ট ধরেই হত্যা মিশন বাস্তবায়ন করছে। পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ইউনিটের (সিটিটিসি) একাধিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে গতকালের ভোরের কাগজের একটি রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে তাদের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া আরেক জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলাম সদস্যদের কাছ থেকে বেশ কিছু নথি জব্দ করা হয়। পাওয়া যায় ল্যাপটপ। যাতে অন্তত ৪০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি, লেখক ও ব্লগারের নাম পাওয়া গেছে। ওই তালিকায় ড. জাফর ইকবালের নামও ছিল। হিটলিস্টের তালিকা ধরে তারা টার্গেটকৃতদের হত্যার জন্য ছায়ার মতো অনুসরণ করছে। অনেককে হত্যার হুমকি দিয়ে তারা মৃত্যুপরোয়ানাও জারি করেছে। এসব জঙ্গি সংগঠন টার্গেট করে ২০১৫ সালে ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়, একই বছর ওয়াশিকুর রহমান বাবু, অভিজিৎ রায়কে খুন করে। ২০১৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এস এম আশরাফুল আলম সুজন, ১৪ ফেব্রুয়ারি জাফর মুন্সি, ২৮ ফেব্রুয়ারি মামুন হোসেন, ২ মার্চ জগৎজ্যোতি তালুকদার ও ৯ ডিসেম্বর জিয়াউদ্দিন জাকারিয়া বাবুকে হত্যা করা হয়। এর আগে ২০১৩ গণজাগরণ মঞ্চের ব্লগার ইঞ্জিনিয়ার আহমেদ রাজীব হায়দার শোভন, একই বছরের ৯ এপ্রিল আরিফ রায়হান দ্বীপকে খুন করেছে। বেশ কয়েক বছর আগে চিঠি পাঠিয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, ঢাবির অধ্যাপক অসীম সরকার, অধ্যাপক ড. জাফর ইকবাল, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার, লেখক কাবেরী গায়েন, বিকাশ সাহা, ইকবালুর রহিম ও পলান সুতারকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে। হুমকিদাতারা নিজেদের আনসারুল্লাহ বাংলা টিম-১৩ দাবি করেছিল। শুধু ব্লগারাই নয়, মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালি চেতনার পক্ষে সোচ্চার শিক্ষক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিকরাও খুনিদের টার্গেট- এটা স্পষ্ট।

এ পরিস্থিতি জঙ্গিদের হিটলিস্টে থাকা লেখক-ব্লগার ও বুদ্ধিজীবী-রাজনীতিকদের নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের ভাবিত করছে। মুহম্মদ জাফর ইকবালের প্রাণনাশের ঘটনা তাই প্রমাণ করেছে। এই ঘটনার পর দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি আবারো সামনে আসছে। আমরা দেশে আর কোনো লেখক-বুদ্ধিজীবীদের ওপর হামলা দেখতে চাই না। জঙ্গিদের হিটলিস্টে থাকা ব্লগার এবং হুমকিপ্রাপ্ত লেখক-বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিকদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা দরকার জরুরিভিত্তিতে। একই সঙ্গে উগ্রবাদী চক্র দমনে সরকারকে আরো সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।