খুলনায় রেলওয়ের সরকারি তেল পাচারের চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস : তদন্ত প্রতিবেদন আগামী সপ্তাহে

0
1108

সুমন আশিক/ফকির শহিদুল ইসলাম:
‘‘আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম এই তেল চুরির ঘটনায় শুধুমাত্র ডিপার্টমেন্ট-এর লোকজন রয়েছে। তবে তদন্তে গিয়ে জানা যায়, সরকারি তেল পাচারে একটি শক্তিশালী চক্র আছে। যার সাথে ডিপার্টমেন্ট এর বাইরেরও লোকজন আছে। খুলনা রেলওয়ের চুরির ঘটনায় গঠিত বিভাগীয় তদন্ত কমিটির আহবায়ক মো: নাছির উদ্দিনের কাছে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি খুলনাটাইমসকে এসব বলেন। তিনি বিভাগীয় রেলওয়ের সহকারী পরিবহণ কর্মকর্তা (এটিও)’র দায়িত্বে আছেন। এই কর্মকর্তা আরও জানান, তদন্তের স্বার্থে ধার্য্যকৃত সময়ে প্রতিবেদন দাখিল করতে বিলম্ব হচ্ছে। তবে আগামী সপ্তÍাহের মধ্যে জমা হবে বলে নিশ্চিত করেছেন।

প্রসঙ্গত: গত ১৮ অক্টোবর রাতে সরকারি তেল চুরির স্থানে র‌্যাব-৬ অভিযান চালায়। পরদিন ১৯ অক্টোবর রাতে খুলনা জিআরপি থানায় মামলা হয়। পাশাশি ঘটনা তদন্তে বিভাগীয় কমিটি হয়। চার সদস্য বিশিষ্ট কমিটি মঙ্গলবার (২৩ অক্টোবর) খুলনা ষ্টেশন এলাকা পরিদর্শন করে। এসময় পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক মোঃ মজিবুর রহমানসহ অন্যান্য কর্মকর্তারাও কমিটির সাথে ছিলেন।

এদিকে সবথেকে বড় তেল চুরির কারবার চলে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা ডিপো হতে আনা খুলনা থেকে পার্বত্যপুর ডিপোতে তেল পরিবহণ করা ওয়াগান থেকে বলে জানা গেছে। খুলনা থেকে পার্বত্যপুর ডিপোতে তেল পরিবহণ করা হয় ওয়াগানে। তেল ডিপো থেকে এনে যারা জংশনে বুঝিয়ে দেয়, তারাই এই পাচারের সাথে জড়িত। আর জংশনে আসা তেল ভর্তি ওয়াগানকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বিশাল চুরির সিন্ডিকেট। এখানে ডিপো থেকে করা সীলগালা খুলে তেল বের করে পুনরায় হুবহু ডিপোর সীলগালা করা হয়। এরা সব পক্ষকে ম্যানেজ করে চোরাই কারবার অব্যাহত রেখেছে। সূত্র বলছে, অবৈধ চোরাই তেলের কারবার হয় মুলত তিনটি পয়েন্টে। এগুলো হচ্ছে খুলনা রেলওয়ের স্টেশন, জংশন, কাশিপুর তেল ডিপো। এছাড়া দৌলতপুর ও ফুলতলার বেজেরডাঙ্গায় রেল থামিয়ে তেল বিক্রি করা হয়।

সূত্র বলছে, তেল চুরি কার্যক্রমের সাথে জড়িত রেলওয়ের আরএনবি-নিরাপত্তা বাহিনীর (গোয়েন্দা) সদস্য বাদল সরদার, শফিকুল ইসলাম সোহাগ ও সোহেল। তেল চুরিতে এদের সহযোগী করে থাকে আরএনবি-নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মানিক হোসেন, ওয়াছকরোনী, মাসুদ খাঁন ও শামীম। আরও আছে লোকো বিভাগের উজ্জ্বল, কুদরত, হেদায়েত। লোকো ইন্সপেক্টর (এলআই) মীর ইদ্রিস আলী তেল চুরিতে কার্যত এদের সহযোগিতা করে থাকে বলে দাবি সূত্রের। মুঠোফোনে জানতে চাইলে ইদ্রিস উত্তেজিত কন্ঠে বলেন, আমার দায়িত্ব পড়ে দূর্ঘটনায় পতিত ট্রেনের স্থানে, তেল এর স্থানে নয়। পক্ষান্তরে রেলওয়ের সরকারি তেল জমা-খরচের হিসাব দিতে হয় তার, এমন কথাও স্বীকার করেন।

অপরদিকে, খুলনা রেলষ্টেশনের সকল ইঞ্জিনের তেল সরবরাহের দায়িত্বে নিয়োজিত এসএসএই (ফুয়েল) বেনজির আহমেদ চোরাই সিন্ডিকেটের সাথে সখ্যতা রেখে চলে বলে জানা গেছে। পদবীসূত্রে মামলার এজাহার নামীয় আসামী ইলেকট্রিক বিভাগের ফোরম্যান বি এম সেলিম আহমেদ ও খায়রুল কবির বাশারের হাতে পাওয়ার কারের তেল সরবরাহের মূল চাবিকাঠি। তবে এরমধ্যে ফোরম্যান খায়রুল নিজেই ষ্টেশন থেকে তেল পাচারের কার্যক্রম সম্পন্ন করেন এবং চুরির বড় ভাগটা নিয়ে নেন। অভিযোগ আছে এই তেল পাচারের অর্থে সে স্বল্প সময়ে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। যদিও খুলনাটাইমস’র কাছে গোটা অভিযোগটি মিথ্যা বলে জানিয়েছেন। এদিকে সূত্র দাবি করেছে সেলিম পাওয়ার কারের তেল চুরির সন্তোষজনক ভাগ পায়। অপর এক সূত্র এবং র‌্যাবের পক্ষ হতে বলা হয়েছে তিনিই চোরা কারবারীর হোতা। অবশ্য, সে নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেছেন।

সূত্র আরও দাবি করেছে, চোরাই তেল হতে অবৈধভাবে আসা সকল অর্থ জমা হয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বদলীর দায়িত্ব পালনকারী (ডিউটি রোষ্টার) জহুরুল ইসলামের কাছে। শুধু চোরাই তেল বাবদ অর্থই নয়, ষ্টেশন এলাকার (ট্রাক পার্কিং, দোকান ও হকার) দৈনিক কালেকশনও তিনি লোক মারফত আদায় করেন। তিনিই স্ব স্ব বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে তেল চুরির ও অন্যান্য অর্থ বুঝিয়ে দেন। এ বিষয়ে তার কাছে জানতে চাইলে বলেন, একটি মহল আমাকে বদলী করতেই এমন অভিযোগ এনেছে।

জানা গেছে, সরকারি তেল চুরি ঠেকানোর জন্য ঝটিকা অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব রেলওয়ে নিরাপত্তা বিভাগের। একইসাথে নিরাপত্তায় নিয়োজিত গোয়েন্দা বিভাগের দায়িত্ব অপকর্ম রোধে উর্দ্ধতনদের অবহিতপূর্বক ব্যবস্থার তাগিদ দেয়া। তবে চোরাই চক্রের সাথে যোগসাজস করে চলায় এটি রোধ হচ্ছে না। আর রেলওয়ে পুলিশের দায়িত্ব না-কি ট্রেন লাইনের ১০ গজের মধ্যে সীমাবদ্ধ, এমন কথা তারা জানিয়েছে। যদিও সরেজমিনে দেখা গেছে রেল পুলিশের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় অবৈধ মালামাল আনা হয়। এজন্য নিয়মিত মাসোয়ারা আসে, সূত্র জানায়।

আরও জানা গেছে, সিবিএ নেতাদের ক্ষমতার পালাবদল হলেও কখনও থামেনি সরকারি তেল পাচার কার্যক্রম। চোরাই তেল বিক্রির অর্থের অংশ লোকোশেড ইনচার্জ বিজয় কুমার ঘোষ, লোকো ইনচার্জ বিনয় ভূষন হালদার, লোকো বিভাগের শ্রমিক নেতা হাকিম আলী, শেডম্যান/এটেনডি জাকির হোসেন, ডিউটি রোষ্টার কাজী আমিনুল ইসলাম, ইলেকট্রিক বিভাগের মিস্ত্রি, খালাসী, জিআরপি-রেলওয়ে পুলিশ, আরএনবি, আরএনবি-গোয়েন্দা, খুলনা ষ্টেশন এলাকায় নৌ পুলিশ পায়। এই চক্রে আরও আছে, মামলার এজাহার নামীয় আসামী জাহাঙ্গীর, মাহামুদ ওরফে ট্যারা মাহামুদ, মোঃ শরীফুল ইসলাম, মোঃ মহিউদ্দিনসহ ১০/১২ জন রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাদের কাছ থেকে স্বল্পমূল্যে তেল ক্রয় করে স্থানীয় তিথি এন্টার প্রাইজের মালিক শেখ আশরাফ আলী।

মামলার এজাহারে উল্লেখ, রেলষ্টেশনের ষ্টেশন মাষ্টার ও এ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার (ফোরম্যান)’দের সহায়তায় আর্থিকভাবে লাভবান হতেই আসামীরা একেঅপরের সহায়তায় বেআইনি পন্থায় এই অবৈধ কাজে লিপ্ত রয়েছে।

এ বিষয়ে খুলনা রেলওয়ে পুলিশের (জিআরপি) অফিসার ইনচার্জ ওসমান গণি পাঠান খুলনাটাইমসকে বলেন, তদন্ত অব্যাহত আছে। পলাতক আসামী আটকের চেষ্টা চলছে।

রেলওয়ে বিভাগ সূত্রমতে, সারাদেশে প্রতিদিন সাড়ে তিনশ’ ট্রেন চলাচল করে। এসব ট্রেনে দিনে গড়ে প্রায় পৌনে দুই লাখ লিটার ডিজেল খরচ হয়। এ হিসাবে বছরে ব্যয় হয় ছয় কোটি ৩৮ লাখ ৭৫ হাজার লিটার। কোনো কোনো বছর এর চেয়ে কম-বেশিও হয়। এই ব্যবহূত তেল থেকে বছরে চুরি হয়ে থাকে প্রায় দেড় কোটি লিটার; যার বাজারমূল্য ৯৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। গড়ে প্রতিদিন চুরির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার লিটার। এর মধ্যে শুধু ইঞ্জিন ও পাওয়ারকার থেকে দিনে ২০ হাজার লিটার, ১১টি লোকোশেড থেকে প্রায় ১৫ হাজার লিটার এবং চলন্ত ট্রেন থেকে পাঁচ হাজার লিটার তেল চুরির ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া বছরে প্রায় এক কোটি টাকার ইঞ্জিন অয়েলও চুরি হয়। তেলের বাজারমূল্যের ওপরই চুরির অর্থ নির্ধারণ হয় এবং এর ভিত্তিতে তা ভাগবাটোয়ারা হয়।