খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন-সংকট

0
1379

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের জন্য তিনটি ও ছাত্রীদের দুটি আবাসিক হলে দুই হাজারের মতো শিক্ষার্থী থাকতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী সাত হাজারের বেশি। হলে থাকার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় অধিকাংশ শিক্ষার্থীকেই থাকতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে বা শহরে ভাড়া বাসায় ও মেস করে। এতে একদিকে যেমন বাড়তি খরচ হচ্ছে, অন্যদিকে ছাত্রীদের মধ্যে একধরনের নিরাপত্তাহীনতাও কাজ করে।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, থাকার বাড়তি খরচের পাশাপাশি প্রতিবছরই বিভিন্ন খাতে ফি বাড়ানো হচ্ছে। দুই-তিন বছর আগে যাঁরা ভর্তি হয়েছেন, তাঁদের তুলনায় নতুন শিক্ষার্থীদের প্রতি টার্মে দ্বিগুণের বেশি ফি দিতে হয়। কেবল ভর্তি ফি আগের মতো রাখা হয়েছে।
গত আগস্টের মাঝামাঝিতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে সরেজমিনে বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। শিক্ষার্থীরা বলেছেন, নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধি না থাকায় এসবের বিরুদ্ধে কথা বলার কেউ নেই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষকদের অনুমতির বাইরে কোনো শিক্ষার্থী চলতে পারেন না। এমনকি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি পরিচালনা করতেও ছাত্রবিষয়ক পরিচালকের (ডিএসডি) অনুমতি নিতে হয়।
অবশ্য উপাচার্য ফায়েক উজ্জামান বলেছেন, শিক্ষার্থীরা নিজেরাই বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনীতিমুক্ত রাখতে চান। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই শিক্ষাপঞ্জি মেনে চলেন। আবাসন-সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, দুটি ১০ তলা ভবনসহ প্রায় দেড় শ কোটি টাকার একটি উন্নয়নকাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হচ্ছে। এর মধ্যে আবাসিক হল করার পরিকল্পনাও রয়েছে। নতুন হল হলে আবাসন-সংকট অনেকটাই দূর হবে।
তিন বছরে ফি বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি
২০১৫ সালে ভর্তি হওয়া এক শিক্ষার্থী ও ২০১৮ সালে ভর্তি হওয়া এক শিক্ষার্থীর টাকা জমা দেওয়ার রসিদ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আগে পরিবহন ফি ছিল ৪০০ টাকা, সেখানে নতুন শিক্ষার্থীরা দিচ্ছেন ৯০০ টাকা করে। আগে কোর্স রেজিস্ট্রেশন ফি ছিল ৩০ টাকা, সেটা এখন ৬০ টাকা। চিকিৎসার জন্য প্রতি টার্মে আগে ১০০ টাকা দিতে হতো, এখন দিতে হয় ২৪০ টাকা করে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য আগে দিতে হতো
৫০ টাকা, এখন দিচ্ছেন ১৫০ টাকা করে। এভাবে প্রতিটি খাত মিলিয়ে কোর্স ফি ছাড়া ২০১৫ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা প্রতি টার্মে ৯৯২ টাকা দিতেন। আর ২০১৮ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা দেন ২ হাজার ৪২১ টাকা। অবশ্য উপাচার্যের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ফি ঐতিহ্যগতভাবেই কম।
গ্রন্থাগার নিয়ে সমস্যা
শিক্ষার্থীরা বলছেন, সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার বন্ধ করায় তাঁরা ক্ষুব্ধ। সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যেই গ্রন্থাগার থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে দিতে তোড়জোড় শুরু হয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এর বেশি সময় থাকতে চান না। একাধিক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, গ্রন্থাগারে তাঁরা সব বইও পান না। নতুন বিভাগগুলোর শিক্ষার্থীদের বইয়ের চাহিদা গ্রন্থাগার মেটাতে পারছে না।

খানজাহান আলী হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, হলের পাঠকক্ষগুলো খুবই ছোট। একসঙ্গে ২০-২৫ জন পড়তে পারেন। বেশির ভাগ আবাসিক শিক্ষার্থী কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে পড়াশোনা করতে পছন্দ করেন। কিন্তু সন্ধ্যায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তা সম্ভব হয় না। এক শিক্ষার্থী বলছিলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের আবাসিক হলগুলো বন্ধ হয় রাত ১১টায়। কিন্তু গ্রন্থাগার সন্ধ্যায় বন্ধ হয়ে যাবে, এটা কেমন কথা?
কথা বলার জায়গা নেই
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সমস্যা জানতে অন্তত ১৫ জন ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে কথা হলেও কেউই নাম প্রকাশ করতে চাননি। প্রায় প্রত্যেকেই আবাসন-সংকটকে মূল সমস্যা বলেছেন। অন্য যে অভিযোগটির কথা বেশি বলেছেন, তা হলো সবকিছুতে শিক্ষকদের ‘হস্তক্ষেপ’।
একজন শিক্ষার্থী বলেন, শিক্ষকদের কথার বাইরে গেলে তাঁরা ফেল করিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। যেকোনো কিছুতেই ডিএসডির অনুমতি নিতে হয়।
শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশনে দেওয়া নির্দেশিকায় রয়েছে, শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দলীয় রাজনৈতিক চর্চায় নিষেধাজ্ঞার বাইরেও ডিএসডির অনুমতি ছাড়া সভা, বাদ্যযন্ত্র বাজানো, পোস্টার, লিফলেট, ব্যানার, বুলেটিন, ম্যাগাজিন প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। যেকোনো প্রকাশনার প্রতিটি সংখ্যার খসড়া ডিএসডির অনুমোদন লাগে। প্রকাশিত কিছু বক্তব্য যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থের পরিপন্থী বলে উপাচার্য মনে করেন, তাহলে তিনি তা বাতিল করতে পারেন। ধর্মঘটের বিষয়ে কড়াভাবে নিষেধ রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এসব নিয়মের কারণে শিক্ষকদের কর্মকাণ্ড শিক্ষার্থীদের পছন্দ না হলেও কিছু বলতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতেও সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা ছিল। এ বিষয়ে একজন সাংস্কৃতিক কর্মী প্রথম আলোকে বলেন, এতে সারা দেশের শিক্ষার্থীরাই আন্দোলনে নেমেছিলেন। ওই সময় জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে সবাই কর্মসূচি পালন করেছেন।
ওই নির্দেশিকা বলছে, বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ, হল ছাত্র সংসদ এবং ডিসিপ্লিনের (বিভাগ) ছাত্র সমিতি করার সুযোগ আছে। তবে ডিএসডির অনুমোদন ছাড়া কোনো ক্লাস অথবা সমিতি অথবা ছাত্রসংগঠন করা যাবে না।
শিক্ষার্থীরা বলেন, বিভাগগুলোতে (ডিসিপ্লিন) ছাত্রছাত্রীরা নিজেরা কিছু সংগঠন করেছেন। এর বাইরে হলে বা কেন্দ্রীয়ভাবে তাঁদের কোনো ছাত্র সংসদ নেই। শিক্ষার্থীরা নিজেরা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যুক্ত হতে চান না, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় তাঁদের মতামতের প্রতিফলন দেখতে চান।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে শিক্ষার্থীরা জড়িত না থাকলেও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক সংগঠনে যুক্ত থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীদের ছোট-বড় ২২টি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে। প্রথম আলো