‘চুইঝাল’ চাষ ও পরিচর্যা

0
2418

জলবায়ু সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এক হাজার মিটার উঁচু পর্যন্ত জায়গায় ‘চুইঝাল’ জন্মানো যায়। চাষের জন্য উপযুক্ত তাপমাত্রা ১০ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড।

জমি ও মাটির প্রকৃতি :
দো-আঁশ ও বেলেদো-আঁশ মাটি এবং পানি নিষ্কাশনের সুবিধাযুক্ত ও ছায়াময় উঁচু জমিতে সাধারণত চুইঝাল চাষ করা হয়।

রোপনের সময় :
বৈশাখ থেকে জ্যৈষ্ঠ এবং আশ্বিন থেকে কার্তিক মাস।

বীজ :
কাটিং পদ্ধতিতে এর কাণ্ড বা শাখা ৫০ থেকে ৭৫ সেন্টিমিটার লম্বা করে কেটে সরাসরি মাটিতে রোপন করা হয়। স্থানীয়ভাবে কাটিং বা শাখাকে পোড় বলা হয়। একটি পোড়ে কমপক্ষে চার থেকে পাঁচটি পর্ব সন্ধি থাকে। তবে পলিব্যাগে চারা তৈরী করে নিয়ে সেই চারা মুল জমিতে লাগালে চারার মৃত্যুর হার কম হয় এবং গাছের বৃদ্ধি বেশি হয়।

কাটিং শোধন :
চারা তৈরীর আগে কাটিং অবশ্যই শোধন করে নিতে হবে। এক লিটার পানিতে দুই থেকে তিন গ্রাম Provax, নোইন ও ব্যাভিষ্টিন অথবা কার্বেনডাজিম গ্রুপের যে কোন ছত্রাকনাশাক মিশিয়ে তার মধ্যে কাটিং ৩০ মিনিট ডুবিয়ে রাখতে হবে। ৩০ মিনিট পর কাটিং তুলে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে ফেলে কাটিং পলিব্যাগে বা বীজতলায় রোপন করতে হবে।

চারা রোপনের গর্ত তৈরী :
চুই-এর চারা রোপনের জন্য গর্তের মাপ হবে সবদিকে এক থেকে দুই মিটার বা একহাত। গর্ত থেকে তোলা মাটির তিন ভাগের এক ভাগ বাদ দিতে হবে। গর্তের মধ্যে কিছু গোবর, বর্জ্য, ৫০ গ্রাম ইউরিয়া, ৫০ গ্রাম টিএসপি, ৫০ গ্রাম পটাশ দিয়ে গর্তে ও মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে সাতদিন রেখে কাটিং লাগাতে হয়। তবে গর্ত এমনভাবে ভরতে হবে যেনো কিছু মাটি গর্তেও উপর ঢিবি হয়ে থাকে। এতে গর্তের মধ্যে পানি জমে থাকার সম্ভাবনা কম থাকে।

চারার হার :
‘চুইঝাল’ সাধারণত গাছের গায়ে লাগানো হয়ে থাকে। এজন্য গাছের দুরাত্বের উপর চারার হার নির্ভর করে। তবে সমতল জমিতে রোপনের জন্য প্রতি হেক্টরে ২৭৫ থেকে ৩০০টি চারা প্রয়োজন হয়।

চারা রোপন :
যেখানে আগেই গর্তে সার ও সারমাটি ভরাট করে রাখা হয়েছে, সে গর্তের মাঝখানে সামান্য দূরে দূরে দুটি চারা লাগাতে হবে। এতে কোন চারা মারা গেলে অন্য চারাটি বেড়ে ওঠবে। চারা লাগানোর পরপরই ঝাঝরি দিয়ে সেচ দিতে হব। একটি কাঠি পুতে লতায় অবলম্বন এমনভাবে দিতে হবে যাতে চুঁইগাছটি সহজে অন্য গাছে বেয়ে ওঠতে পারে। তবে বৃষ্টি হলে সেচ না দিয়ে অতিরিক্ত পানি বের করে দিতে হবে।

বাউনি দেওয়া :
চুই লতানো গাছের লতা আট থেকে দশ মিটার পর্যন্ত বাইতে পারে। তবে লতার গিঁট থেকে গজানো পাশের শাখাগুলো বেশি লতায় বিলম্বা হয় না। লতা ওপরে উঠার জন্য অবলম্বন দরকার। সাধারণত আম, কাঠাল, মান্দার, নারিকেল, সুপারি, জিকা ইত্যাদি গাছের কাণ্ডকে চুইগাছের অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করা হয়। লতার গিঁট থেকে ছোট ছোট শিকড় গজায় এসব শিকড়ের দ্বারা ‘চুইঝাল’ আশ্রয়ী গাছে কাণ্ডকে আকড়ে ধরে। পানের লতার মতো চুঁইগাছও গ্রীষ্মের প্রখর রোদ সহ্য করতে পারে না। তাই বা উনিগাছে কিছু ডালপালা রাখা প্রয়োজন।

সার ব্যবস্থাপনা :
ভাল ফলন পেতে হলে চুইগাছে সঠিকভাবে সার দিতে হবে। রোপনের পর পাঁচবছর পর্যন্ত সার কম লাগে। পাঁচবছর পর্যন্ত প্রতি গাছে ১০ কেজি গোবর বা কম্পোষ্ট সার, ২৫০ গ্রাম টিএসপি, ১০০ গ্রাম ইউরিয়া ও ১০০ গ্রাম এমওপি সার প্রতি বছর দিতে হবে। তবে সার সমান দু’ভাগ করে মে মাসে একবার এবং সেপ্টেম্বর মাসে একবার প্রয়োগ করলে ভাল হয়। গর্তে গাছের গোড়া থেকে কিছু দূরে ঘুরিয়ে চারিদিকে এই সব সার দিয়ে মাটি ভাল করে কুপিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে সেচ দিতে হবে।

গাছ ছাঁটাই :
চুই এর গাছ লতানো স্বভাবের বলে বেশ ভাল পাতা গজায়। এজন্য অনেক সময় ঝোপ হয়ে যায়। তাই পাঁচবছর বয়স হলে চার থেকে পাঁচটি ভাল শাখা লতা রেখে অন্যগুলো ছেঁটে দিতে হবে। তবে পাঁচবছরের আগে কোন ছাটাই দরকার নেই।

বালাই ব্যবস্থাপনা :
স্কেল বা খোসপোকা, কাণ্ড ও ডগা ছিদ্রকারী পোকা, মিলিবাগ বা ছাতরা পোকা, থ্রিপস, মাকড়, ব্যাকটেরিয়াজনিত লতা পচা ফসল সংগ্রহ চুঁই রোপনের একবছরের মাথায় খাওয়ার উপযোগি হয়। তবে ভাল ফলনের জন্য পাঁচ থেকে ছয় বছরের গাছই উত্তম।

ফলন :
হেক্টর প্রতি প্রায় দুই দশমিক শূন্য থেকে দুই দশমিক পাঁচ মেট্রিকটণ ফলন পাওয়া যায়। পাঁচ থেকে ছয় বছরের একটি গাছ থেকে প্রায় ১০ থেকে ১৫ কেজি পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়।

লেখক : কৃষিবিদ মেহেদী হাসান খান, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, দাকোপ-খুলনা।