চাল নিয়ে মুনাফাখোররা ফের তৎপর : ব্যবসায়ীরা দায়ী করছেন মিল মালিকদের

0
561

এম,এ আলীঃ
গত বছরের মাঝামাঝি থেকেই অস্থির হয়ে উঠে দেশের চালের বাজার। কখনও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হওয়ায়, কখনও আমদানি সমস্যার কারণে চালের দাম দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে। চলতি বছরে এসেও চালের বাজার দরে স্থিরতা আসেনি। সপ্তাহের ব্যবধানে বিভিন্ন বাজারে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে ১ থেকে ৩ টাকা বেড়েছে।
খুচরা বিক্রেতাদের তথ্য অনুযায়ী, কেজিপ্রতি নাজিরশাইল চালের দাম ৩ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৭৩ টাকায়, ১ নম্বর মিনিকেটের দাম ৩ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকায়, ২ টাকা বেড়ে সাধারণ মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৬২ টাকায়, বিআর-২৮ চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকায় এবং স্বর্ণা ও পারিজা চালের দাম বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকায়। গতকাল শুক্রবার কয়েকটি বাজার ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে।
দাম বৃদ্ধির জন্য ব্যবসায়ীরা দায়ী করছেন মিল মালিকদের। আর মিল মালিকরা বলছেন, ধানের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বেড়েছে চালের দাম। বাড়ার এ ধারা অব্যাহত আছে। কবে নাগাদ এবং কোথায় গিয়ে থামবে, বলার উপায় নেই। চলতি মৌসুমে চালের দাম বাড়ার কথা নয়। অথচ বাড়ছে এবং তা নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
চালের খুচরা বিক্রেতারা জানান, আমন মৌসুম শেষে চাল বাজারে চলে এসেছে অনেক আগে। এখন বোরো মৌসুম আসার অপেক্ষা এবং আমন শেষ হওয়ার মাঝামাঝি সময় চলছে। এই সময়ে চালের দাম কিছুটা বৃদ্ধি পায়।
বাজারে প্রতি কেজি ভালো মানের মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৬২ টাকায়। যা গেলো সপ্তাহের চেয়ে ২ টাকা বেশি। মুদি দোকানে প্রতি কেজি খোলা মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকা কেজি দরে। আর প্যাকেটজাত মিনিকেট চালের কেজি ৭০ টাকা।
কেজিতে ২ টাকা পর্যন্ত বেড়ে বাজারের আড়তে ভালোমানের মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৬১ টাকায়। শুধু খুলনায় নয়, দেশের বিভিন্ন মোকামেও বেড়েছে চালের দাম।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাযায়, উত্তরবঙ্গের জেলা নওগাঁতেও চালের দাম বাড়তি। দাম বৃদ্ধির জন্য ব্যবসায়ীরা দায়ী করছেন মিলারদের। তবে, মিলাররা বলছেন, ধান কমে যাওয়ায় দাম বেড়েছে।
চালের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে বাজার নিয়ন্ত্রক  জানান, বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন কাজ করছে। চালের দাম নিয়ন্ত্রণে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
কয়েক মাস আগে হঠাৎই চালের দাম বাড়তে শুরু করে এবং দফায় দফায় বেড়ে মোটা চালের দাম প্রতি কেজি ৩২ টাকা থেকে ৪২ টাকা পর্যন্ত উঠে যায়। চিকন চালের দামও প্রায় এই হারে বাড়ে। আশা করা গিয়েছিল, আমনের চাল বাজারে আসলে দাম কমবে। কিন্তু কমেনি। বরং নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে।
চালের দাম বাড়ারও কোনো না কোনো কারণ আছে। সেটা কি? ব্যবসায়ীদের দাবি ও বক্তব্য, আমন ধানের বড় অংশই কৃষকের কাছ থেকে কিনে নিয়েছে ফড়িয়া ও মিলাররা। তাদের চাল করে বাজারে ছাড়ার কথা। তারা তা না করে গুদামে আটকে রেখেছে। মিলারদের কাছ থেকে চালের পর্যাপ্ত সরবরাহ বাজারে আসছে না। এ কারণে চালের সংকট ও দাম দুটো বেড়েছে বা বাড়ছে। খুচরা, পাইকারি ও মিলারদের একে অপরকে দোষারোপ করার একটা প্রবণতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন পাইকারি বাজারে দাম বাড়ার কারণে তারা বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। আবার পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেনব, মিলাররা চাল সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে, দামও বাড়িয়েছে। ফলে তাদের বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। মিলারদের বক্তব্য, গ্রামে ধান পাওয়া যাচ্ছে না। বিভিন্ন কোম্পানি ধান কিনে আটকে রেখেছে। ধান সংকটের কারণে ধান ও চালের দাম বেড়েছে।
এদিকে এমন পরস্পর দোষারোপের ব্যাপারটি বহু পুরনো। চালের দাম যখন বাড়ে তখন সংশ্লিষ্ট কেউই দায় নিতে রাজি হয় না। একে অপরকে দায়ী করে গা বাঁচানোর চেষ্টা করে। মাঝখান থেকে ক্রেতা-ভোক্তারা পড়ে বিপাকে। তাদের সুবিধা-অসুবিধা দেখার যেন কেউ নেই। চাল বা খাদ্যশস্যের বাজারের ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। বাজার ব্যবস্থাপনা বলতে যা বুঝায়, তারও কোনো বালাই নেই। চালের দাম বাড়লে, কেন বাড়ছে তা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ খোঁজ-খবর করে না।
কোথাও কোনো বিভ্রাট, সংকট বা ঘোঁট থাকলে তার মীমাংসার চেষ্টা করে না। সেই অতি পুরনো পন্থা অনুসরণ করে স্বল্পমূল্যে খোলাবাজারের চাল বিক্রির ব্যবস্থা নেয়। এই কার্যক্রম হয়তো কিছুদিন থাকে, তাও গ্রামেগঞ্জে নয়, শহরাঞ্চলে; তারপর এই কর্মসূচি এক সময় হাওয়া হয়ে যায়। এভাবেই চলছে। সরকারের পক্ষে থেকে বলা হয়, দেশে খাদ্যশস্যের কোনো সঙ্কট নেই, দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এ কথা ন্যায়সঙ্গত মূল্য নিশ্চিত করার পক্ষে যথেষ্ট হতে পারে না।

সত্য বটে, দেশে ধান-চালের অভাব নেই। প্রয়োজনে আমদানির ব্যবস্থাও আছে এবং আমদানিও হয়ে থাকে। তারপরও চালের বাজারে অস্থিরতা-অস্থিতিশীলতা কেন তার কোনো জবাব খুঁজে দেখা হয় না। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, মিলার ও ব্যবসায়ীরা নানা অজুহাতে চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে এবং ক্রেতা-ভোক্তাদের সেই বাড়তি দামেই চাল কিনতে হয়েছে। কৃষক থেকে মিলার-ব্যবসায়ী ও সেখান থেকে প্রান্তিক ক্রেতা পর্যন্ত চাল আসার যে চেইন, তাতে কোনো সমস্যা হলে বাজারে তার প্রতিক্রিয়া হতে বাধ্য। মিলার ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে অতি মুনাফা শিকারের প্রবণতা বরাবরই লক্ষ্য করা যায়। কখনো চাল বা ধান মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করা হয় এবং সেই সঙ্কটের উসিলা ধরে দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়। এটা অসৎ মিলার-ব্যবসায়ীদের অতি পরিচিত কৌশল হলেও তা প্রতিহত করার কোনো ব্যবস্থা নেই। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। বরাবরই তারা অধরা থেকে যায়। চালের দাম বাড়লে সব শ্রেণীর ক্রেতাকেই সেই বাড়তি দামে চাল কিনতে হয়। এতে সবচেয়ে বিপাকে পড়ে নিম্নবিত্তের মানুষ এবং যাদের আয় সুনির্দিষ্ট। আয়-রোজগারের উপায় এমনিতেই সীমিত। যাদের নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থা নেই এবং যারা মাস-মাইনের চাকুরে তারাই বেশি নাজুক অবস্থায় পড়তে হচ্ছে।