খুলনা মহানগরীর ৯০ ভাগ স্কুলগামি শিক্ষার্থী রয়েছে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে

0
732

খুলনা মহানগরীর ৯০ ভাগ স্কুলগামি
শিক্ষার্থী রয়েছে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে

 

খুলনা টাইমস প্রতিবেদন :
বেহাল দশায় পরিনত হয়েছে মহানগরীর খুলনার অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্যানিটেশন ব্যবস্থা। এমতবস্থায় স্কুলগুলোতে আসা শতকরা ৯০ ভাগ শিক্ষার্থী টয়লেট ব্যবহারে অনীহা দেখাচ্ছে। যার মধ্যে কন্যা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি।
বিশেজ্ঞ চিকিৎসক ও মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন,দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষার্থীরা এভাবে টয়লেট ব্যবহার থেকে বিরত থাকলে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়বে। পাশাপাশি শ্রেণী কক্ষে মনোযোগ কেন্দ্রীভূতকরণেও সমস্যা দেখা দিবে। সম্প্রতি নেদারল্যান্ডস ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসএনভি) এক স্কুল মাঠ জরিপে এ ধরনের তথ্য উঠে এসেছে।
খুলনা মহানগরীতে মোট ৪৯ হাজার ৩৯৩ জন শিক্ষার্থীর উপর এই জরিপ পরিচালনা করে এসএনভি। যার মধ্যে মোট ২৩ হাজার ৫০৬ জন নারী শিক্ষার্থী এবং ২৫ হাজার ৮৮৭ জন পুরুষ শিক্ষার্থী রয়েছে। আর বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক ১৩টি, প্রাথমিক ৩৫টি, ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান/মাদ্রাসা ১৪টি এবং মাধ্যমিক/উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০১টি।
জরিপে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুযায়ী প্রাক-প্রাথমিক স্কুলে টয়লেট ব্যবহার করছে শতকরা ১০ ভাগ শিক্ষার্থী, বাকী ৯০ ভাগ শিক্ষার্থী টয়লেট ব্যবহার করে না। প্রাথমিক স্কুলে ছাত্রীরা করছে শতকরা ১৯ ভাগ, বাকী ৮১ ভাগ করে না। ছাত্ররা করছে শতকরা ৫৬ ভাগ, বাকী ৪৪ ভাগ ছাত্র করে না। ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান/ মাদ্রাসায় ছাত্রীরা করছে শতকরা ১৩ ভাগ, বাকী ৮৭ ভাগ করে না। ছাত্ররা করছে শতকরা ৪৩ ভাগ, বাকী ৫৭ ভাগ করে না। মাধ্যমিক/উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে ছাত্রী করছে শতকরা ৫৫ ভাগ, বাকী ৪৫ ভাগ করে না। ছাত্ররা করছে শতকরা ৩৩ভাগ, বাকী ৬৭ ভাগ করে না। এছাড়া এসব স্কুলগুলোতে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা টয়লেট আছে মাত্র শতকরা ১.৩ ভাগ এবং বাকী ৯৮.৭ ভাগের জন্য পৃথক টয়লেটের ব্যবস্থা নেই।
জরিপে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুযায়ী ১ বছরের মধ্যেই সেপটিক ট্যাংক খালি করার নিয়ম থাকলেও প্রাক-প্রাথমিক স্কুলের শতকরা ৪৫ভাগ, প্রাথমিক স্কুলে ৩৮ভাগ, ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান/মাদ্রাসায় ৬৪ভাগ এবং মাধ্যমিক/উচ্চ মাধ্যমিকে ৪৭ ভাগ সেপটিক ট্যাংক কখনো খালি করা হয়নি। বাকী যেগুলো খালি করা হয়েছে তার মধ্যে শতকরা ৮২ ভাগ করা হয়েছে সুইপার দ্বারা হাতের কাজের মাধ্যমে এবং ১৮ ভাগ করা হয়েছে যান্ত্রিকভাবে এবং সুইপার দ্বারা হাতের কাজের মাধ্যমে। এছাড়া ওই সব স্কুলগুলোতে হাত ধোঁয়ার স্টেশন রয়েছে শতকরা ২৮ ভাগ, পানি রয়েছে শতকরা ২৭ ভাগ, সাবান/ডিটারজেন্ট রয়েছে শতকরা ১৯ ভাগ এবং হাত ধোয়ার সুবিধাসমূহে প্রবেশগম্যতা রয়েছে শতকরা ১৮ ভাগ। যার ফলে স্কুলগুলোতে আসা শতকরা ৯০ ভাগ পর্যন্ত শিক্ষার্থী টয়লেট ব্যবহারে অনীহা দেখাচ্ছে। বেশি অনীহা প্রকাশ করে মেয়ে শিক্ষার্থীরা।
নগরীর ২৩নং বানিয়াখামার, ১১নং বানিয়াখামার ও সোনাপোতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সরকারি করোনেশন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়সহ বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের ব্যবহৃত টয়লেটগুলো বেশিরভাগ নোংরা,স্যাঁসসেতে ও দুগর্ন্ধময়। কোন টয়লেটে হাত পরিষ্কারের জন্য সাবান বা ডিটারজেন্ট নেই। রয়েছে পর্যাপ্ত পানি সংকট। এছাড়া কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবনে কোন প্রকার টয়লেটের ব্যবস্থা না থাকায় বিকল্প হিসেবে বিদ্যালয় থেকে বিচ্ছিন্ন কোন স্থানে অস্থায়ী টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু সেগুলোও ব্যবহারের অনুপযোগী।
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে নগরীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভিভাবকরা জানান, বেশিরভাগ স্কুলের টয়লেট-এর মান প্রথমত ভালো না। দ্বিতীয়ত টয়লেটগুলো দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করার কারনে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ছেলে-মেয়েরা টয়লেট ব্যবহার করতে না পেরে ভোগান্তিতে পড়ছে।
স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীরা জানায়, টয়লেটে দুগর্ন্ধ ও ময়লা থাকায় পারতপক্ষে তারা টয়লেটে যায় না। তাই দীর্ঘ সময় জোরপূর্বক টয়লেট থেকে নিজেদের বিরত রাখে। এতে তাদের সাংঘাতিক কষ্ট সহ্য করতে হয়।
খুলনা সরকারি সুন্দরবন আদর্শ কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও মাষ্টার ট্রেইনার (অটিজম ও নিউরো) প্রকাশ চন্দ্র অধিকারী দৈনিক প্রকৃতির সংবাদকে বলেন, সময়মতো পায়খানা-প্রসব না করতে পারলে শিক্ষার্থীদের এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ মোকাবেলা করতে হয়। ফলে বিভিন্ন প্রকার মনো দৈহিক রোগ যেমন হজম সমস্যা, হাঁপানি, দুশ্চিন্তা ও উত্তেজনায় হৃদ স্পন্দন বৃদ্ধি পায়। প্রস্্রাবেরও সংবেদনের গোলযোগ এবং মাইগ্রেনের তীব্র মাথা ব্যথা দেখা দেয়। এছাড়া কিছু কিছু মৃদু মানসিক যেমন দুশ্চিতামূলক, আতঙ্কজনিত, উৎকণ্ঠাজনিত ও বিষন্নতামূলক স্নায়ু রোগে ভোগে। এসব গোলযোগের ফলে চিন্তায় মৃদু অসংলগ্নতা দেখা দেয়। শিক্ষার্থীরা টেনশন ভোগ করে, শরীরে খিচুনি দেখা দেয়। তাদের মধ্যে অস্থিরতা কাজ করে। ফলে শ্রেণী কক্ষে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করনে সমস্যা হয়।
খুলনার সিভিল সার্জন এ এস এম আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সময়মতো টয়লেট করা না গেলে খাদ্যাভাসের পরিবর্তনসহ শরীরে পুষ্ঠিহীনতা দেখা দেয়। গ্যাসের সমস্যার সৃষ্টি হয়। এছাড়া শরীরে নানা ধরনের পীড়া বাসা বাঁধে। ফলে এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের উপর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।